অ্যাপলের প্রথম ভাঁজ করা স্মার্টফোন ‘আইফোন ডুয়ো’ বিশ্ববাজারে এসেছে শুক্রবার (২৩ অক্টোবর)। প্রায় ২ হাজার ডলার দামের এই ফোন ঘিরে বিভিন্ন দেশে ক্রেতাদের আগ্রহ দেখা গেলেও আগের আইফোন উন্মোচনের সময়ের মতো ব্যাপক উন্মাদনা এবার চোখে পড়েনি। সীমিত সরবরাহের কারণে কিছু বাজারে ফোনটির অপেক্ষার সময় বেড়েছে, আবার নকশা ও প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও এসেছে।
সিঙ্গাপুর, সাংহাই, লন্ডন ও সান ফ্রান্সিসকোসহ বিভিন্ন শহরে ফোনটি কিনতে ক্রেতারা অ্যাপল স্টোরে ভিড় করেন। তবে দোকানের সামনে দীর্ঘ সারি কিংবা রাতভর অপেক্ষা করার দৃশ্য আগের কয়েকটি আইফোন বাজারে আসার সময়ের তুলনায় কম ছিল। অ্যাপলের দাবি, প্রি-অর্ডার শুরুর আগেই চাহিদা সরবরাহকে ছাড়িয়ে যায়। এতে সম্ভাব্য সরবরাহের সময় পিছিয়ে জানুয়ারির শেষ দিকে চলে যায়।
স্যামসাং ইলেকট্রনিকস ও হুয়াওয়ে টেকনোলজিসের মতো প্রতিষ্ঠান বহু বছর ধরেই দামি ফোল্ডিং স্মার্টফোন বিক্রি করছে। এমন পরিস্থিতিতে অ্যাপলের নতুন ফোনটি নিয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আইফোনের মাধ্যমে স্মার্টফোনের বাজারে পরিবর্তন আনার মতো করে প্রতিষ্ঠানটি ভাঁজ করা ফোনের বাজারেও নতুন মাত্রা যোগ করতে পারবে কি না।
অ্যাপলের নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জন টার্নাসের জন্যও ফোনটির বাজারে প্রবেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। সাবেক এই হার্ডওয়্যার প্রধান সেপ্টেম্বরে দায়িত্ব নেওয়ার এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে ফোনটি উন্মোচন করেন।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টায় ফোনটির বিক্রি শুরু হয়। পাসপোর্টের মতো আকৃতির ডিভাইসটি কিনতে প্রথম অ্যাপল স্টোরের বাইরে দোকান খোলার আগেই ক্রেতাদের সারি তৈরি হয়।
৪৮ বছর বয়সী প্রকৌশলী সাইমন কৃষ্ণান ৫১২ জিবি আইফোন ডুয়োর জন্য ৩ হাজার ৮৯৯ অস্ট্রেলীয় ডলার, যা প্রায় ২ হাজার ৭৩৪ মার্কিন ডলার, খরচ করেন। তিনি বলেন, ‘দাম অনেক বেশি হওয়ায় এটি আমার জন্য কিছুটা বিলাসবহুল পণ্য। কিন্তু আমি ভাবলাম, জীবন তো খুব ছোট।’
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের অস্টিনে একটি অ্যাপল স্টোরে ক্রেতাদের স্বাগত জানান প্রধান নির্বাহী টার্নাস। সিবিএস অস্টিনের এক্সে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি দোকানের দরজা খুলে দেন এবং প্রবেশ করা ক্রেতাদের সাথে হাই-ফাইভ করেন।
নিউইয়র্কের ফিফথ অ্যাভিনিউয়ের অ্যাপল স্টোরেও ক্রেতাদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। সেখানে প্রতিষ্ঠানটির বিপণন বিভাগের প্রধান গ্রেগ জসউইয়াক দোকানের দরজা খুলে দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত কয়েকটি পোস্টে বলা হয়, স্থানীয় সময় ভোর ৪টা থেকেই কয়েকজন ক্রেতা স্টোরটির বাইরে অপেক্ষা করছিলেন।
সান ফ্রান্সিসকোর ৩২ বছর বয়সী পরামর্শক মোহিত চান্দেল সিঙ্গাপুরে বসবাসরত তার অবসরপ্রাপ্ত বাবাকে একটি আইফোন ডুয়ো দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ফোনটির প্রি-অর্ডার করতে ভুলে যান। বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ১১টার দিকে একটি অ্যাপল স্টোরের বাইরে প্রায় এক ডজন মানুষকে সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনিও তাদের সাথে যোগ দেন। রাত কাটানোর জন্য ওয়ালগ্রিনস থেকে একটি বেঞ্চ ও বালিশের ব্যবস্থা করেন।
চান্দেল বলেন, ‘বাবা জানেন না যে সব প্রি-অর্ডার শেষ হয়ে গেছে। তিনি আশা করছেন, ডাকযোগে কোনো একসময় ডুয়ো পেয়ে যাবেন। এখন আমাকে ফোনটি কিনতেই হবে।’
চীনের স্মার্টফোন বাজারেও নতুন ফোনটি ঘিরে আগ্রহ দেখা গেছে। দেশটিতে দুর্বল ভোক্তা চাহিদা ও মেমোরি চিপের বাড়তি দামের কারণে স্মার্টফোন সরবরাহ টানা ছয় প্রান্তিকে কমেছে। তবে কিছু ক্রেতা উন্নত ও দামি ফোনের দিকে ঝুঁকে পড়ায় চীনের বাজারে অ্যাপলের অংশীদারত্ব আবার বেড়েছে।
২৬ বছর বয়সী স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবী লিউ ওয়েইয়ের কাছে আগে থেকেই শাওমির একটি ফোল্ডিং ফোন রয়েছে। তারপরও অ্যাপলের প্রথম ভাঁজ করা ফোনটি কিনতে তিনি সাংহাইয়ের একটি স্টোরের বাইরে সকাল ৬টা থেকে অপেক্ষা করেন।
লিউ বলেন, ‘আমি বহু বছর ধরে অ্যাপলের পণ্য ব্যবহার করছি এবং ব্র্যান্ডটির ওপর আমার আস্থা বেশি। তাই নতুন ফোনটি চেষ্টা করে দেখতে বাজারে আসার দিনই কিনেছি।’
ক্রেতাদের মধ্যে অনেকে আগে থেকে অর্ডার করা ফোন সংগ্রহ করতে এসেছিলেন। কেউ কেউ সীমিত মজুত থেকে ফোন কেনার আশায় কিংবা প্রদর্শনীর মডেল দেখতে দোকানে যান। তাদের মধ্যে পুনর্বিক্রেতারাও ছিলেন।
হংকংয়ে মে নামের ৩৮ বছর বয়সী এক ক্রেতা নিজের পুরো নাম প্রকাশ করতে চাননি। তিনি অনলাইনে আগাম বিক্রির মাধ্যমে ২৫৬ জিবি আইফোন ডুয়ো কেনেন। ফোনটির দাম ছিল ১৭ হাজার ৪৯৯ হংকং ডলার, যা প্রায় ২ হাজার ২৩১ দশমিক ৭৩ মার্কিন ডলার। পরে প্রায় ৪ হাজার হংকং ডলার লাভে ফোনটি পুনরায় বিক্রির পরিকল্পনা করেন তিনি।
ফোনটির নকশা ও প্রযুক্তি নিয়ে পর্যালোচকদের প্রতিক্রিয়া অবশ্য একরকম নয়। প্রাথমিক পর্যালোচনায় আইফোন ডুয়োর নকশা এবং এর মজবুত ও প্রায় অদৃশ্য হিঞ্জের প্রশংসা করা হয়েছে। ভাঁজ করা ফোনের পর্দায় দৃশ্যমান ভাঁজ এ ধরনের ডিভাইসের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা। এই সমস্যা কমাতে অ্যাপলের নকশাকে বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন অনেকে।
তবে ক্যামেরার কিছু সীমাবদ্ধতা, বিশেষ করে টেলিফটো লেন্সের অনুপস্থিতি, এবং নতুন পর্দার আকারের সাথে মানিয়ে নিতে তৃতীয় পক্ষের অ্যাপগুলোকে পরিবর্তন করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। পর্যালোচকদের মতে, ফোনটি ভাঁজ করা অবস্থায় দৈনন্দিন দ্রুত কাজের জন্য তুলনামূলক কম সুবিধাজনক। কয়েকজন পরিচিত প্রযুক্তি পর্যালোচকও অধিকাংশ অ্যাপল ব্যবহারকারীর জন্য ফোনটি না কেনার পরামর্শ দিয়েছেন।
অ্যাপলবিষয়ক দীর্ঘদিনের ভাষ্যকার জন গ্রুবার লিখেছেন, ‘এক সপ্তাহ ধরে ডুয়ো ব্যবহার করে বেশ মজা পেয়েছি। কিন্তু মনে হয়েছে, আমি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তৈরি একটি প্রোটোটাইপ ব্যবহার করছি—এমন কোনো সম্পূর্ণ পণ্য নয়, যা আমি কিনে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে চাই।’
প্রযুক্তি বিশ্লেষক মার্কেস ব্রাউনলি তার ইউটিউব পর্যালোচনায় বলেন, সাধারণ ব্যবহারকারী যিনি মূলত বার্তা আদান-প্রদান ও ইন্টারনেট ব্রাউজ করেন, তার জন্য ফোনটি কেনা সম্ভবত ঠিক হবে না। তবে ২ হাজার ডলার খরচ করা যার জন্য বড় বিষয় নয় এবং যিনি ফোনটির ধারণা পছন্দ করেন, তার জন্য এটি বেশ উপভোগ্য হতে পারে।
ব্রাউনলি বলেন, ‘ব্যবহারের নতুন পদ্ধতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং ফেস আইডি না থাকার বিষয়টি মেনে নেওয়ার পর ফোনটি ব্যবহার করা সত্যিই বেশ মজার।’
জার্মানির বার্লিনে ইউটিউব কনটেন্ট নির্মাতা প্যাট্রিক ওল্টার ফোনটির এমন সক্ষমতায় মুগ্ধ হয়েছেন, যার মাধ্যমে একই ডিভাইস ফোন ও আইপ্যাড—দুই হিসেবেই ব্যবহার করা যায়।
তিনি বলেন, ‘আলাদা একটি ট্যাবলেট সঙ্গে নিয়ে ঘোরাকে সব সময়ই ঝামেলার মনে হয়েছে। বিশেষ করে, যখন আমার কাছে আগে থেকেই একটি ল্যাপটপ ও অন্যান্য সরঞ্জাম রয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে এটি সম্ভবত অন্য ডিভাইসগুলোর জায়গা দখল করবে।’
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইডিসির ভাইস প্রেসিডেন্ট ফ্রান্সিসকো জেরোনিমোর মতে, তুলনামূলক সীমিত পরিসরের ফোল্ডিং ফোনের বাজারে অ্যাপলের প্রবেশ এ ধরনের ডিভাইসকে আরও বড় ক্রেতাগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দিতে পারে।
আইডিসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ফোল্ডিং ফোনের বাজারমূল্যের ৪৪ শতাংশ দখল করতে পারে অ্যাপল। তবে বিক্রি হওয়া মোট ইউনিটের হিসাবে প্রতিষ্ঠানটির অংশ হতে পারে ৩১ শতাংশ। ২০২৭ সালের মধ্যে বাজারমূল্য ও বিক্রি হওয়া ইউনিট—উভয় ক্ষেত্রেই অ্যাপল শীর্ষস্থান দখল করবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
ডুয়ো এক সপ্তাহ ব্যবহার করার পর জেরোনিমো বলেন, ‘এই ধরনের ফোনের উপযোগিতা সম্পর্কে অ্যাপল একটি বিশ্বাসযোগ্য যুক্তি তুলে ধরতে পেরেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন পরবর্তী পরীক্ষা হলো—এই আগ্রহকে পণ্যের সহজলভ্যতা, ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা এবং স্মার্টফোনের বাজারে একটি স্থায়ী নতুন অধ্যায়ে রূপান্তর করা।’
সূত্র: রয়টার্স

