পাহাড়ের সবুজ বুকজুড়ে এখন সোনালি রঙের ছোঁয়া। ঢালু পাহাড়ের জুমগুলোতে পাকতে শুরু করেছে ধান। কোথাও চলছে ধান কাটার ব্যস্ততা, আবার কোথাও পাকা ফসল রক্ষায় জুম পাহারা দিচ্ছেন চাষিরা। ধানের পাশাপাশি জুমে আবাদ করা নানা ধরনের সাথি ফসলও ঘরে তোলার প্রস্তুতি চলছে।
সম্প্রতি বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার তারাছা ইউনিয়নের যামিনী পাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এমন দৃশ্য।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় প্রকৃতিনির্ভর এই কৃষি ব্যবস্থায় বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর জুমের ধান ঘরে তুলতে শুরু করেছেন চাষিরা। পাহাড়ের সবুজের মাঝে পাকা ধানের সোনালি আভা যেন জানান দিচ্ছে—এসেছে ফসল ঘরে তোলার সময়।
জুমচাষিরা বলছেন, চলতি মৌসুমে সময়মতো বৃষ্টিপাত হওয়ায় অনেক এলাকায় ধানের ফলন ভালো হয়েছে। তবে পাহাড়ের একেক এলাকায় বৃষ্টিপাতের তারতম্যের কারণে সব জুমে একই সময়ে ধান পাকে না। বৈশাখের শুরুতেই প্রথম বৃষ্টির পর যারা দ্রুত বীজ বপন করতে পেরেছেন, তাদের জুমের ধান আগে কাটার উপযোগী হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, যামিনী পাড়ায় পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি শ্রমের বিনিময়ে কাজ করা আট নারী শ্রমিককে নিয়ে জুমের পাকা ধান কাটছেন রিং লট ম্রো (৫৭)।
রিং লট ম্রো জানান, চলতি বছর তিন আড়ি বীজের ধান দিয়ে প্রায় তিন একর পাহাড়ি জমিতে জুম চাষ করেছেন তিনি। প্রতি আড়িতে প্রায় ১০ কেজি বীজের ধান লাগে। সময়মতো বৃষ্টি হওয়ায় এবার ফলন নিয়ে সন্তুষ্ট তিনি।
তিনি বলেন, ‘আগে সময়মতো রোদ-বৃষ্টি হলে জুমের ধান ভালো হতো। এখন সময়মতো রোদ-বৃষ্টি হয় না। প্রকৃতিও যেন উল্টো হয়ে গেছে। তারপরও এ বছর জুমের ফলন নিয়ে আমি সন্তুষ্ট।’
তার হিসাব অনুযায়ী, তিন একর জুম থেকে এবার প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ আড়ি ধান পাওয়ার আশা করছেন তিনি। ফলন আরও ভালো হলে আড়াইশ আড়ি পর্যন্ত ধান পাওয়া সম্ভব হতো বলেও জানান তিনি।
দীর্ঘ ২৫ বছর পুলিশে চাকরি করার পর চলতি বছরের জুনে অবসরে যান রিং লট ম্রো। চাকরি থেকে অবসরের পর আবারও ফিরে এসেছেন বাপ-দাদার ঐতিহ্যবাহী পেশা জুম চাষে।
রিং লট ম্রো বলেন, ‘জুমে শুধু ধান হয় না। বেগুন, মারফা, তিল, যব, ভুট্টা, চিনাল, মরিচ, রোজেলাসহ ৩০ থেকে ৩৫ ধরনের সাথি ফসল হয়। বাজার থেকে শুধু লবণ আর নাপ্পি কিনলেই চলে। জুম যেন আমাদের জন্য একটি বাজারের মতো। প্রয়োজনীয় অনেক সবজি এখান থেকেই পাওয়া যায়।’
জুমের ধান কাটার কাজে ব্যস্ত নারী শ্রমিক সংডং ম্রো (১৯) বলেন, ‘জুম না করলে আমরা কী খাবো? জুম করতেই হবে। প্রতিবছর আমরা জুম চাষ করি। এটা আমাদের ঐতিহ্য।’
তিনি জানান, ধানের পাশাপাশি মিষ্টি কুমড়া, মারফা, বেগুন, ভুট্টা, তিল, মরিচ ও ঢেঁড়সসহ বিভিন্ন সাথি ফসলও জুমে চাষ করা হয়। এসব ফসল নিজেদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাজারে বিক্রি করে আয় করেন চাষিরা।
প্রকৃতির ছন্দেই জুমের কৃষি
জুম চাষ এক মৌসুমের কাজ নয়। পরবর্তী বছরের জুমের জায়গা নির্বাচন থেকেই শুরু হয় দীর্ঘ এই কৃষি প্রক্রিয়া। সাধারণত নভেম্বর-ডিসেম্বরে নতুন জুমের জায়গা নির্ধারণ করা হয়। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয় জঙ্গল কাটার কাজ।
কাটা জঙ্গল শুকিয়ে গেলে মার্চ-এপ্রিলের দিকে নির্দিষ্ট স্থানে ‘ফায়ারিং লাইন’ তৈরি করে আগুনে পোড়ানো হয়। এরপর জুমের জমি পরিষ্কার করে ধান ও অন্যান্য ফসলের বীজ বপনের জন্য প্রস্তুত করা হয়।
জুমচাষিদের অপেক্ষা থাকে প্রথম বৃষ্টির জন্য। বৈশাখের শুরুতে বৃষ্টি নামলেই শুরু হয় বীজ বপন। বৃষ্টির পর যত দ্রুত বীজ বপন করা যায়, সাধারণত তত আগেই ধান কাটার উপযোগী হয়। ফলে পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন সময়ে শুরু হয় জুমের ফসল কাটার কাজ।
বাড়ছে জুমের আবাদ
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জুম চাষের পরিমাণ বেড়েছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে জুম আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ হাজার ১৬২ হেক্টর। ওই বছর আবাদ হয় ৮ হাজার ৫৪০ হেক্টর জমিতে এবং উৎপাদন হয় ১০ হাজার ৪৮৯ দশমিক ৭১ মেট্রিক টন।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮ হাজার ৪৮৭ হেক্টর আবাদ ও ১২ হাজার ৬২৪ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আবাদ হয় ৮ হাজার ২৬৭ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন হয় ১২ হাজার ৪৯৯ দশমিক ৪১ মেট্রিক টন চাল।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জুম আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ হাজার ৮৯৫ হেক্টর। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, একই পরিমাণ জমিতে জুম আবাদ হয়েছে। এ বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ৩৮৭ দশমিক ৯৩ মেট্রিক টন চাল।
বান্দরবানের বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় ইতোমধ্যে পাকা জুমের ধান কাটা শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে জেলার অন্য এলাকাগুলোতেও শুরু হবে ফসল ঘরে তোলার কাজ।
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ তৌফিক আহমেদ নূর বলেন, ‘চলতি বছর বান্দরবানে প্রায় ১১ হাজার ৮৯৫ হেক্টর জমিতে জুমের আবাদ হয়েছে। জুমে ধানের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সাথি ফসলও উৎপাদন হয়ে থাকে।’
তিনি বলেন, ‘এ বছর জুমের ফলন ভালো হওয়ার আশা করা যাচ্ছে। তবে পার্বত্য অঞ্চল হওয়ায় সব জায়গায় সমানভাবে বৃষ্টিপাত হয় না। ফলে একেক এলাকার ফলন একেক রকম হয়।’
তিনি আরও জানান, রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি ও আলীকদম উপজেলার দুর্গম এলাকায় ইতোমধ্যে জুমের পাকা ধান কাটা শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য উপজেলাতেও ধান কাটা শুরু হবে। জুমের উৎপাদন বাড়াতে কৃষি বিভাগ চাষিদের বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দিয়ে থাকে।
পাহাড়ের ঢালে ঢালে এখন তাই ব্যস্ততা ফসল ঘরে তোলার। দীর্ঘ কয়েক মাসের শ্রম, অপেক্ষা আর প্রকৃতির সাথে লড়াই শেষে জুমের সোনালি ধান হাতে পেয়ে হাসি ফুটছে চাষিদের মুখে। তাদের কাছে এই ফসল শুধু খাবারের জোগান নয়—জুম তাদের জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা ঐতিহ্যের অংশ।


