...|...|...

বিশেষ প্রতিবেদন

প্রচারণায় ‘জাদুকরী’ ফলন: ব্রির ধানে ল্যাব ও মাঠের ব্যবধান ৪০%

আল জুবায়ের বাদশা
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:৩৬
Shares
প্রচারণায় ‘জাদুকরী’ ফলন: ব্রির ধানে ল্যাব ও মাঠের ব্যবধান ৪০%

প্রতি বছরই উচ্চফলনশীল, খরা, লবণাক্ততা কিংবা প্লাবনসহনশীল নতুন নতুন ধানের জাত উদ্ভাবনের বার্তা দেয় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। জাতীয় বীজ বোর্ডের অনুমোদন পাওয়া এসব জাতের ‘সম্ভাব্য ফলন’ বা ‘সর্বোচ্চ উৎপাদন ক্ষমতা’র চোখধাঁধানো পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয় প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক গবেষণা প্রতিবেদনে। তা অনেকটা রূপকথার মতো মনে হয়। তবে গবেষণাগার ও নিয়ন্ত্রিত ট্রায়াল প্লটের সীমানা পেরিয়ে এই বীজ যখন সাধারণ কৃষকের হাতে পৌঁছায়, তখন চিত্র আমূল বদলে যায়। ব্রির নথিতে দেখানো সম্ভাব্য ফলন আর কৃষকের প্রকৃত উৎপাদনের মধ্যে গড়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ব্যবধান থেকে যাচ্ছে। 

ব্রির সর্বশেষ গবেষণা ও বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বোরো ও রোপা আমন মৌসুমে অবমুক্ত আধুনিক জাতগুলোর সম্ভাব্য ফলন হেক্টরপ্রতি ৭ দশমিক ৫ থেকে ১০ টনেরও বেশি বলে দাবি করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ব্রি ধান৮৯ ও ব্রি ধান৯২-এর সম্ভাব্য ফলন দেখানো হয় হেক্টরপ্রতি ৮ দশমিক ৫ থেকে ৯ দশমিক ৫ টন (বিঘাপ্রতি ২৫ থেকে ৩৩ দশমিক ৫ মণ)। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই) ও মাঠপর্যায়ের কৃষকদের দেওয়া তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। তাদের মতে, সাধারণ কৃষি ব্যবস্থাপনায় কৃষকেরা এসব জাত থেকে গড়ে হেক্টরপ্রতি ৫ দশমিক ৫ থেকে ৬ দশমিক ৫ টনের (বিঘাপ্রতি ১৮ দশমিক ৪ থেকে ২১ দশমিক ৭ মণ) বেশি ধান পাচ্ছেন না। ফলে প্রতি হেক্টরে ৫০ থেকে ৮৭ দশমিক ৫ মণ পর্যন্ত ধানের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। 

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, গবেষণাভিত্তিক খামার আর বাস্তব খামারের পরিবেশের ব্যবধান কমানো না গেলে এবং কৃষক পর্যায়ে আধুনিক কৃষি উপকরণের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে কাগজে-কলমের এই ‘জাদুকরী’ ফলন কৃষকের গোলা পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব নয়।

কেন তৈরি হচ্ছে এই বিশাল ফারাক?

তথ্য বলছে, ব্রির নিজস্ব আঞ্চলিক স্টেশন বা মডেল ফিল্ডে যখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয় তখন সেখানে নিশ্চিত করা হয় শতভাগ আদর্শ পরিবেশ। সুনির্দিষ্ট মাত্রায় রাসায়নিক সার, সময়ভিত্তিক পরিমিত সেচ, সার্বক্ষণিক রোগবালাই পর্যবেক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ নজরদারি থাকে সেই প্লটগুলোতে। কিন্তু প্রান্তিক কৃষকের অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা। মাঠপর্যায়ে কৃষি সারের মূল্যবৃদ্ধি, সেচে বিদ্যুৎ বা জ্বালানি সংকট, অপ্রত্যাশিত অতিবৃষ্টি, হঠাৎ তাপমাত্রা বৃদ্ধি বা খরা এবং সঠিক সময়ে মানসম্মত কীটনাশকের অভাবজনিত সমস্যায় কৃষককে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়। ফলে গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ‘আইডিয়াল কন্ডিশন’ আর কৃষকের ‘রিয়েল ফিল্ড কন্ডিশনে’র পার্থক্যের কারণেই ফলনে এই বড় ধস নামছে।

প্রচারণায় বিভ্রান্ত, মাঠে লোকসান 

দিনাজপুর ও বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগ, পাবনা, কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন জেলার একাধিক কৃষকের সাথে কথা বলে জানা যায়, সংবাদপত্রে বা প্রচারে নতুন জাতের ‘হেক্টরে ৯ টন ফলন’ কিংবা ‘শতকে মণ মণ ধান’ দেখে তারা উৎসাহিত হয়ে নতুন জাত চাষে ঝোঁকেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সার ও সেচসংকটের কারণে ফলন ৬ টনের ওপরে ওঠে না। উল্টো নিবিড় পরিচর্যার বাড়তি খরচ মেটাতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যায়, যা তাদের লোকসানের মুখে ঠেলে দেয়। 

দিনাজপুর সদরের শেখপুরা গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম (৪৫) সংবাদমাধ্যমের প্রচারণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বোরো মৌসুমে ৩ বিঘা জমিতে ব্রি ধান৮৯ চাষ করেছিলেন। ব্রির ‘হেক্টরপ্রতি ৮.৫ থেকে ৯.৫ টন’ (বিঘা প্রতি ২৮–৩২ মণ) ফলনের তথ্যে ভরসা পেয়ে তিনি আশা করেছিলেন ৩ বিঘা থেকে অন্তত ৮৫-৯০ মণ ধান পাবেন। তবে বাস্তবে তাকে ভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। ধান কাটার পর ৩ বিঘা জমি থেকে তিনি মোট ৫৯ মণ (বিঘা প্রতি ১৭.৬ মণ) ধান পান যা ব্রির দাবির তুলনায় প্রায় ৩৩% কম। অতিরিক্ত বিনিয়োগের কারণে লাভের মুখ দেখা তো দূরে থাক, এনজিওর ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। 

বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের আরেক কৃষক মোজাফফর হোসেন (৫২) রোপা আমন মৌসুমে ৪ বিঘা জমিতে ব্রি ধান৯২ চাষ করেন। প্রদর্শনী প্লটের তথ্য দেখে তিনি আশা করেছিলেন বিঘা প্রতি অন্তত ৩০ মণ করে মোট ১২০ মণ ধান পাবেন। ​ধানের মোড়ক ও ফুল ফোটার সংবেদনশীল সময়ে ওই অঞ্চলে তাপমাত্রা হঠাৎ বৃদ্ধি পায় এবং দীর্ঘ খরা দেখা দেয়। ব্রির ট্রায়াল ফিল্ডের মতো কৃত্রিম সেচব্যবস্থা বা সার্বক্ষণিক বৈজ্ঞানিক তদারকি তার ছিল না। একই সাথে বাদামী গাছফড়িংয়ের আক্রমণ সময়মতো শনাক্ত করতে না পারায় ফলন আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৪ বিঘা থেকে তিনি পান মাত্র ৮২ মণ ধান (বিঘা প্রতি ২০.৫ মণ)- যা ব্রির সম্ভাব্য হিসাবের চেয়ে প্রায় ৩২% কম। পোকা দমনে অতিরিক্ত খরচ ও প্রত্যাশিত ফলন না পাওয়ায় লাভের মূলধন হারিয়েছেন এই কৃষক। 

কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষকদের মতে, ল্যাব বা গবেষণা কেন্দ্রের অনুকূল পরিবেশের সাথে কৃষকের বাস্তব খামারের উৎপাদনের এই বিশাল ব্যবধান কেবল কৃষকের আর্থিক প্রত্যাশাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না বরং সরকারের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা পরিকল্পনা ও খাদ্য উদ্বৃত্তের প্রাক্কলনেও বড় ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি করছে। তাদের মতে, উচ্চ আশা নিয়ে বেশি টাকা খরচ করন চাষ করার পর যদি কাগজের হিসাবের জায়গায় বাস্তবে ৩০-৪০ শতাংম কম ধান মেলে তবে প্রান্তিক কৃষকের আসল মূলধন পুরোটাই হাওয়া হয়ে যায়। 

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)-এর মহাপরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) ড. মো. রফিকুল ইসলাম টাইমস টুডেকে বলেন, ‘আমরা মূলত এটাকে ইয়েল্ড গ্যাপ বা ফলনের পার্থক্য বলি, যা গবেষণা মাঠ এবং কৃষক মাঠের মধ্যে দেখা যায়। কোনো জাতের প্রকৃত ফলন নির্ভর করে মূলত তার সঠিক পরিচর্যা ও উপযুক্ত ব্যবস্থাপনার ওপর। তবে সব কৃষকই যে কম ফলন পান, তা নয়; সঠিক উপায়ে পরিচর্যা করে অনেকেই প্রত্যাশিত বা তারচেয়েও বেশি ফলন পাচ্ছেন। মাঠ পর্যায়ে যারা সঠিক সময়ে সঠিক ব্যবস্থাপনা নিতে পারেন, তারা নিশ্চিতভাবেই সফল হন। 

তিনি বলেন, ​আমাদের প্রাপ্ত ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই আমরা ফলনের হিসাব বা তথ্য দিয়ে থাকি। গবেষকদের নির্দেশিত উপায়ে সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হওয়ার কারণেই মূলত মাঠ পর্যায়ে কিছুটা গ্যাপ থেকে যায়।