...|...|...

সারাদেশ

ধর্মীয় কারণে নয়, ধানের ক্ষতি ও নদীভাঙনের শঙ্কায় নৌকাবাইচ বন্ধ

সিলেট প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, রাত ১১:৫৩ | আপডেট: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১২:৪২
Shares
ধর্মীয় কারণে নয়, ধানের ক্ষতি ও নদীভাঙনের শঙ্কায় নৌকাবাইচ বন্ধ

সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার সুনাই নদীতে আগামী ২৮ আগস্ট অনুষ্ঠিতব্য নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা বন্ধের দাবিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। কয়েকটি গণমাধ্যমে ‘তৌহিদী জনতা’ নামের একটি পক্ষ ধর্মীয় কারণে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি জানিয়েছে-এমন খবর প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।

তবে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি তোলা একাধিক ব্যক্তি পরে গণমাধ্যমকে জানান, ধর্মীয় কারণে নয়; কৃষকের ধান রক্ষা, নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তারা এই আয়োজন বন্ধের দাবি তুলেছেন। তাদের ভাষ্য, নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে প্রতিবছরই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। মারামারির কারণে গত বছরও এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়নি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবিতে প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করেন মাসুম বিন নুর উদ্দিন নামের এক যুবক। গত ১৮ আগস্ট রাত ৭টা ২৯ মিনিটে তিনি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্টার শেয়ার করেন। সেখানে প্রথমবারের মতো ‘তৌহিদী জনতা লাউতা ইউনিয়ন’ নামটি দেখা যায়।

এরপর রাত ৮টা ৯ মিনিটে পোস্টটি সম্পাদনা করে তিনি আরও একটি পোস্টার যুক্ত করেন। এতে লেখা ছিল, ‘সুনাই নদীতে আগত নৌকাবাইচ বন্ধের প্রতিবাদে পরামর্শ সভা।’ পোস্টারে ‘ঈমানি দায়িত্ববোধে’ সবাইকে সভায় উপস্থিত থাকার আহ্বান জানানো হয়।

যদিও দ্বিতীয় পোস্টারে ‘নৌকাবাইচ বন্ধের প্রতিবাদে পরামর্শ সভা’র কথা লেখা ছিল, মাসুম বিন নুর উদ্দিনের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ব্যক্তিগতভাবে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবিতেই সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ওটা ভুল করে লিখেছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে নৌকাবাইচ বন্ধ চাই। তবে এখানে ধর্মীয় কোনো বিষয় নেই। নদীভাঙন ঠেকাতেই এ কথা বলেছি।’

গত ২০ আগস্ট বারিগ্রাম বাজার মসজিদে এ বিষয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে মাসুম বিন নুর উদ্দিন ‘মুক্ত বাতাস’ নামের একটি ফেসবুক পেজে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। পেজটি মূলত তিনিই পরিচালনা করেন বলে জানা গেছে।

ভিডিওতে স্থানীয় আলেম ও মুরব্বিদের বক্তব্য তুলে ধরা হয়। বক্তব্যগুলোর বড় অংশজুড়ে ছিল নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং কৃষকদের ধান রক্ষার বিষয়টি। কয়েকজন ধর্মীয় পরিবেশের কথাও উল্লেখ করেন। তবে ভিডিওতে নৌকাবাইচকে সরাসরি ধর্মবিরোধী বলা হয়নি। বরং এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে জুয়ার আসরসহ বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলে সেগুলোকে হারাম বলা হয়েছে।

ভিডিওতে এক আলেমকে বলতে শোনা যায়, এলাকার পরিবেশ ও ধর্মীয় অবস্থান সুন্দর রাখা, বিশৃঙ্খলা এড়ানো এবং নদীভাঙন ঠেকানোর স্বার্থে নৌকাবাইচ বন্ধ করা প্রয়োজন।

আরেকজন মুরব্বি বলেন, অতীতে এ ধরনের আয়োজনকে কেন্দ্র করে একজন পুরুষ ও একজন নারীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে এবং নৌকাবাইচে মারামারির ঘটনাও ঘটেছে। নদীর দুই পাশের ধানের ক্ষেত নষ্ট হলে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। পাশাপাশি আয়োজনকে ঘিরে সম্ভাব্য অসামাজিক কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

প্রবীণ আলেম মাওলানা নুরুর রহমান মাসুক বলেন, এটি কোনো ধর্মীয় বিষয় নয়, বরং সম্পূর্ণ সামাজিক ও জনস্বার্থের বিষয়। ‘তৌহিদী জনতা’ কিংবা নাগরিক সমাজের নামে কারা ব্যানার করেছে, সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই। তবে এলাকার সচেতন নাগরিকদের মূল দাবি হলো, এ অঞ্চলে আর নৌকাবাইচ আয়োজন না করা।

তিনি আরও বলেন, অতীতে নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে দুই নৌকার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে অনেকে আহত হয়েছেন, এমনকি হাত-পা ভাঙার মতো ঘটনাও ঘটেছে। নৌকাবাইচের আশপাশে গানের আসরকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর ঘটনাও ঘটেছে। ফলে এত বড় আয়োজনকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।

বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে হাবিবা মজুমদার বলেন, নৌকাবাইচের কারণে নদীর পাড় ও আশপাশের আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় প্রতিবছরই মারামারির ঘটনা ঘটে। গত বছরও সংঘর্ষের কারণে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়নি।

তিনি বলেন, এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এক পক্ষ নৌকাবাইচ বন্ধ চাচ্ছে, আবার অন্য পক্ষ প্রতিযোগিতা আয়োজনের পক্ষে রয়েছে। বিষয়টি স্থানীয় একটি ইস্যু। উভয় পক্ষকে নিয়ে বসে সমাধানের জন্য স্থানীয় চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

ইউএনও আরও বলেন, প্রশাসনিক অনুমতি নিয়েই আয়োজকদের নৌকাবাইচ আয়োজন করতে হবে। আয়োজনকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে কি না, সেটিও প্রশাসন বিবেচনা করে দেখবে।