ব্রাজিল ও উরুগুয়ের মতো দুই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলকে দেশে এনে প্রীতি ম্যাচ আয়োজন করতে গিয়ে বড় আর্থিক সংকটে পড়েছে ভারতের ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন (এআইএফএফ)। দুই দেশের ফুটবল ফেডারেশনকে প্রায় ২৩ কোটি ৭০ লাখ ভারতীয় রুপি, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা এখনো পরিশোধ করতে পারেনি সংস্থাটি। বকেয়া মেটাতে সংরক্ষিত তহবিল ভাঙার উদ্যোগও বাধার মুখে পড়েছে। নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধ না হলে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সালিশি আদালতে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
গত অক্টোবরে কলকাতার সল্টলেক স্টেডিয়ামে ব্রাজিল ও উরুগুয়ের বিপক্ষে দুটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ আয়োজন করে ভারত। এ নিয়ে আর্থিক জটিলতার বিষয়টি সামনে এসেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার সাংবাদিক মার্কাস মারগুলহাওয়ের প্রতিবেদনে। অন্যদিকে গত রবিবার (১ নভেম্বর) এআইএফএফের বিশেষ সাধারণ সভায় বকেয়া পরিশোধের অর্থের সংস্থান নিয়ে আলোচনা হলেও কোনো চূড়ান্ত সমাধান আসেনি।
বিশ্ব ফুটবলের দুই শক্তিশালী দলের বিপক্ষে খেলার সুযোগ তৈরি করতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেছিল ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন। তবে মাঠের আয়োজন শেষ হলেও এখনো পুরো উপস্থিতি ফি বুঝে পায়নি ব্রাজিল ও উরুগুয়ে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রাজিলের কাছে এআইএফএফের বকেয়া প্রায় ১৯ কোটি রুপি। উরুগুয়ের পাওনা আরও ৪ কোটি ৭০ লাখ রুপি। দুই দেশই চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত ফির অর্ধেক অর্থ পেয়েছে। তবে পানামার বিপক্ষে ম্যাচ আয়োজনের পাওনা পুরোপুরি পরিশোধ করেছে ভারত।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বকেয়া পরিশোধের জন্য সময় বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে এআইএফএফ। যদিও চুক্তির গোপনীয়তার কারণে পাওনার সুনির্দিষ্ট অঙ্ক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হিসাব সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এসেছে।
এই বকেয়া নিয়ে আইনি জটিলতার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। ভারতের সাবেক ফুটবল কর্মকর্তা সুব্রত দত্তের মতে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করতে না পারলে ব্রাজিল ও উরুগুয়ে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সালিশি আদালতের (সিএএস) দ্বারস্থ হতে পারে।
ন্যাশনাল হেরাল্ডের প্রতিবেদনে সুব্রত দত্তের বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, ‘প্রীতি ম্যাচের পাওনা মেটাতে শেষ পর্যন্ত স্থায়ী আমানত ভাঙতে হলে এআইএফএফের কার্যক্রমে বড় প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ে পাওনা না পেলে ব্রাজিল ও উরুগুয়ে ক্রীড়া সালিশি আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে।’
তবে ব্রাজিল বা উরুগুয়ের ফুটবল ফেডারেশন এখন পর্যন্ত মামলা করার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়নি। বিষয়টি আপাতত সম্ভাব্য আইনি ঝুঁকি হিসেবেই আলোচনায় রয়েছে।
আর্থিক সংকট মোকাবিলায় গত ১ নভেম্বর ভার্চুয়ালি বিশেষ সাধারণ সভা করে এআইএফএফ। সভায় সভাপতি কল্যাণ চৌবে প্রায় ২০ কোটি রুপির স্থায়ী আমানত বা ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙে দুই দেশের পাওনা পরিশোধের প্রস্তাব দেন। তার পরিকল্পনা ছিল, সাময়িকভাবে আমানতের অর্থ ব্যবহার করে বকেয়া মেটানো হবে এবং পরে অন্য উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করে সেই টাকা আবার তহবিলে জমা দেওয়া হবে।
কিন্তু ফেডারেশনের অন্য কর্মকর্তারা এই প্রস্তাবে আপত্তি জানান। তাদের যুক্তি, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সংস্থার সংরক্ষিত অর্থ ব্যবহার করা উচিত নয়। এ ছাড়া স্থায়ী আমানত ভাঙা যাবে না বলে নির্বাহী কমিটির আগের একটি সিদ্ধান্তও ছিল।
সভায় সহসভাপতি এন এ হারিস ওই সিদ্ধান্তের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। সাবেক সভাপতি প্রফুল প্যাটেলও আমানত ভাঙার বিরোধিতা করেন। বিভিন্ন রাজ্য ফুটবল সংস্থার প্রতিনিধিরাও একই অবস্থান নেন। ফলে আপাতত কল্যাণ চৌবের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে সভায় উপস্থিত এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, আমানতের অর্থ দিয়ে সাময়িকভাবে পাওনা পরিশোধের পর বাইরে থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তহবিল পুনরায় পূরণ করার পরিকল্পনা ছিল সভাপতির। তবে সদস্যদের আপত্তিতে সেই উদ্যোগ আটকে যায়। এর বাইরে ২০ কোটি রুপির আমানত ভাঙলেও ব্রাজিল ও উরুগুয়ের মোট ২৩ কোটি ৭০ লাখ রুপির দেনা পুরোপুরি পরিশোধ করা সম্ভব হতো না।
শেষ পর্যন্ত বকেয়া ও আর্থিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য এন এ হারিসের নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। কমিটি পাওনার পরিমাণ, অর্থ পরিশোধের সময়সীমা এবং সম্ভাব্য অর্থের উৎস খতিয়ে দেখবে। পরে তাদের সুপারিশ নির্বাহী কমিটির সভায় উপস্থাপন করা হবে।
এআইএফএফের এই সংকটের পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে টিকিট বিক্রি থেকে প্রত্যাশিত আয় না হওয়াকে। তিনটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের আগে টিকিট বিক্রি থেকে ৩০ থেকে ৪০ কোটি রুপি আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল ফেডারেশন। কিন্তু টিকিটের দাম বেশি হওয়ায় দর্শকদের আগ্রহ প্রত্যাশা অনুযায়ী ছিল না।
দর্শক টানতে কলকাতার জনপ্রিয় তিন ক্লাব মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল ও মোহামেডান স্পোর্টিংয়ের সমর্থকদের জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়। এমনকি ব্রাজিলের ম্যাচের টিকিটে একটি কিনলে আরেকটি বিনামূল্যে দেওয়ার অফারও চালু করা হয়েছিল। এত উদ্যোগের পরও টিকিট বিক্রি থেকে কাঙ্ক্ষিত অর্থ আসেনি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টিকিট বিক্রির দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নেওয়া অগ্রিম অর্থের হিসাব। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ২৫ কোটি রুপি সমন্বয়যোগ্য অগ্রিম নিয়েছিল এআইএফএফ। টিকিট বিক্রি প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়ায় এই অর্থের একটি অংশ ফেরত দিতে হতে পারে। ফলে ফেডারেশনের আর্থিক চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভারতীয় বার্তা সংস্থা পিটিআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পানামা, ব্রাজিল ও উরুগুয়ের বিপক্ষে তিনটি প্রীতি ম্যাচ আয়োজনের মোট ব্যয় ৮০ থেকে ৮৫ কোটি রুপি পর্যন্ত হতে পারে। তবে পুরো ব্যয়কে ফেডারেশনের লোকসান বলা যাবে না। কারণ, টিকিট বিক্রিসহ বিভিন্ন খাত থেকে আয়ও হয়েছে। প্রকৃত আর্থিক ঘাটতির পরিমাণ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের ঘরোয়া ফুটবল ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের অর্থায়ন নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সন্তোষ ট্রফির মতো ঘরোয়া প্রতিযোগিতা আয়োজন, বয়সভিত্তিক ফুটবল এবং তৃণমূল পর্যায়ে খেলাটির প্রসারে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ফেডারেশনের সদস্যরা।
তাদের আশঙ্কা, ব্রাজিল ও উরুগুয়ের পাওনা পরিশোধ করতে গিয়ে সংস্থার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে বরাদ্দ কমে যেতে পারে। অথচ এই দুই দলকে ভারতে আনার সময় আয়োজনের কারণে ফেডারেশনের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ পড়বে না বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই আর্থিক পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে সংকট নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি এআইএফএফ সভাপতি কল্যাণ চৌবে। পিটিআইকে তিনি জানিয়েছেন, বিষয়টি ফেডারেশনের অভ্যন্তরীণ সভার সাথে সম্পর্কিত। ফলে বকেয়া পরিশোধের চূড়ান্ত পরিকল্পনা এবং আর্থিক সংকট থেকে উত্তরণের পথ জানতে এখন বিশেষ কমিটির সুপারিশের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।




