...|...|...

বিশ্ব

নোবেল পুরস্কারের আদ্যোপান্ত: মনোনয়ন থেকে পুরস্কার বিতরণ প্রক্রিয়া

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১২:৫৯
Shares
নোবেল পুরস্কারের আদ্যোপান্ত: মনোনয়ন থেকে পুরস্কার বিতরণ প্রক্রিয়া

ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা হলো নোবেল পুরস্কার। নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তদের ইংরেজিতে নোবেল লরিয়েট বলা হয়। বছরের এই সময়ে নোবেল পুরস্কার কমিটিগুলো বিজয়ী বিজ্ঞানী ও ব্যক্তিদের নাম ঘোষণা করে। বিজয়ী নির্বাচন করার পুরো বিষয় খুব গোপনীয়তার মধ্যে হয়ে থাকে। বিজয়ী ব্যক্তিদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয় ডিসেম্বরের বিশেষ আয়োজনে। সম্মাননার পাশাপাশি নোবেল বিজয়ী পান ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। সাথে চমৎকার একটি বাঁধাই করা শিল্পকর্ম ও একটি খাঁটি সোনার পদক দেওয়া হয়। কিন্তু বিশ্বজুড়ে সেরা ব্যক্তিদের এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার কীভাবে দেওয়া হয়, জানা আছে কি? কারা তাদের নোবেল পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করেন?

নোবেল পুরস্কার আসলে কী

নোবেল পুরস্কার ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে প্রবর্তিত একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার, যা ঐ বছর থেকে সারা পৃথিবীর বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সফল ও অনন্য সাধারণ গবেষণা ও উদ্ভাবন বা মানবকল্যাণমূলক তুলনারহিত কর্মকাণ্ডের জন্য প্রদান করা হচ্ছে। মূল নোবেল পুরস্কার পাঁচটি বিষয়ের উপর দেওয়া হয়: পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসা শাস্ত্র, সাহিত্য, ও শান্তি, যা নোবেলের উইলে উল্লেখ করা হয়েছে।সুয়েডীয় বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের ১৮৯৫ সালে করে যাওয়া একটি উইলের মর্মানুসারে এই পুরস্কার প্রচলন করা হয়। আলফ্রেড নোবেলের স্মরণে ১৯৬৮ সালে সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেভেরিগেস রিক্সব্যাঙ্ক কর্তৃক অর্থনৈতিক বিজ্ঞানে নোবেল স্মারক পুরস্কার নামে ষষ্ঠ পুরস্কার প্রতিষ্ঠা করা হয়। নোবেল পুরস্কার ১৯০১ সাল প্রবর্তিত হলেও অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কার প্রদান শুরু হয় ১৯৬৯ সালে।

নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তদের ইংরেজিতে নোবেল লরিয়েট বলা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য ১৯৪০ সাল থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত পুরস্কার প্রদান বন্ধ ছিল। শুধু শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয় নরওয়ের অসলোতে। বাকি সব ক্ষেত্রে সুইডেনের স্টকহোমে এই পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।

১৯০১ থেকে ২০২৩ এর মধ্যে ১০০০ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। নোবেল পুরস্কার মৃত কোনো ব্যক্তিকে দেওয়া হয় না। লরিয়েটকে অবশ্যই পুরস্কার প্রদানের সময় জীবিত থাকতে হবে। কিন্তু এর কিছু ব্যতিক্রম আছে। অতি গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য মরণোত্তর পুরস্কারও দেওয়া হয়।
প্রতি বছর পুরস্কারপ্রাপ্তদের প্রত্যেকে একটি স্বর্ণপদক, একটি সনদ এবং নোবেল ফাউন্ডেশন কর্তৃক উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ পেয়ে থাকেন। ২০২৩ সালে এ অর্থের পরিমাণ ছিল ৯.৮৬ লক্ষ সুইডিশ ক্রোনা অর্থ্যাৎ প্রায় ১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

কীভাবে এবং কত সময়ে নির্বাচিত হন নোবেল বিজয়ী

পুরো বিজয়ী নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগে প্রায় ১৬ মাস। পুরস্কার দেওয়ার আগের বছরের সেপ্টেম্বর মাসেই গোপন চিঠি বা অনুরোধপত্র পাঠায় নোবেল কমিটি। অর্থাৎ কমিটি এখনই আগামী বছরের পুরস্কারের জন্য কাজ শুরু করে দিয়েছে।

আগের বছরের সেপ্টেম্বরে জীবিত নোবেলজয়ী, অ্যাসেম্বলি সদস্য ও নির্দিষ্ট কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের কাছে গোপনে মনোনয়ন ফরম পাঠানো হয়। ফরম জমার শেষ সময় ৩১ জানুয়ারি। তবে এসব নথি অন্তত ৫০ বছরের জন্য সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়। জমা হওয়া নামের ওপর ভিত্তি করে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করে বিশেষজ্ঞ দল। এতে মূল গুরুত্ব পায় বিজ্ঞানীদের নতুন আবিষ্কার বা উদ্ভাবন।

সব নাম জমা হওয়ার পর নোবেল কমিটি সেই তালিকা ছোট করতে থাকে। মনোনীত ব্যক্তিদের কাজ নিয়ে গভীর গবেষণা চালানো হয়। কারণ, কোনো আবিষ্কার সত্যি সত্যি যুগান্তকারী কি না এবং মূল কৃতিত্ব কার, তা নিশ্চিত হওয়া খুব জরুরি। অনেক সময় ল্যাবের প্রধানের নামে নিবন্ধ ছাপা হলেও আসল উদ্ভাবনী ধারণাটি হয়তো কোনো শিক্ষার্থী বা তরুণ গবেষকের হতে পারে। এসব বিচার-বিশ্লেষণ করতেই অনেকটা সময় পার হয়ে যায়।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আসল গবেষক বা বিজ্ঞানীদের চিহ্নিত করা। কারণ, নিয়ম অনুযায়ী একটি নোবেল সর্বোচ্চ তিনজনের মধ্যে ভাগ করা যায়। এই তিনজনের নিয়মের কারণে অনেক সময় মূল দলের অনেকেই বাদ পড়েন, যা নিয়ে বেশ বিতর্কও রয়েছে। তবে পুরস্কারের সম্মান ধরে রাখতে নোবেল ফাউন্ডেশন এই কঠোর নিয়ম চালু করেছিল।

দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ শেষে নোবেল কমিটি যখন একমত হয়, তখন অক্টোবরের প্রথম সোমবার থেকে একের পর এক বিজয়ীদের নাম প্রকাশ করা শুরু হয়। প্রতিদিন সুইডেনের সময় বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে একে একে চিকিৎসাবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, সাহিত্য ও শান্তিতে নোবেলবিজয়ীদের নাম জানানো হয়। পরের সপ্তাহে ঘোষণা করা হয় অর্থনীতিতে নোবেলপ্রাপ্তদের নাম।

এরপর ডিসেম্বরের ১০ তারিখ আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে সুইডেনের স্টকহোমে জমকালো আয়োজনে নোবেল বিজয়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ১৮ ক্যারেটের স্বর্ণপদক ও সম্মাননা সনদ। তবে শান্তি পুরস্কারটি নরওয়ের অসলোতে প্রদান করা হয়।