চাঁদপুর সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের নিবন্ধিত জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত চাল থেকে প্রায় ৫ মেট্রিক টন (৪,৯৩০ কেজি) চাল চুরি ও বিক্রি প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকার অভিযোগে ইউনিয়নের প্রশাসনিক কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা শামীমকে চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সাথে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) বিকেলে নিশ্চিত করেছেন জেলা প্রশাসক (ডিসি) আহমেদ জিয়াউর রহমান।
তিনি বলেন, চাল জব্দের পর রাতেই ওই প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়। এরপর থেকে তাকে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি জিজ্ঞাবাদ করেন। জিজ্ঞাসাবাদের পর সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে আটক রেখে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং বিভাগীয় মামলা প্রক্রিয়াধীন। তবে ওই কর্মকর্তা শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় তাকে সরকারি জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
এর আগে রবিবার (১১ অক্টোবর) গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চাঁদপুর সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রত্যয় হাশেম অভিযান চালিয়ে সিএসডি গোডাউন থেকে চুরি হয়ে যাওয়া ৪৯৩০ কেজি অর্থাৎ প্রায় ৫ টন চাল মিনি ট্রাকসহ জব্দ করেন। পরে ওই চাল সিএসডি গোডাউনে সংরক্ষণ করা হয়।
চুরির পর বিক্রি করে দেওয়া চাল নিয়ে যাচ্ছিলেন পিকআপ চালক শাহাদাত। তার বাড়ি কল্যাণপুরের রংয়েরগাঁও।
তিনি জানান, চাঁদপুর কেন্দ্রীয় খাদ্য সংরক্ষণাগার (সিএসডি) গোডাউন থেকে তিনি ওই চালের ভাড়া নিয়ে কুমিল্লার লাকসামে যাচ্ছিলেন। চালের মালিকের নাম বলা হয়নি। বলা হয়েছে লাকসাম পৌঁছালে ওই ব্যক্তির নাম দেওয়া হবে। কিন্তু পথে হাজীগঞ্জে এলে আমার কাছে ফোন আসে চালগুলো ফেরত নিয়ে আসার জন্য। বিক্রিত টোকেনে চালের পরিমাণ লেখা ছিল ৪৯৩০ কেজি। চালের মালিকের নাম ছিল না।
চালের ক্রেতা পরিচয় দেওয়া ব্যবসায়ী ইউনুস বলেন, ‘লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের প্রশাসনিক কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা শামীমের কাছ থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার বিনিময়ে পাঁচ মেট্রিক টন চাল কিনেছি। দুপুরে খাদ্যগুদাম থেকে চাল উত্তোলনের পর সেগুলো জেলার বাইরে পাঠাচ্ছিলাম। তবে পথে আলীগঞ্জ এলাকা থেকে প্রশাসনের নির্দেশে চালের গাড়িটি চাঁদপুরে ফিরিয়ে আনা হয়।’
ইউনুসের ও গাড়ির চালক শাহাদাতের এই বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তাকে আটকের পূর্বে লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের প্রশাসনিক কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা শামীম বলেন, গোডাউন থেকে চালগুলো ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে আসার কথা ছিল। কিন্তু পরে খবর পাই চালগুলো অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়েছে। চাল বিক্রির অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে এ ঘটনায় জড়ানো হচ্ছে। এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না।
গোলাম মোস্তফা শামীম বলেন, ‘লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নে জেলে ৪৯৭০ জন। আমরা ৪৯৩০ জনের জন্য ২৫ কেজি হারে চাল বরাদ্দ পেয়েছি। যা ২২/২৩ কেজি করে দিয়ে সমন্বয় করে জেলেদের চাল বুঝিয়ে দেবো। এখন গোডাউনে ২২০০ বস্তা চাল রয়েছে। গোডাউনে ধারণক্ষমতা কম থাকায় চাল ধাপে ধাপে আনছিলাম। আমি আবার ইবাহীমপুর ইউনিয়নেরও দায়িত্বে রয়েছি। সেই ইউনিয়নের চালও এখান থেকে দিয়েছি। তাদেরটা দেওয়া শেষ হওয়ায় গোডাউন খালি হওয়া সাপেক্ষে লক্ষ্মীপুরের চালগুলো ধাপে ধাপে আনতেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘লক্ষ্মীপুরের জেলেদের জন্য মোট বরাদ্দ ১১৩ টন চাল। এখন পর্যন্ত এনেছি ১০৪ টন। এবার ৫ টন চাল রিসিভ করে আমি ট্রাক ভাড়া করে বহরিয়ায় আনার জন্য চাল ট্রাকে তুলে দিয়ে আমি পরিষদে চলে আসি। এখন সেই চাল শুনি হাজীগঞ্জের দিকে চলে গেছে।’
তিনি আরও জানান, আমার এখনো আরও ৪ টন চাল আনা বাকি। বুধবারের মধ্যে সব চাল এনে একসাথে করে চাল জেলেদের দেবো। এর মধ্যে এই কাণ্ড ঘটে গেল!
তিনি বলেন, ‘গাড়িচালককে বহরিয়ায় চাল আনার জন্য ঠিক করেছি। সে চাল নিয়ে হাজীগঞ্জ কেন গেল এর কারণ তদন্ত হওয়া জরুরি। আমার গ্রামপুলিশরা জেলে কার্ড বিতরণে ব্যস্ত থাকায় তাদেরকে গাড়ির সাথে দিতে পারিনি। আমি নিজে গাড়িতে চাল উঠিয়ে দিয়ে পরিষদে চলে আসি। আর এরমধ্যে এই কাণ্ড। আমি এখনো তো চালই দিলাম না। তাহলে চাল পাচার বা চুরি কিংবা বিক্রি করব কীভাবে? একটি সিন্ডিকেট আমাকে ফাঁসাতে চক্রান্ত করে এ ঘটনা ঘটাতে পারে। আমি এর সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে বিচার চাই।’
চাঁদপুর সদরের এসিল্যান্ড প্রত্যয় হাশেম বলেন, ‘৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর ২২ দিন মা ইলিশ প্রজননকালীন সময়ে নিবন্ধিত জেলেদের খাদ্য সহায়তা ২৫ কেজি হিসেবে চাল বরাদ্দ দেয় সরকার। সেই আলোকে সদরের লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের ৪ হাজার ৯৭০ জেলের জন্য বরাদ্দের চালের মধ্যে উদ্ধার হওয়া প্রায় ৫ টন চাল এখন গাড়িসহ সিএসডি গোডাউনে জব্দ রয়েছে। এ ঘটনায় ৩ সদস্যের তদন্ত টিমের রিপোর্টের আলোকে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’


