...|...|...

সারাদেশ

জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি: পানি সম্পদমন্ত্রী

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ভোর রাত ৫:১৩
Shares
জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি: পানি সম্পদমন্ত্রী

ছবি: টাইমস টুডে

চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রকল্প-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণ, খাল-নালা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার আন্তঃসংযোগ এবং সিটি করপোরেশনের কার্যকর সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এমপি।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে টাইগারপাসে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে জলাবদ্ধতা নিরসনে করণীয় নির্ধারণে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

পানি সম্পদমন্ত্রী বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না। প্রকল্প শেষ হওয়ার পর সেটি কীভাবে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে, পানি কীভাবে প্রবাহিত হবে এবং ছোট-বড় খাল, ড্রেন ও অন্যান্য জলপ্রবাহের মধ্যে কীভাবে কার্যকর সংযোগ থাকবে, তা পরিকল্পনার শুরুতেই বিবেচনায় নিতে হবে।

তিনি বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন সংস্থা জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের পর খাল, ড্রেন ও পানি নিষ্কাশন অবকাঠামোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, রক্ষণাবেক্ষণ ও দখলমুক্ত রাখার দায়িত্ব কার, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। না হলে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।

মন্ত্রী বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের চলমান কাজগুলো শেষ পর্যায়ে রয়েছে। কয়েকটি খাল ও সংশ্লিষ্ট রেগুলেটরের কাজ শেষ হলে পানি প্রবাহের সক্ষমতা বাড়বে। তবে এসব ব্যবস্থার সাথে মহানগরীর ছোট খাল, নালা ও সংযোগ খালগুলোর আন্তঃসংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। একটি অংশের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা অন্য অংশের সাথে যুক্ত না থাকলে কোথাও পানি আটকে জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, প্রকল্প শেষ হওয়ার পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না হলে কয়েক বছর পর আবারও একই সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই চসিকসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করতে হবে। প্রয়োজন হলে সিটি করপোরেশনের জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ, জনবল ও প্রয়োজনীয় সক্ষমতার ব্যবস্থা করতে হবে।

চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে কোনো একক সংস্থার পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড, চসিক, সিডিএ, সেনাবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সেবা সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের নভেম্বরে দায়িত্ব নেওয়ার সময় নগরীর অনেক এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে যেত। এরপর বিভিন্ন এলাকায় খাল-নালা পরিষ্কার, সংস্কার ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করা হয়েছে। এর ফলে ২০২৫ সাল থেকে বহদ্দারহাটসহ অনেক এলাকায় আগের মতো পানি ওঠেনি বলে দাবি করেন তিনি।

মেয়র বলেন, এ বছর চট্টগ্রামে একদিনে সর্বোচ্চ ৪১২ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর আগে ২০০৭ সালে একদিনে ৪০৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছিল। অতিবৃষ্টির পাশাপাশি পাহাড়ি ঢল এবং পাহাড় কাটার কারণে খাল-নালায় মাটি ও বালু জমে যাওয়াও জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ।

তিনি জানান, নগরের প্রায় ৪০টি খাল নিয়ে চসিকের একটি ডিপিপি রয়েছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনীর বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের আওতায়ও কয়েকটি খালের সংস্কার ও পুনঃখননের কাজ চলছে। সেনাবাহিনীর প্রকল্পের আওতাধীন খালগুলো তারা করবে এবং অন্যান্য খালের কাজ চসিক করবে।

সেনাবাহিনীর চলমান প্রকল্পের প্রশংসা করে মেয়র বলেন, খাল ও জলাধারের জায়গা উদ্ধার, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজ করা হচ্ছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে অনেক জায়গায় উচ্ছেদ কার্যক্রম কঠিন হলেও সংশ্লিষ্টরা কাজটি এগিয়ে নিয়েছেন।

চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ বলেন, বড় খাল সংস্কার ও সুইসগেট নির্মাণের পাশাপাশি ছোট নালা ও খালের সাথে কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। ছোট নালা থেকে বড় খাল এবং সেখান থেকে নদী পর্যন্ত পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত না হলে জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব হবে না।

তিনি বলেন, বিভিন্ন এলাকায় নালা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও আবার রাস্তার নিচ দিয়ে পানি পারাপারের জন্য প্রয়োজনীয় ক্রস ড্রেনেজ না থাকায় পানি এক পাশ থেকে অন্য পাশে যেতে পারছে না। আগামী বর্ষার আগেই যেসব খাল ও নালা পরিষ্কার বা সংস্কার প্রয়োজন, সেগুলো চিহ্নিত করে কাজ শেষ করার আহ্বান জানান তিনি।

চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান বলেন, বিচ্ছিন্নভাবে কোনো একটি খাল বা নালা সংস্কার করে জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব নয়। পুরো পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম-১০ আসনের চারটি খালের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এসব খালকে কীভাবে আরও কার্যকর করা যায় এবং মহেশখালের সঙ্গে কীভাবে যথাযথভাবে যুক্ত করা যায়, তা বিবেচনা করতে হবে।

সাঈদ আল নোমান আরও বলেন, স্লুইসগেট ও পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামোর সমস্যাগুলো সমাধানে পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম ওয়াসা, চসিকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে সমন্বিত বৈঠক করা প্রয়োজন। কোন স্লুইসগেট কোথায়, এর মালিকানা কার, সক্ষমতা কত এবং কোথায় কী সমস্যা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সভায় সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি খালের সংস্কার ও পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ৫ হাজার ৭০০টি বৈধ ও অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করা হয়েছে। কয়েকটি স্থাপনা এখনো অপসারণ করা বাকি রয়েছে।

তিনি বলেন, খাল সংস্কার ও পুনরুদ্ধারের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা না হলে আবারও দখল, ময়লা-আবর্জনা ও ভরাটের কারণে কাঙ্ক্ষিত সুফল নষ্ট হতে পারে। তাই চলমান প্রকল্পের পাশাপাশি পৃথক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাও প্রয়োজন।

বেলায়েত হোসেন বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন একটি চলমান প্রক্রিয়া। খালের প্রবাহ, ধারণক্ষমতা, সংযোগ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি দখল ও অবৈধ স্থাপনা ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি রাখতে হবে।

সভায় চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম মো. জানে আলম, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার নুসরাত সুলতানা, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূইয়া, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক কর্নেল তারিকসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বক্তব্য দেন।

সভায় মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি, খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা, পানি নিষ্কাশনের প্রতিবন্ধকতা, খাল দখল ও ভরাট, রেগুলেটর ব্যবস্থাপনা এবং প্রকল্প-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে আলোচনা হয়।