শাড়ির আঁচল আটকানো হোক বা হঠাৎ ছিঁড়ে যাওয়া জামা সামলানো- ঘরে ঘরে প্রতিদিনের সঙ্গী এই ছোট্ট ধাতব পিনটি। দেখতে সাধারণ, দামেও সস্তা- কিন্তু জানেন কি, এই ক্ষুদ্র বস্তুটির পেছনে লুকিয়ে আছে দেড়শো বছরেরও বেশি পুরনো এক চমকপ্রদ ইতিহাস আর অবিশ্বাস্য রকমের নিখুঁত এক বিজ্ঞান-নকশা?
গল্পের শুরুটা বেশ মজার। ১৮৪৯ সালের কথা। মার্কিন প্রকৌশলী ওয়াল্টার হান্ট তখন দুশ্চিন্তায়- বন্ধু জে আর চ্যাপিনের কাছে নেওয়া মাত্র ১৫ ডলার ঋণ কীভাবে শোধ করবেন! সেই টেনশন নিয়ে বসে থাকার সময় হাতে তুলে নেন টেবিলে পড়ে থাকা আট ইঞ্চি লম্বা একটি তার।
সেই তার নিয়ে খেলতে খেলতে, মোচড়াতে মোচড়াতেই মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে তিনি বানিয়ে ফেলেন সম্পূর্ণ নতুন এক পিনের নকশা!
এই আবিষ্কারের জন্য ১৮৪৯ সালের ১০ এপ্রিল পেটেন্টও পেয়ে যান হান্ট। কিন্তু এখানেই আসল টুইস্ট- নিজের এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের স্বত্ব তিনি বিক্রি করে দেন মাত্র ৪০০ ডলারে, শুধু সেই ১৫ ডলার ঋণটা মেটানোর জন্য!
অথচ যে কোম্পানি এই স্বত্ব কিনেছিল, তারা পরবর্তীতে এই পিন বিক্রি করে কামিয়ে নেয় লাখ লাখ ডলার। বলা যায়, ইতিহাসের অন্যতম ‘লস প্রজেক্ট’ হয়ে থেকে গেলেন হান্ট নিজেই!
তবে মজার বিষয় হলো, সেফটি পিনের আইডিয়াটা কিন্তু হান্টের মাথা থেকে হুট করে আসেনি। এর শিকড় লুকিয়ে আছে হাজার হাজার বছর পেছনে। প্রাচীন গ্রিক, রোমান আর মাইসিনীয় সভ্যতায় ব্যবহার হতো ‘ফিবুলা’ নামের একধরনের ধাতব পিন-অলঙ্কার, যা দিয়ে মানুষ পোশাক আটকে রাখত।
কালের বিবর্তনে সেই প্রাচীন ফিবুলাই একসময় রূপ নেয় আজকের চেনা সেফটি পিনে।
যে কারণে নাম হলো ‘সেফটি’ পিন
এবার আসি আসল কারিগরিতে। পিনের নিচের দিকে যে গোল প্যাঁচানো অংশটা দেখা যায়, সেটাই আসলে একটা স্প্রিং হিসেবে কাজ করে। এই কুণ্ডলীই পিনের দুই বাহুকে বাইরের দিকে ঠেলে রাখার জন্য সবসময় একটা চাপ তৈরি করে রাখে।
আর পিনের মুখটা বানানো হয় একদম সুচালো করে, যাতে কাপড়ের বুনন ভেদ করে সহজে ঢুকে যেতে পারে। এখানেই আসল ম্যাজিক- সুচালো মুখটাকে যখন অন্য প্রান্তের ছোট্ট ক্যাপের ভেতর চেপে বসানো হয়, স্প্রিংয়ের টানের কারণে সেটা লক হয়ে যায়। ফলে আঙুলে ফুটে রক্ত বের হওয়ার কোনো ভয় থাকে না। এই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা থেকেই নাম রাখা হয়েছিল ‘সেফটি পিন’।
এখন প্রযুক্তির যুগে প্রতিদিনই নতুন নতুন আবিষ্কার হচ্ছে, বদলে যাচ্ছে সবকিছু। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, ওয়াল্টার হান্টের সেই মূল নকশা আজও প্রায় অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।
এত কম খরচে, এত সহজ উপায়ে নিরাপত্তা আর কার্যকারিতার এমন নিখুঁত মিশেল সত্যিই বিরল বলে মনে করেন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা।
তাই পরের বার যখন হাতে সেফটি পিন নেবেন, একবার হলেও মনে করবেন- এই ছোট্ট জিনিসটার পেছনে লুকিয়ে আছে ১৭০ বছরের এক অসাধারণ ইতিহাস!

