চলতি অর্থবছরের জন্য প্রণিত বাজেটের বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে বর্তমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার। এজন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরসহ বিগত পাঁচ বছরের বাজেটে ঘোষিত গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির বাস্তব অগ্রগতির তথ্য জানাতে সকল দফতরকে নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। আর এই প্রতিবেদন জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনে প্রতিবেদন আকারে পেশ করবেন অর্ধমন্ত্রী।
তথ্যমতে, অর্থ বিভাগ থেকে জারিকৃত চিঠিতে এসব তথ্য প্রেরণের জন্য আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে সংসদে অর্থমন্ত্রীকে ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন দাখিল করতে হয়। এরই অংশ হিসেবে তথ্য আহ্বান করলেও বিএনপি সরকারের প্রথম তিন মাসের অগ্রগতি জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে বিধায় সকল দফতর থেকে অত্যন্ত সচেতনতার সঙ্গে তথ্য প্রেরণ করা হচ্ছে। এসংক্রান্ত এক পত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামষ্টিক অর্থনীতি অনুবিভাগের নীতি গবেষণা ও পরিবীক্ষণ শাখা থেকে এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি স্বীকার করে অর্থ বিভাগের উপসচিব (নীতি গবেষণা ও পরিবীক্ষণ-৩) আল-ইমরান রুহুল ইসলাম টাইমস টুডেকে বলেন, আইন অনুযায়ী অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন দাখিল করেন। এজন্য সরকারের সকল বিভাগে বাজেটের প্রতিশ্রুতি কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে তার আলোকে প্রতিবেদন তৈরি করতে হয়। প্রতিবেদন সংসদের আগামী অধিবেশনে পেশ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জারি করা চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক প্রতিবেদন প্রণয়নের লক্ষ্যে ২০২১-২২ অর্থ বছর পর্যন্ত বাজেটে ঘোষিত গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির তালিকা প্রেরণের নির্দেশনা দেওয়া হলো। চিঠিটি জারি করা হয়েছে চলতি মাসের ৭ অক্টোবর এবং তথ্য প্রেরণের জন্য এক সপ্তাহ ১৫অক্টোবর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়।
সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৯ অনুযায়ী অর্থমন্ত্রীকে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে (প্রতি তিন মাস অন্তর) বাজেটের বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে হয় এবং এসংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করতে হয়। আইনের ১৫(৪) ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, অর্থ মন্ত্রী, বাজেটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব সংগ্রহ এবং ব্যয়ের গতিধারা ত্রৈমাসিক ভিত্তিক পর্যালোচনা করবেন এবং উক্ত পর্যালোচনার ফলাফল এবং করণীয় সস্পর্কিত প্রতিবেদন সংসদ অধিবেশনে উপস্থাপন করবেন। এলক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পক্ষ থেকে চলতি বছরের বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতিসহ বিগত পাঁচ বছরের তথ্য প্রেরণ করা হয়েছে।
এনবিআরের চলতি অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি ছকে ২০২৩-২৪ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ঘরটি ফাঁকা রয়েছে। তবে চলতে অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের ২৬টি বিষয়ে অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয় যে, রাজস্ব নীতি ও ব্যবস্থাপনা পৃথকীকরণ এবং করনীতি প্রণয়ন। কর ছাড় যৌক্তিকীকরণ, এসআরও ভিত্তিক করছাড় হ্রাস করা। কর রেয়াত বা ছাড়ের ক্ষেত্রে সংসদের অনুমোদন বাধ্যতামূলকরণ।
এনবিআরের পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়, কর-বহির্ভূত রাজস্ব ও জাতীয় রাজস্ব বহির্ভূত রাজস্ব সংগ্রহে ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২৬ প্রণয়নের উদ্যোগ নেইয়া হয়েছে। বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠান, করপোরেশন, কোম্পানী, ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সরকারের বিনিয়োগ বা ইক্যুটির একটি পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে রাজস্ব-জিডিপি ও কর-জিডিপি অনুপাত যথাক্রমে ১১ ও ৯.৬ শতাংশে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫শতাংশে উন্নীতকরণ করার বাস্তব অগ্রগতি। এ ছাড়াও ব্যক্তি করদাতাদের জন্য আগামী ৫ বছরের করমুক্ত আয়সাঈমা ও করহার কাঠামোর প্রবর্তন, উৎসে কর্তিত করকে ন্যূনতম করের পরিবর্তে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করা এবং অতিরিক্ত পরিশোধিত উৎসে কর ফেরত প্রদানের বিষয়ে জানানো হয়েছে। সেন্ট্রাল ডাটা ইন্ট্রিগেশনের মাধ্যমে এনবিআরের তথ্যভাণ্ডারকে জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক, ইউটিলিটি সেবা, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্তকরণ এবং সেরা করদাতা পুরষ্কার নীতিমালা প্রণয়নের প্রসঙ্গের অবহিত করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রণালয়ে প্রেরিত প্রতিবেদনে ক্ষুদ্র ও খুচরা ব্যবসায়ীদের জন্য এলাকা ও বাজারভিত্তিক ফ্ল্যাট রেট-এ সুনির্দিষ্ট টার্নওভার কর প্রদানের বিধান প্রবর্তন, অবৈধ তামাল পণ্যের বাণিজ্য প্রতিরোধে ট্র্যাক এন্ড ট্রেস ব্যবস্থা চালু, বিনিয়োগকারীর আইনি সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক আস্থা বৃদ্ধিতে দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তি সম্প্রসারণ এবং দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি হালনাগাদ ও কার্যকর বাস্তবায়নের বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে বাস্তব অগ্রগতির মধ্যে ব্যক্তি করদাতাদের পাশাপাশি কোম্পানি করদাতাদের করপোরেট রিটার্নও অনলাইনের দাখিলের ব্যবস্থা, করদাতার উৎসে কর নিরুপিত করের চেয়ে বেশি হলে অতিরিক্ত পরিশোধিত কর ফেরত প্রদান জন্য সংক্রিয় পদ্ধতি চালুর প্রসঙ্গে জানানো হয়।
এতে আরও উল্লেখ করা হয়, দ্বৈত কর পরিহারে অনলাইনে সনদ প্রদানের ব্যবস্থা, ব্যবসা খাতের আয় পরিগণনায় অ্যাকচুরাল পদ্ধতিতে সুদ ব্যয়, তৈরি পোশাক খাতের পাশাপাশি অন্য রপ্তানিমুখী খাতের বন্ড সুবিধার বিধিবিধান সংশোধন, শতভাগ রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পের অডিটের বাধ্যবাধকতা রহিতকরণ এবং ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ প্রদানের বিষয়ে অবগত করা হয়েছে।
এইও প্রতিষ্ঠানকর্তৃক সিস্টেম বেজড সেলফ এসেসমেন্ট পদ্ধতিতে পণ্য খালাদের ব্যবস্থা করা, সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বাংলাদেশ অ্যাক্রিডিটেশন বোর্ড ও আইএসও স্বীকৃত বেসরকারি ল্যাবরেটরিতেও পরীক্ষার সুযোগ প্রদান, আয়কর রিটার্নের ন্যায় ই-ভ্যাট রিটার্ন দাখিল, তাৎক্ষনিক বিআইএন প্রদান ও প্রতিমাসের পরিবর্তে ত্রৈমাসিক ভ্যাট রিটার্ন দাখিল প্রবর্তন এবং আয়কর, শুল্ক ও মূসকের আপিল দায়েরের ক্ষেত্রে প্রদেয় করের হার হ্রাস করা এবং কর কর্মকর্তাদের বিবেচনামূলক ক্ষমতা বা ঐচ্ছিক ক্ষমতা বিলোপ করার বিষয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

