...|...|...

সারাদেশ

পুলিশ বলপ্রয়োগ করলে ফ্যাসিস্ট, না করলে দুর্বলতার অভিযোগ: আইজিপি

খুলনা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, সন্ধ্যা ৭:৪৯
Shares
পুলিশ বলপ্রয়োগ করলে ফ্যাসিস্ট, না করলে দুর্বলতার অভিযোগ: আইজিপি

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। ছবি: টাইমস টুডে

অপরাধ দমনে কঠোরতা বজায় রাখার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছে জনবান্ধব হয়ে ওঠার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাকে পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। তার মতে, আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে বলপ্রয়োগ করলে পুলিশ সমালোচনার মুখে পড়ে, আবার কঠোরতা না দেখালে দুর্বলতার অভিযোগ ওঠে। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং কার্যকর পুলিশিং প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

আইন প্রয়োগে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের বিষয়টি তুলে ধরে আইজিপি বলেন, বলপ্রয়োগ করলে এক পক্ষ পুলিশকে ফ্যাসিস্ট আখ্যা দেয়, আর বলপ্রয়োগ না করলে পুলিশের দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তিনি বলেন, তারা এ ধরনের দ্বিমুখী পরিস্থিতি দেখতে চান না।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) লাইন্সে কমিউনিটি পুলিশিংবিষয়ক সুধী সমাবেশ শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে এসব কথা বলেন আইজিপি। এ সময় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অপরাধ দমনের কৌশল এবং পুলিশের সাথে জনগণের সম্পর্ক পুনর্গঠনের বিষয়গুলো উঠে আসে।

আইজিপি বলেন, গত ১৭ বছরে বিভিন্ন কার্যক্রমের কারণে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে একধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় পুলিশকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর লক্ষ্যেই তার খুলনা সফর।

আইজিপির বক্তব্যে অপরাধ দমনে পুলিশের ক্ষমতা প্রয়োগের পাশাপাশি দায়িত্বশীলতা ও জনআস্থার বিষয়টিও সামনে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করার গুরুত্বও তার বক্তব্যে উঠে এসেছে।

চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে নতুন আইন প্রণয়নের প্রস্তাবের কথা জানিয়ে আইজিপি বলেন, অনেক সময় প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা তাদের আশ্রয়ে থাকা ব্যক্তিরা চাঁদাবাজিতে জড়িত থাকেন। ভয়ে সাধারণ মানুষ অভিযোগ করতে বা সাক্ষ্য দিতে চান না।

তিনি জানান, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে নতুন আইন প্রণয়নের প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে পুলিশ যাতে নিজ উদ্যোগে মামলা করে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে, সেই সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেলে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

তবে নতুন আইন প্রণয়নের প্রস্তাব বাস্তবায়নের আগে এর চূড়ান্ত বিধান, প্রয়োগের সীমা এবং কার্যকর হওয়ার সময়সীমা সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।

অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার পরও কেউ কেউ জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন বলে মন্তব্য করেন আইজিপি। এ ধরনের অপরাধ স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।

মাদক, কিশোর গ্যাং, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুলিশের কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে স্বরাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কমিউনিটি পুলিশিংকে পুলিশের একটি বিশেষ শাখা হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনার আওতায় আনার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, ৫ আগস্টের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কী অবস্থায় ছিল, তা সবার জানা। সে সময় পুলিশ নিষ্ক্রিয় ছিল এবং বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলেছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বর্তমানে দেশের সব জায়গায় পুলিশের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে বলে দাবি করেন আইজিপি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। বেকারত্বসহ বিভিন্ন সমস্যার রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়, তবে সার্বিক অবস্থার দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে।

আইজিপির বক্তব্যে পুলিশের সামনে থাকা একটি মৌলিক প্রশ্ন স্পষ্ট হয়েছে-শুধু অভিযান ও গ্রেফতারের মাধ্যমে কি অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব, নাকি সাধারণ মানুষকে নির্ভয়ে অভিযোগ জানানোর পরিবেশও তৈরি করতে হবে?

চাঁদাবাজির শিকার ব্যক্তি ভয়ের কারণে অভিযোগ করতে না চাইলে পুলিশের নিজস্ব উদ্যোগে মামলা করার পরিকল্পনা অপরাধ দমনে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই, নিরপেক্ষ তদন্ত, সাক্ষীর নিরাপত্তা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

একইভাবে জনবান্ধব পুলিশিং প্রতিষ্ঠার অর্থ অপরাধের ক্ষেত্রে শিথিলতা নয়; বরং আইন মেনে, বৈষম্যহীনভাবে এবং জবাবদিহির সাথে দায়িত্ব পালন করা।

খুলনায় আইজিপির বক্তব্য তাই শুধু একটি সফর বা সুধী সমাবেশের বিবরণে সীমাবদ্ধ নয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে দেশজুড়ে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা, অপরাধ দমনে আইনি ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্ন। এসব উদ্যোগ বাস্তবে কতটা পরিবর্তন আনতে পারে, তার উত্তর মিলবে আইন ও নীতিমালার যথাযথ প্রয়োগের মধ্য দিয়ে।