...|...|...

লাইফস্টাইল

দুপুরে খাওয়ার পর ঘুম পাচ্ছে? জেনে নিন কারণ

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, বিকেল ৩:৪৭ | আপডেট: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ৩:৩৯
Shares
দুপুরে খাওয়ার পর ঘুম পাচ্ছে? জেনে নিন কারণ

ছবি: এআই জেনারেটেড

দুপুরে ভাত খেয়ে অফিসের চেয়ারে হেলান দিতেই চোখ বুজে আসে, ক্লাসের বেঞ্চে বসে শিক্ষকের কথা কানে যায় না, কিংবা গাড়ি চালাতে চালাতেও হঠাৎ পাতা ভারী হয়ে ওঠে- দুপুরের খাবারের পরের এই ঘুম ঘুম ভাবটা আমাদের প্রায় সবারই চেনা অভিজ্ঞতা। একে অনেকেই বলেন ‘ভাতঘুম’, ইংরেজিতে এর নাম ‘ফুড কোমা’, আর বিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় ‘পোস্টপ্র্যানডিয়াল সমনোলেন্স (postprandial somnolence)’।

বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত একটা ভুল ধারণা আছে যে, খাওয়ার পর নাকি মস্তিষ্ক থেকে রক্ত সরে গিয়ে পাকস্থলীতে চলে যায়, তাই ঘুম পায়। কিন্তু বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে ব্যাপারটা এত সহজ নয়। চলুন যুক্তরাষ্ট্রের স্লিপ ফাউন্ডেশন, ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক ও বিভিন্ন গবেষণাপত্রের তথ্যের ভিত্তিতে আসল কারণগুলো বিস্তারিত জেনে নিই।

‘রক্ত পেটে চলে যায়’- এই কথাটা কি সত্যি?

অনেকেই বিশ্বাস করেন, খাবার হজমের জন্য শরীর মস্তিষ্ক থেকে রক্ত সরিয়ে পাকস্থলীর দিকে পাঠিয়ে দেয়, আর তাতেই মাথা ঝিমঝিম করে ঘুম পায়। কিন্তু স্লিপ ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, এই ধারণাটি বৈজ্ঞানিকভাবে ইতিমধ্যে খণ্ডন করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, খাওয়ার পর ক্যারোটিড আর্টারি (ঘাড়ের মূল রক্তনালি, যা মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ করে) দিয়ে রক্ত প্রবাহের পরিমাণ আসলে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে না। অর্থাৎ পুরো বিষয়টা মস্তিষ্কে রক্তের ঘাটতির মতো সহজ কোনো ব্যাপার নয়, বরং এর পেছনে কাজ করে একাধিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া, যেগুলো একসাথে মিলেই এই ভাতঘুমের অনুভূতি তৈরি করে।

আসল কারণগুলো কী কী

১. শরীরের নিজস্ব জৈবিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম

আমাদের শরীরে এমনিতেই একটি প্রাকৃতিক ছন্দ কাজ করে, যাকে বলে সার্কাডিয়ান রিদম। জাতীয় স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান NCBI-র তথ্য অনুযায়ী, দিনের শুরুর দিকে জাগ্রত থাকার সংকেত দেওয়া এই ছন্দটি দুপুরের দিকে এমনিতেই কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে।

অর্থাৎ, দুপুর ১টা-২টার দিকে ঘুম পাওয়ার একটা প্রাকৃতিক প্রবণতা আমাদের শরীরে আগে থেকেই বিদ্যমান থাকে- আপনি খাবার খান বা না খান, এই সময়টায় শরীর এমনিতেই কিছুটা ধীর হয়ে আসে। দুপুরের ভারী খাবার এসে সেই স্বাভাবিক নিম্নমুখী প্রবণতার সাথে যুক্ত হয়ে ঘুম ঘুম ভাবটাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

২. হরমোন ও রাসায়নিক পরিবর্তন

খাবার খাওয়ার পর শরীরে একাধিক হরমোন সক্রিয় হয়ে ওঠে, যেগুলো ঘুম পাওয়ার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।

  • কোলেসিস্টোকিনিন (CCK): খাবার হজমে সহায়তাকারী এই হরমোন খাওয়ার পরপরই নিঃসৃত হয়, আর এটি একই সাথে তৃপ্তি ও প্রশান্তির অনুভূতি তৈরি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষত উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার খেলে CCK-র মাত্রা তুলনামূলক বেশি বেড়ে যায়, আর এর সাথে ঘুম ঘুম ভাবের সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
  • ইনসুলিন: ভাত বা অন্য শর্করাজাতীয় খাবার খেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যায়, আর তা নিয়ন্ত্রণে শরীর থেকে ইনসুলিন নিঃসৃত হয়। এই ইনসুলিন আবার ট্রিপটোফ্যান নামের একটি অ্যামিনো অ্যাসিডকে সহজে মস্তিষ্কে প্রবেশ করতে সাহায্য করে, যা থেকে তৈরি হয় সেরোটোনিন এবং পরবর্তীতে মেলাটোনিন- দুটোই ঘুম নিয়ন্ত্রণকারী গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক পদার্থ।
  • সাইটোকাইন: বিশেষ করে উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর শরীরে নির্দিষ্ট কিছু সাইটোকাইনের মাত্রাও বেড়ে যায়, যা ক্লান্তির অনুভূতি বাড়িয়ে দিতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

৩. প্যারাসিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম সক্রিয় হয়ে ওঠা

খাওয়ার পর শরীরের স্নায়ুতন্ত্রের একটি অংশ, যাকে বলা হয় প্যারাসিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম, সক্রিয় হয়ে ওঠে। অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিদ রাজশ্রী রায়ের ভাষ্যে, এটি মূলত ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ প্রতিক্রিয়ার একদম বিপরীত একটি অবস্থা- শরীর তখন যেন নিজেই বার্তা পাঠায়, ‘এবার একটু ধীর হও, আমরা এখন খাবার হজমে মনোযোগ দিচ্ছি’। এটি মূলত শরীরের ক্ষুধা ও তৃপ্তির স্বাভাবিক সংকেত ব্যবস্থারই একটি অংশ।

৪. খাবারের ধরন ও পরিমাণ

খাবারে কী আছে আর কতটা আছে- এই দুটোই ঘুম পাওয়ার তীব্রতা অনেকখানি নির্ধারণ করে দেয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার তিন ঘণ্টা পর মানুষ উচ্চ শর্করাযুক্ত খাবারের তুলনায় বেশি ক্লান্তি অনুভব করে।

আবার একবারে অনেক বেশি পরিমাণে খাবার খেলে তা হজমের জন্য শরীরকে বাড়তি পরিশ্রম করতে হয়, যা এমনিতেই বিকেলের স্বাভাবিক ঝিমুনির সঙ্গে মিলে গিয়ে ক্লান্তি বাড়িয়ে দেয়।

৫. বিবর্তনীয় ব্যাখ্যা

কেন প্রকৃতি আমাদের শরীরে এমন ব্যবস্থা রেখে দিল, তার একটি আকর্ষণীয় ব্যাখ্যাও বিজ্ঞানীরা দিয়েছেন। এবিসি নিউজে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১২ হাজার বছর আগে মানুষ যখন শিকারি-সংগ্রাহক জীবন ছেড়ে কৃষিভিত্তিক জীবনে প্রবেশ করে, তখন থেকেই এই খাদ্য-পরবর্তী ঝিমুনির প্রমাণ পাওয়া যায়।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, বড় খাবার খাওয়ার পর সাময়িক অবসাদ আসলে একটি বিবর্তনীয় কৌশল- এটি নিশ্চিত করে যে খাওয়ার পর শরীর শিকার বা পরিশ্রম বন্ধ রেখে হজম প্রক্রিয়ায় মনোযোগ দিতে পারে, আর পাশাপাশি শক্তি সংরক্ষণেও সহায়তা করে।

দুপুরের ঘুম কি শুধু আমাদের দেশেই দেখা যায়

আসলে না- বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতিতেই দুপুরের এই ঝিমুনিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে ভিন্ন ভিন্নভাবে। স্পেন ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে দুপুরের খাবারের পর ছোট্ট একটা ঘুমকে বলা হয় ‘সিয়েস্তা’, যা তাদের দৈনন্দিন সংস্কৃতিরই অংশ।

জাপানে অফিস বা স্কুলে কাজের ফাঁকে ঝিমিয়ে পড়াকে বলা হয় ‘ইনেমুরি’, যা সেখানে সামাজিকভাবে বেশ স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশেও গ্রামাঞ্চলে দুপুরের ভরপেট খাবারের পর কিছুক্ষণ গড়িয়ে নেওয়ার চল বহু পুরনো- অর্থাৎ, ‘ভাতঘুম’ আসলে একটি সর্বজনীন মানবিক প্রবণতারই স্থানীয় নাম মাত্র।

দুপুরের ঘুম ঘুম ভাব কমাতে করণীয়

দুপুরের এই ঝিমুনি পুরোপুরি এড়ানো হয়তো সম্ভব নয়, তবে ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক ও অন্যান্য স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু অভ্যাস মেনে চললে এর তীব্রতা অনেকখানি কমানো সম্ভব:

  • একবারে বেশি না খেয়ে পরিমিত খাবার খান- পেট ঠাসা করে খাওয়ার বদলে মাঝারি পরিমাণে খেলে হজমের চাপ কম পড়ে, ফলে ঝিমুনিও কম হয়।
  • উচ্চ চর্বিযুক্ত ও ভারী খাবার কিছুটা এড়িয়ে চলুন-  বিশেষ করে এমন দিনে যখন খাওয়ার পরপরই গুরুত্বপূর্ণ কাজ বা মিটিং আছে।
  • খাবারের সাথে অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন- অ্যালকোহল অ্যাডেনোসিন নামের একটি স্নায়ু-রাসায়নিক পদার্থের কার্যকারিতা বাড়িয়ে দেয়, যা ঘুম পাওয়ার প্রবণতাকে আরও তীব্র করে তোলে।
  • খাওয়ার পর কিছুটা হাঁটাচলা করুন- হালকা শারীরিক নড়াচড়া রক্ত সঞ্চালন সচল রাখে এবং ঝিমুনি কমাতে সাহায্য করে।
  • রাতের ঘুম নিয়মিত ও পর্যাপ্ত রাখুন- রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হলে দিনের বেলার এই স্বাভাবিক ঝিমুনি আরও তীব্র হয়ে দেখা দিতে পারে।
  • পর্যাপ্ত পানি পান করুন- কারণ শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিলে তা ক্লান্তি ও অবসাদ বাড়িয়ে দিতে পারে।

কখন এটি চিন্তার বিষয় হতে পারে

মাঝেমধ্যে দুপুরের খাবারের পর কিছুটা ঝিমুনি লাগা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং এটি নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। তবে ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রতিদিন খাওয়ার পর অতিরিক্ত মাত্রায় ক্লান্তি অনুভব করলে, বা তার সাথে বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা কিংবা মাথায় ঝাপসা লাগার (ব্রেইন ফগ) মতো উপসর্গ দেখা দিলে, সেটি ডায়াবেটিস, রক্তস্বল্পতা, থাইরয়েডের সমস্যা কিংবা স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো কোনো অন্তর্নিহিত শারীরিক সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।

বিশেষত যারা গাড়ি চালান বা ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করেন, তাদের ক্ষেত্রে খাওয়ার পরের এই ঝিমুনি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে- তাই এমন অবস্থায় গাড়ি না চালিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়াই ভালো। এমন উপসর্গ ঘন ঘন দেখা দিলে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

তথ্যসূত্র: Sleep Foundation, Cleveland Clinic, ABC News, GoodRx, Medical News Today, National Center for Biotechnology Information (NCBI)