বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও শিক্ষাগত সনদে অসত্য তথ্য দেওয়ার অভিযোগ ওঠার পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালকের পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেছেন গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুসের কাছে তিনি তার পদত্যাগপত্র জমা দেন বলে নিশ্চিত করেছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ধাক্কা তার রাজনৈতিক মিত্রদের গণ্ডি পেরিয়ে এখন পরিবারের সদস্যদের ওপরও দৃশ্যমান হচ্ছে। হাসিনার ঘনিষ্ঠ বহু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বর্তমানে বাংলাদেশে দুর্নীতিসহ নানা ফৌজদারি মামলার মুখে পড়েছেন কিংবা সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মতো প্রবাসে অবস্থান করছেন।
২০২৩ সালের নভেম্বরে সদস্য দেশগুলোর ভোটে নির্বাচিত হয়ে ২০২৪ সালের শুরুতে পাঁচ বছরের মেয়াদে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন পুতুল। তবে গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দুদকের তদন্ত শুরু হয়। গত বছরের শেষদিকে তাকে বিনা বেতনে প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠায় সংস্থাটি।
এর আগে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে তাকে প্রথম ছুটিতে পাঠানো হয়েছিল। শেখ হাসিনার পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ওই বছরের মার্চ মাসে তার বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগ দায়ের করে।
রয়টার্সের হাতে আসা ৩ জুলাই, ২০২৬ তারিখের একটি চিঠিতে দেখা যায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডব্লিউএইচও পুতুলের বিরুদ্ধে চীন সফরে আর্থিক জালিয়াতি এবং নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতার মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগ এনেছে। তবে পুতুল এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এ ছাড়া মহাপরিচালক বরাবর পদত্যাগপত্রে সায়মা উল্লেখ করেন, ডব্লিউএইচও তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে বেআইনিভাবে একটি প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগও এনেছিল। এর জবাবে তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় যোগদানের আগেই তিনি ওই জমি পেয়েছিলেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের জন্য নির্ধারিত আইনের অধীনে তিনি তা পাওয়ার বৈধ অধিকারী ছিলেন।
ডব্লিউএইচও প্রধান তেদ্রোস আধানম গেব্রেয়াসুসকে দেওয়া চিঠিতে সায়মা ওয়াজেদ নেতৃত্বের ওপর অনাস্থা প্রকাশ করে লেখেন, ‘আমার অঞ্চলের দেশগুলোর সেবা করার লক্ষ্যেই আমি আঞ্চলিক পরিচালক পদে নির্বাচিত হয়েছিলাম এবং নিষ্ঠার সাথেই সেই দায়িত্ব পালন করেছি। কিন্তু আপনি ক্রমাগত আমাকে দায়িত্ব পালনে বাধা দিয়ে আসায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় আপনার নেতৃত্বের ওপর আমি সম্পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা হারিয়েছি।’
চিঠিতে তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘আমাকে বিনা বেতনে ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্তের পর প্রায় এক বছর কোনো পারিশ্রমিক না পাওয়ায় আমার আর্থিক পরিস্থিতি চরম সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আমি সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।’
তবে এ বিষয়ে তিনি নতুন করে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাৎক্ষণিকভাবে ডব্লিউএইচওর পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। সংস্থাটি এর আগে গোপনীয়তার স্বার্থে বিস্তারিত তথ্য জানানো থেকে বিরত থেকে শুধু তার ছুটিতে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল।
সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, সায়মা ওয়াজেদকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদ থেকে সরানোর প্রক্রিয়া চলছিল। আগামী ১২ অক্টোবর এ পদের জন্য নতুন মনোনয়ন ঘোষণা করা হতে পারে এবং যাচাই-বাছাই শেষে আগামী ২৪ জানুয়ারি নতুন আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।



