রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলার বাঙ্গালহালিয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের দুর্গম নাইক্যছড়া মারমাপাড়ায় দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ একটি ভ্যালি ব্রিজ দিয়ে চলাচল করছেন প্রায় দুই শতাধিক পরিবারের মানুষ। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ব্রিজটির বিভিন্ন অংশ ভেঙে গেছে। কোথাও বেরিয়ে এসেছে রেলিংয়ের লোহার রড, আবার কোথাও রেলিং নেই বললেই চলে। ফলে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্রিজটি পার হচ্ছেন শিক্ষার্থী, নারী, শিশু, বয়স্ক ও সাধারণ পথচারীরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় দুই দশক আগে নির্মিত এই ব্রিজে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর কোনো সংস্কারকাজ হয়নি। বর্তমানে যানবাহন চলাচলের সময় পুরো ব্রিজ কেঁপে ওঠে। বিকল্প কোনো সড়ক বা সেতু না থাকায় বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে এলাকাবাসীকে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রায় ১২০ ফুট দীর্ঘ ও ৫ ফুট প্রস্থের ভ্যালি ব্রিজটির দুই পাশের রেলিংয়ের বেশ কিছু অংশ ভেঙে গেছে। বিভিন্ন জায়গায় রেলিংয়ের লোহার রড বেরিয়ে আছে। ব্রিজের ওপর দিয়ে পথচারীদের পাশাপাশি মোটরসাইকেল ও ছোট সিএনজি জাতীয় যানবাহন চলাচল করছে। একই সময়ে পথচারী ও যানবাহন পার হওয়ার সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়।
বিশেষ করে শিশু ও স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন এই ব্রিজ ব্যবহার করতে হয়। সকালে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার সময় যেমন ঝুঁকি নিয়ে ব্রিজ পার হয়, তেমনি বিকেলে বাড়ি ফেরার সময়ও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এ কারণে শিশুদের নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে সবসময় উদ্বেগ কাজ করে।
শুধু শিক্ষার্থী নয়, স্থানীয়দের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সাথেও ব্রিজটির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বাজারে যাওয়া, কৃষিপণ্য পরিবহন, রোগী হাসপাতালে নেওয়া কিংবা জরুরি প্রয়োজনে অন্য এলাকায় যাওয়ার ক্ষেত্রে এই সেতুই তাদের প্রধান ভরসা। কিন্তু ব্রিজটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এসব কাজেও প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, নির্মাণের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও ব্রিজটির বড় ধরনের সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ হয়নি। সময়ের সাথে সাথে এর বিভিন্ন অংশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পাহাড়ি ঢল ও অতিরিক্ত বৃষ্টির সময় ব্রিজের ওপর দিয়ে চলাচল করা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা উসাচিং মারমা বলেন, প্রায় ২০ বছর আগে ব্রিজটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এত বছর পার হলেও এর বড় ধরনের কোনো মেরামত করা হয়নি। বর্তমানে যানবাহন চলাচলের সময় ব্রিজটি কেঁপে ওঠে। দুই পাশের রেলিংও নষ্ট হয়ে গেছে। বিকল্প কোনো পথ না থাকায় বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। দ্রুত এখানে নতুন একটি সেতু নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, এলাকার ছেলে-মেয়েরা প্রতিদিন এই ব্রিজ দিয়ে স্কুলে যায়। সেতুর অবস্থা দেখে সবসময় ভয় হয়। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
বাঙ্গালহালিয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য থোয়াইসুইমং মারমা বলেন, নাইক্যছড়া দুর্গম পাড়ার এই ভ্যালি ব্রিজটি দীর্ঘদিন ধরে বেহাল অবস্থায় রয়েছে। ব্রিজের দুই পাশের রেলিং ভেঙে পড়েছে এবং বিভিন্ন জায়গায় লোহার রড বের হয়ে গেছে। তারপরও এলাকার মানুষ প্রতিদিন নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে এই সেতু ব্যবহার করছেন।
তিনি আরও বলেন, ব্রিজ দিয়ে চলাচলের সময় ছোট শিশুরা নিচে পড়ে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। জরুরি প্রয়োজনে গর্ভবতী নারী কিংবা অসুস্থ রোগীদের ছোট যানবাহনে করে নেওয়ার সময়ও নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। ব্রিজ সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের জন্য এখনো কোনো দপ্তর থেকে বরাদ্দ নিশ্চিত হয়নি। মানুষের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দ্রুত ব্রিজটি সংস্কার অথবা নতুন করে নির্মাণ করা জরুরি।
স্থানীয়দের দাবি, পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত না হলে শিক্ষা, চিকিৎসা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মানুষের দুর্ভোগ কমবে না। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ একটি সেতু দীর্ঘদিন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
এলাকাবাসী বলছেন, সেতুটি তাদের কাছে শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি প্রায় দুই শতাধিক পরিবারের শিক্ষা, চিকিৎসা, বাজার ও কর্মসংস্থানের সাথে সরাসরি যুক্ত। তাই সাময়িকভাবে জোড়াতালি দিয়ে নয়, টেকসই সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
দুর্ঘটনা ঘটার পর সংস্কারের উদ্যোগ না নিয়ে আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত সরেজমিনে পরিদর্শন করে সেতুটির বর্তমান অবস্থা যাচাই করবে এবং প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিয়ে সংস্কার অথবা নতুন সেতু নির্মাণের ব্যবস্থা করবে।
এলাকাবাসীর একটাই দাবি-ঝুঁকিপূর্ণ এই ভ্যালি ব্রিজটি দ্রুত সংস্কার কিংবা পুনর্নির্মাণ করে নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।


