...|...|...

রাজধানী

বন্ধুর কাছে পাওনা টাকা চাইতে গিয়ে নিখোঁজ, মাটি খুঁড়ে মিলল লাশ

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৫:৫৯
Shares
বন্ধুর কাছে পাওনা টাকা চাইতে গিয়ে নিখোঁজ, মাটি খুঁড়ে মিলল লাশ

ব্যবসায়ী শেখ ওয়াসিম রনী ও আসামি মোহাম্মদ মাসুম চৌধুরী। ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর লালবাগে নিখোঁজের তিন দিন পর ব্যবসায়ী শেখ ওয়াসিম রনীর (৪৭) লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। পাওনা তিন লাখ টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে তাকে হত্যা করে লাশ মাটির নিচে চাপা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে তার পরিচিত মোহাম্মদ মাসুম চৌধুরীর বিরুদ্ধে।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে লালবাগের ৯ নম্বর বি সি দাস স্ট্রিটের একটি পাঁচতলা ভবনে অভিযান শুরু করে পুলিশ। দীর্ঘ সময় তল্লাশির পর শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ভবনের নিচতলার পাশের মাটি খুঁড়ে ওয়াসিম রনীর লাশ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ জানায়, লাশ উদ্ধারের সময় ওয়াসিমের হাত-পা প্লাস্টিকের রশি দিয়ে বাঁধা এবং মুখ পলিথিন দিয়ে মোড়ানো ছিল। লাশটি অর্ধগলিত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

ঘটনাস্থলে পুলিশের পাশাপাশি সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ও ডিবি পুলিশের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।

নিহতের স্বজনদের ভাষ্য, শেখ ওয়াসিম রনী ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন। যে ভবনের পাশ থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, সেই ভবনের নিচতলায় মোহাম্মদ মাসুম চৌধুরীর ইমিটেশন জুয়েলারির পাইকারি কারখানা ছিল।

ওয়াসিমের শ্যালক মুরাদ হোসেন জানান, ৮ সেপ্টেম্বর তিন লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে একটি চেক দেওয়ার কথা ছিল। ওই দিন দুপুরের পর থেকে ওয়াসিমের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর পরিবারের সদস্যরা তার খোঁজ শুরু করেন।

তিনি বলেন, একপর্যায়ে তারা অভিযুক্ত মাসুমের বাড়িতে গিয়ে তার স্ত্রীর সাথে কথা বলেন। মাসুমের স্ত্রী জানান, ওয়াসিম বাসায় এসেছিলেন, পরে চলে গেছেন। তবে তার আর কোনো খোঁজ দিতে পারেননি তিনি।

পরে কোনো সন্ধান না পেয়ে লালবাগ থানায় ওয়াসিম নিখোঁজের বিষয়ে অভিযোগ করেন স্বজনরা। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে পুলিশ।

মুরাদ হোসেনের অভিযোগ, ওয়াসিমের লাশ লুকিয়ে রাখতে আট বস্তা মাটি এনে বাসার পাশে তাকে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, তার বোনের স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে। এখন তার বোন ও পরিবারের কী হবে- এ নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও দোষীর সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।

তার ভাষ্য, তিন লাখ টাকা নেওয়ার পর প্রতি মাসে ৩৫ হাজার টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও টাকা পরিশোধ করা হয়নি। পরে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, স্ত্রী ও তিন মেয়েকে নিয়ে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়ায় বসবাস করতেন শেখ ওয়াসিম রনী।

এদিকে অভিযুক্ত মাসুমের বোনের জামাইয়ের দাবি, প্রায় আট মাস আগে ওয়াসিমের কাছ থেকে মাসুম তিন লাখ টাকা নিয়েছিলেন। ওই টাকার বিপরীতে প্রতি মাসে ৩৫ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা ছিল। পরে টাকা পরিশোধ নিয়ে ওয়াসিমের সাথে মাসুমের বিরোধ তৈরি হয়।

তিনি জানান, পুলিশের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন, গত ৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে পাওনা টাকা চাইতে ওয়াসিম মাসুমের ব্যবসায়িক কক্ষে যান। সেখানে টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে ধস্তাধস্তির সময় মাসুম ওয়াসিমের মাথায় ঘুসি মারেন বলে দাবি করেন তিনি।

তার ভাষ্য, পরে ওয়াসিম অচেতন হয়ে পড়ে গেলে তাকে ভবনের পাশের মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয়।

এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ৮ সেপ্টেম্বর মাসুমকে বাসায় না পেয়ে রাত ৮টা ৫৫ মিনিটের দিকে ওয়াসিমের স্ত্রীর ভাই মো. মুরাদ হোসেন তার মোবাইল ফোন থেকে মাসুমের সাথে যোগাযোগ করেন। তখন মাসুম জানান, তিনি ইস্কাটন এলাকায় আছেন এবং কাজ শেষ করে দেখা করবেন।

তবে দীর্ঘ সময়েও মাসুম দেখা না করায় স্বজনরা তার খোঁজ করতে থাকেন। পরে রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে মাসুম তাদের সাথে দেখা করেন। এরপর তাকে সাথে নিয়ে লালবাগ থানায় গিয়ে ওয়াসিম নিখোঁজের বিষয়ে সাধারণ ডায়েরির আবেদন করা হয়।

এজাহারে বলা হয়েছে, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ মাসুমকে সন্দেহ করে। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বি সি দাস স্ট্রিটের ওই ভবনে অভিযান চালিয়ে ওয়াসিমের লাশ উদ্ধার করা হয়।

লালবাগ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) তালেবুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, গত ৮ সেপ্টেম্বর রনী নিখোঁজ হওয়ার পর স্বজনদের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্তের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নিচতলার পাশের মাটির নিচ থেকে রনীর লাশ উদ্ধার করা হয়।

তিনি জানান, এ ঘটনায় মোহাম্মদ মাসুম চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার সাথে অন্য কেউ জড়িত কিনা, হত্যার প্রকৃত কারণ ও বিস্তারিত তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। হত্যা মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

টাকা ও লেনদেনকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের কারণ কিনা জানতে চাইলে ডিসি তালেবুর রহমান বলেন, প্রাথমিকভাবে মাসুমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহত রনীর সাথে তার আর্থিক লেনদেন ছিল। পাওনা টাকা আদায়ের জন্য তার বাসায় গেলে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে রনীকে আঘাত করে গুরুতর আহত করা হয়। পরে তার হাত-পা বেঁধে রাখা হয় এবং পরবর্তীতে গলা টিপে হত্যা করা হয়। এরপর ওয়াসিমকে ওই অফিসের পেছনের একটি সরু গলিতে পুঁতে রাখা হয়েছিল।

পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, মৃত্যুর সঠিক সময় ও ধরন, ঘটনায় অন্য কারো সম্পৃক্ততা এবং লাশ গোপনের পুরো প্রক্রিয়া তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্ত শেষে এসব বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।