ছয়টি আদালতের জন্য বিচারক ছয়জন থাকার কথা। কিন্তু খুলনায় বাস্তব চিত্র যেন ঠিক তার উল্টো। ছয় মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের তিনটিই গত এক মাসের বেশি সময় ধরে বিচারকশূন্য। ফলে ছয় আদালতের প্রায় ১৯ হাজার মামলার ভার সামলাতে হচ্ছে মাত্র তিনজন বিচারককে। এতে একদিকে প্রতিটি আদালতে মামলার চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে বিচারপ্রার্থীদের অপেক্ষাও দীর্ঘ হচ্ছে।
খুলনা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত সূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ১৯ হাজার ৪৬টি। এর সাথে প্রতিদিন নগরীর বিভিন্ন থানা থেকে নতুন মামলা যুক্ত হচ্ছে। ফলে মামলার মোট সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
অর্থাৎ বর্তমানে তিনজন বিচারকের ওপর গড়ে ছয় হাজারের বেশি মামলার চাপ রয়েছে। এত বিপুলসংখ্যক মামলা সীমিত বিচারক দিয়ে পরিচালনা করতে গিয়ে স্বাভাবিক বিচারিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে মামলার চাপ কিছুটা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে মহানগর দায়রা জজ আদালতসহ অন্যান্য উপযুক্ত আদালতে পাঠানো হচ্ছে। এ পর্যন্ত ২ হাজার ৫৬২টি মামলা বিচারের জন্য পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৪২৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।
সিএমএম আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা তপন কুমার সাহা বলেন, খুলনা মেট্রোপলিটন এলাকার বিচারকার্য পরিচালনার জন্য ছয়টি আদালত রয়েছে। কিন্তু গত এক মাসের বেশি সময় ধরে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটসহ আরও দুজন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বদলিজনিত কারণে পদশূন্য রয়েছে। তাঁর ভাষায়, আদালতগুলোতে মামলার সংখ্যা ১৯ হাজারের বেশি। এই বিপুলসংখ্যক মামলা মাত্র তিনজন বিচারকের পক্ষে সামাল দেওয়া অত্যন্ত কঠিন।
এ পরিস্থিতি শুধু মামলার সংখ্যা দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। প্রতিদিন নতুন মামলা গ্রহণ, জামিন শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ, অভিযোগ গঠন, বিভিন্ন আবেদন নিষ্পত্তি এবং অন্যান্য বিচারিক কার্যক্রমের পাশাপাশি পুরোনো মামলাগুলোও এগিয়ে নিতে হচ্ছে একই বিচারকদের।
ফলে একটি আদালতের এজলাসে যে সময় ও মনোযোগ একটি মামলায় দেওয়ার কথা, বিপুল মামলার চাপের মধ্যে সেই সময়ও ভাগ হয়ে যাচ্ছে অসংখ্য মামলার মধ্যে।
খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির প্রবীণ সদস্য আঃ মালেক বলেন, আদালতে বিচারক সংকট থাকলে বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হন। বাদীপক্ষ সময়মতো সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেন না। অন্যদিকে আসামিদেরও দীর্ঘদিন আদালতে ঘোরাফেরা করতে হয়। এতে তাদের সময় ও অর্থ দুইয়েরই ক্ষতি হয়। তিনি দ্রুত বিচারকের শূন্য পদগুলো পূরণের জন্য রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে অনুরোধ জানান।
মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা খুলনার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম মনে করেন, মামলার দীর্ঘসূত্রিতা ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। তাঁর মতে, অনেক ক্ষেত্রে তদন্তেই দীর্ঘ সময় চলে যায়। এরপর মামলা ট্রায়ালে আসতে সময় লাগে। চার্জ গঠনের পর সাক্ষীদের মধ্যেও অনীহা তৈরি হতে পারে। তারা আদালতে হাজিরা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। আবার আসামি প্রভাবশালী হলে বাদী ও সাক্ষীদের প্রভাবিত করার সুযোগও তৈরি হয়।
তাঁর ভাষায়, খুলনার আদালতপাড়ায় বিভিন্ন সময় বিচারকের শূন্যতা দেখা যায়। একদিন দুইজন বিচারক যোগদান করলে পরদিনই আবার দুইজন অন্যত্র বদলি হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়। বিচারকদের এই আসা-যাওয়ার ধারাবাহিকতা মামলার দীর্ঘসূত্রিতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
আদালতে বিচারক বাড়ালেই সব সমস্যার সমাধান হবে না এমন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও তুলে ধরেছেন অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম। তাঁর মতে, বিচারকের সংখ্যার তুলনায় আদালতের কক্ষ বা এজলাসও কম। এমনকি শিশু সহিংসতা ট্রাইব্যুনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ আদালতেও একই আদালতে দুইজন বিচারক বসার পরিস্থিতি রয়েছে। ফলে বিচারক থাকলেও পর্যাপ্ত এজলাস না থাকলে কাঙ্ক্ষিত গতিতে বিচারকার্য পরিচালনা করা কঠিন।
রাষ্ট্রীয়ভাবে এজলাসের সংখ্যা না বাড়ালে চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোও দীর্ঘসূত্রিতার কবলে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
খুলনার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৯ হাজার ৪৬টি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে কিছু মামলা অন্য আদালতে পাঠানো হলেও প্রতিদিন নতুন মামলা যুক্ত হচ্ছে। অর্থাৎ শুধু বর্তমান মামলার জট কমানো নয়, ভবিষ্যতে মামলার সংখ্যা যাতে আরও অস্বাভাবিক হারে না বাড়ে, সেই ব্যবস্থাও জরুরি।
একদিকে তিনটি আদালত বিচারকশূন্য, অন্যদিকে বাকি তিন আদালতের ওপর জমে আছে হাজার হাজার মামলার চাপ। ফলে প্রশ্ন উঠছে তিন বিচারকের কাঁধে ১৯ হাজার মামলার বোঝা রেখে দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব?
বিচারপ্রার্থীদের কাছে আদালত ন্যায়বিচারের শেষ আশ্রয়। সেই আশ্রয়ে যদি বিচারকের সংকট, এজলাসের স্বল্পতা ও মামলার দীর্ঘসূত্রিতা একসাথে তৈরি হয়, তাহলে ক্ষতিটা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সেই বাদী-বিবাদীর ওপরই, যারা বছরের পর বছর একটি রায়ের অপেক্ষায় আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন।
তাই শুধু শূন্য পদে বিচারক নিয়োগ নয়, নিয়মিত বিচারক বদলির কারণে তৈরি হওয়া শূন্যতা রোধ, পর্যাপ্ত এজলাস নিশ্চিত এবং মামলার জট কমাতে কার্যকর ব্যবস্থাপনা এই তিনটি বিষয় এখন খুলনার বিচারব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে।



