...|...|...

কৃষি ও প্রকৃতি

পেট ভরে, পুষ্টি মেলে না: বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার অদৃশ্য সংকট

যোবায়ের আহমদ
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৮:৪৫ | আপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৯:০৭
Shares
পেট ভরে, পুষ্টি মেলে না: বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার অদৃশ্য সংকট

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি।

থালায় ভাত আছে, পাতে কখনো মাছ বা ডিমের একটু ছোঁয়াও। তবু সেই থালা যে শরীরের সব প্রয়োজন মেটাচ্ছে না, এ কথা টের পান শুধু হিসাব কষা মানুষটি। বাংলাদেশে ক্ষুধা এখন আর শুধু শূন্য পাতের গল্প নয়। এ ক্ষুধার চেহারা পাল্টেছে। পেট ভরছে, কিন্তু পুষ্টি পৌঁছাচ্ছে না। মাঠ ভরা ফসলের পাশেই তাই বাড়ছে এক নীরব, অদৃশ্য সংকট।

পুষ্টিবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘লুকানো ক্ষুধা’। এতে মানুষ প্রয়োজনীয় ক্যালরি পেলেও আয়রন, ভিটামিন বা প্রোটিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের ঘাটতিতে ভোগে। বাইরে থেকে এর লক্ষণ সহজে চোখে পড়ে না, কিন্তু শিশুর বেড়ে ওঠা, মায়ের স্বাস্থ্য ও মানুষের কর্মক্ষমতায় এর ছাপ থেকে যায়।

এই সংকটের একটি চেনা মুখ রাজধানীর মিরপুরের আখতার হোসেন। মাসের শুরুতে বেতন হাতে পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন তিনি। কিন্তু সেই স্বস্তি টেকে না। পাঁচ সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম তিনি। বেতনের অর্ধেক চলে যায় বাসাভাড়ায়, বাকি টাকায় সামলাতে হয় চিকিৎসা, যাতায়াত ও সংসারের হাজারো খরচ। হিসাব মেলাতে গিয়ে সবার আগে বাদ পড়ে পুষ্টিকর খাবার। ভাত জোটে, কোনো দিন মাছ বা ডিমও। কিন্তু শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করার সামর্থ্য থাকে না। ফলে থালার আকার একই থাকলেও তার ভেতরের বৈচিত্র্য কমতে থাকে।

আখতার বলেন, ‘কোনো রকম খেয়ে-পরে বেঁচে আছি। সুষম খাবার বা পুষ্টিকর খাবারে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ নেই।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, আখতারের এই বাস্তবতা এখন বহু পরিবারের নিত্যদিনের ছবি। কৃষিতে উৎপাদন বাড়লেও পুষ্টিকর খাবার মানুষের পাতে তুলে দেওয়া সহজ হচ্ছে না। আজ বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রাক্কালে প্রশ্নটা তাই আর শুধু ‘কত ফলন’ নয়, বরং ‘কার পাতে কী পৌঁছাচ্ছে’।

যুদ্ধের ধাক্কা লাগছে খাদ্য ও জ্বালানির বাজারে

বিশ্ব খাদ্যনিরাপত্তার বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি এখন আন্তর্জাতিক সংঘাত। ইউক্রেনকে বলা হয় ইউরোপের শস্যভান্ডার। গম, ভুট্টা ও সূর্যমুখী তেলের উৎপাদন ও রপ্তানিতে দেশটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর দেশটির কৃষি উৎপাদন, বন্দর ও রপ্তানিব্যবস্থা বড় বাধার মুখে পড়ে। কৃষিজমির ক্ষতি, শ্রমিকসংকট ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে বিশ্ববাজারে শস্যের সরবরাহ ও দামে অনিশ্চয়তা বাড়ে। জ্বালানি ও সারের দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদনের খরচও বাড়ে। কারণ সেচ থেকে শুরু করে সার উৎপাদন, ফসল তোলা, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপেই জ্বালানি লাগে।

চলতি বছর ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের এক কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়, হরমুজ দিয়ে সার পরিবহন বাধাগ্রস্ত থাকলে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্যসংকটের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ইউরিয়া ও সালফারের মতো উপকরণের সরবরাহ ব্যাহত হলে উৎপাদন খরচ ও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা থাকে।

বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। জ্বালানি ও কৃষি উপকরণের আমদানি ব্যয় বাড়লে চাপ পড়ে কৃষক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা, সবার ওপর। শেষ পর্যন্ত সীমিত আয়ের পরিবারগুলো খাবারের পরিমাণ কমানোর পাশাপাশি তুলনামূলক দামি পুষ্টিকর খাবার কেনাও কমিয়ে দেয়।

জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ফসল

যুদ্ধের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন তৈরি করছে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টি, খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততা কৃষি উৎপাদনকে অনিশ্চিত করে তুলছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ও ভারী শিল্প থেকে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাস বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়াচ্ছে। এতে কৃষিজমি, পানির প্রাপ্যতা ও ফসলের উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যা, খরা ও অন্যান্য দুর্যোগ কৃষিতে সরাসরি ক্ষতির পাশাপাশি কৃষকের জীবিকা, অবকাঠামো ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশও এই ঝুঁকির বাইরে নয়। এফএওর হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বোরো ধানের উৎপাদন প্রায় ৩ কোটি ১৯ লাখ টন হওয়ার পূর্বাভাস আছে। তবে মে থেকে জুলাই পর্যন্ত বন্যা ও ভূমিধসে দেশের কয়েকটি অঞ্চলে ফসলের ক্ষতি হয়েছে। একই প্রতিবেদনে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর সময়ে প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষের তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদন ভালো হলেও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর আয় ও জীবিকা দ্রুত না ফিরলে তাদের খাবার কেনার সামর্থ্য কমে যায়। তাই জলবায়ু-সহনশীল ফসলের জাত, উন্নত সেচব্যবস্থা, আগাম সতর্কতা ও ক্ষতিপূরণমূলক সহায়তা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য জরুরি।

মাঠ থেকে থালা, মাঝপথে হারিয়ে যায় বিপুল খাবার

সংকটের আরেকটি বড় কারণ উৎপাদন-পরবর্তী ক্ষতি ও অপচয়। গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), এফএও, বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ও ডেনমার্ক দূতাবাসের যৌথ আয়োজনে খাদ্যের ক্ষতি ও অপচয়বিষয়ক এক সম্মেলন হয়। সেখানে জানানো হয়, বাংলাদেশে উৎপাদিত খাদ্যের আনুমানিক ৩৪ শতাংশ নষ্ট বা অপচয় হয়। এর অর্থমূল্য জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশের সমান।

এর অর্থ, ফসল ফলাতে যে সার, পানি, জ্বালানি ও শ্রম খরচ হয়েছে, তার একটি বড় অংশও বৃথা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফসল কাটার পর যথাযথ সংরক্ষণের অভাব, পরিবহনে ক্ষতি, হিমাগারের সীমাবদ্ধতা ও দুর্বল বাজারজাতকরণ অপচয় বাড়ায়। আবার পরিবার, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও খুচরা বাজারেও প্রচুর খাবার ফেলে দেওয়া হয়।

বৈশ্বিক চিত্রও উদ্বেগজনক। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বে প্রায় ১০৫ কোটি টন খাদ্য নষ্ট হয়েছে। ভোক্তা পর্যায়ে প্রাপ্য খাদ্যের প্রায় ১৯ শতাংশ ছিল এই অপচয়ের অংশ।

অর্থাৎ একদিকে মানুষ পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারছে না, অন্যদিকে উৎপাদিত খাবারের উল্লেখযোগ্য অংশ মানুষের পাতে পৌঁছাচ্ছেই না। আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা, উন্নত পরিবহন, বাজার ব্যবস্থাপনা ও অপচয় কমানোর উদ্যোগ জোরদার করা গেলে বিদ্যমান খাদ্যসম্পদের আরও কার্যকর ব্যবহার সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

কৃষিতে সাফল্য, তবু কেন সংকট

উন্নত জাতের ফসল, আধুনিক সেচ, কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার ও গবেষণার ফলে বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে। এফএওর হিসাবে, ২০২৬ সালে বোরো ধানের উৎপাদন আগের বছরের উচ্চ উৎপাদনের কাছাকাছি থাকতে পারে। কিন্তু উৎপাদনের এই সাফল্য সবার খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্যনিরাপত্তা শুধু উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষকের উৎপাদন খরচ ও ন্যায্যমূল্য, বাজারে সরবরাহ, সংরক্ষণ এবং ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা। ধানের ফলন বাড়লেও ডাল, তেলবীজ, ফল, শাকসবজি ও প্রাণিজ খাদ্যের পর্যাপ্ত ও সাশ্রয়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ শুধু ভাত দিয়ে শরীরের সব পুষ্টি পূরণ হয় না।

জাতিসংঘের পাঁচ সংস্থার যৌথ প্রতিবেদন দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড (২০২৫) অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ২৩০ কোটি মানুষ মাঝারি বা তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছেন। একই বছর প্রায় ২৬০ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকা অনুসরণের সামর্থ্য রাখেননি। প্রতিবেদনে পুষ্টিকর খাবারের উচ্চ দামকে খাদ্যনিরাপত্তার বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মূল চ্যালেঞ্জ এখন উৎপাদনের পাশাপাশি খাবারের আর্থিক প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। এজন্য প্রয়োজন সীমিত আয়ের পরিবারের সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানো, খাদ্যমূল্যের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং পুষ্টিকর খাবার সহজলভ্য করার উদ্যোগ।

পাশাপাশি শিশু ও মায়েদের পুষ্টি, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকেও খাদ্যনিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। কারণ খাবার পেটে পৌঁছালেই পুষ্টি কাজে লাগে না; অসুস্থতা ও অনিরাপদ পানি শরীরের পুষ্টি গ্রহণে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।