নামাজ ইসলামের অন্যতম রুকন ও প্রধান ইবাদত। আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ করার সবচেয়ে বড় মাধ্যম নামাজ। আল্লাহর সাথে মুমিনের দুনিয়াবি সাক্ষাত নামাজ। দুনিয়া ও আখেরাতে সফল হওয়ার সবচেয়ে বড় নিয়ামক নামাজ। কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম এই ইবাদতের হিসাব গ্রহণ করা হবে। তাই অনেকেই বুঝতে চান বা জানতে চান আল্লাহর দরবারে তার এই ইবাদতটি কবুল হচ্ছে কি না।
ইসলামে নামাজসহ যেকোনো ইবাদত কবুল হওয়ার বিষয়টি মূলত পরকালীন ও গায়েবি বিষয়, যা দুনিয়াতে নিশ্চিতভাবে জানার কোনো প্রত্যক্ষ মাধ্যম নেই। তবে এমন কিছু ইতিবাচক আলামত বা লক্ষণ রয়েছে- যা পর্যালোচনা করলে একজন বান্দা স্বস্তি ও আশা পেতে পারেন যে, আল্লাহ তা’আলা তার নামাজ কবুল করছেন। এখানে নামাজ কবুল হওয়ার চারটি আলামত আলোচনা করলাম।
১. অন্যায় ও পাপাচার থেকে বেঁচে থাকা
নামাজ কবুল হওয়ার সবচেয়ে বড় ও দৃশ্যমান আলামত হলো নামাজির পাপ ও অন্যায় কাজ করার প্রবণতা কমে যাওয়া। একজন মানুষ যদি নিয়মিত নামাজ আদায় করে, পাশাপাশি অন্যান্য পাপ কাজও করে, তাহলে বুঝতে হবে তার নামাজের রুহ বা আত্মায় গলদ রয়েছে। প্রকৃত ও গ্রহণযোগ্য নামাজ মানুষের অন্তরকে কলুষমুক্ত করে এবং তাকে মন্দ কাজ থেকে দূরে রাখে।
আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘‘নিশ্চয়ই নামাজ মানুষকে অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’’ (সুরা আনকাবুত: ৪৫)
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘‘যার নামাজ তাকে অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখল না, তার নামাজ আল্লাহর সাথে তার দূরত্বই বাড়ায়।’’ (আহমদ ফিয যুহদ)
২. নামাজের পর অন্তরে শান্তি ও প্রশান্তি অনুভব
সঠিকভাবে খুশু-খুজুর (একগ্রতা ও বিনয়) সাথে আদায়কৃত নামাজ বান্দার অন্তরে এক অদ্ভুত স্বর্গীয় প্রশান্তি এনে দেয়। নামাজ শেষে যদি মনে হয় অন্তরের অস্থিরতা দূর হয়ে এক ধরনের পবিত্র আমেজ সৃষ্টি হয়েছে, তবে এটি ইবাদত কবুলের একটি লক্ষণ।
আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘‘যারা কুফরি করেছে, তারা বলে, তার নিকট তার রবের পক্ষ থেকে কোনো নিদর্শন কেন নাজিল হয় না? বল, নিশ্চয় আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যে তার অভিমুখী হয়, তাকে তিনি তাঁর দিকে পথ দেখান। যারা ইমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; শোনো, আল্লাহর স্মরণেই তো অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।’’ (সুরা রা’দ: ২৭, ২৮)
হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন কোনো কঠিন পরিস্থিতি বা মানসিক চাপের মুখোমুখি হতেন, তখন তিনি নামাজের মাধ্যমে অন্তরের প্রশান্তি খুঁজতেন। হজরত বেলালকে (রা.) উদ্দেশ্য করে তিনি একবার বলেছিলেন, বেলাল! নামাজের ইকামত দাও, (নামাজের মাধ্যমে) আমাদের একটু শান্ত করো। (সুনানে আবু দাউদ)
৩. অন্য ইবাদতের তওফিক লাভ
ওলামায়ে কেরামের মতে, কোনো সৎকাজের সওয়াব বা ইবাদত কবুল হওয়ার অন্যতম নিদর্শন হলো, পরবর্তী সময়ে আরেকটি সৎকাজ করার তওফিক লাভ করা। অর্থাৎ, আপনি যদি ফজরের নামাজ সঠিকভাবে আদায় করতে পারেন এবং এর বদৌলতে জোহরের নামাজ আদায়ের আগ্রহ বা অন্য কোনো নেক আমলের সুযোগ তৈরি হয়, তবে এটি পূর্ববর্তী ইবাদত কবুল হওয়ার আলামত।
আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘‘যারা সৎ পথ অবলম্বন করে আল্লাহ তাদের সৎ পথে চলার শক্তি বৃদ্ধি করেন এবং তাদেরকে মুত্তাকি হওয়ার শক্তি দান করেন।’’ (সুরা মুহাম্মদ: ১৭)
৪. সুন্নত অনুসরণ করে ধীরস্থিরভাবে নামাজ আদায়ের তওফিক
নামাজ কবুল হওয়ার আরেকটি আলামত হলো হলো, নামাজ রাসুলুল্লাহর (সা.) শেখানো পদ্ধতিতে রুকু, সেজদা ও কিয়াম সঠিকভাবে আদায় করতে পারা। তাড়াহুড়ো না করে ধীরস্থিরতার সাথে ধুলো-বালিমুক্ত মন নিয়ে নামাজ আদায় করতে পারা। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘‘তোমরা ঠিক সেভাবে নামাজ আদায় করো, যেভাবে আমাকে নামাজ আদায় করতে দেখেছ।’’ (সহিহ বুখারি)
অন্য এক হাদিসে ধীরস্থিরতার সাথে নামাজ আদায়ের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘নিকৃষ্টতম চোর হলো সেই ব্যক্তি, যে নিজের নামাজে চুরি করে। সাহাবীগণ আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! সে কীভাবে নামাজে চুরি করে? তিনি বললেন, সে নামাজের রুকু ও সিজদা পূর্ণাঙ্গভাবে আদায় করে না।’’ (মুসনাদে আহমাদ: ২২৬৯৫)
ইবাদত কবুল হওয়ার বিষয়ে বান্দাকে সব সময় আশা ও ভয়ের মাঝে থাকতে হবে। বিনয় ও আকুতি নিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে যেন তিনি আমাদের ত্রুটিযুক্ত আমলগুলোকে নিজের দয়ায় কবুল করে নেন।
হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.) বায়তুল্লাহ নির্মাণের মতো মহান কাজ শেষ করেও বিনয়ের সাথে দোয়া করেছিলেন, ‘‘হে আমাদের রব! আমাদের পক্ষ থেকে এটি কবুল করুন।’’ তাই নামাজ শেষে আমাদেরও সর্বদা আল্লাহর কাছে ইবাদত কবুলের জন্য দোয়া করা উচিত।

