...|...|...

জাতীয়

সংবাদ সম্মেলনে এসআরবি

চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় নিয়ে পাঠানো হতো যুদ্ধে, নিহত ২০ বাংলাদেশি

টাইমস টুুডে প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৪:০২ | আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৪:৪৯
Shares
চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় নিয়ে পাঠানো হতো যুদ্ধে, নিহত ২০ বাংলাদেশি

ছবি: সংগৃহীত

রাশিয়ায় নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ৩০ বাংলাদেশিকে দেশটিতে নিয়ে রুশ সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি মানব পাচার চক্রের বিরুদ্ধে। সেখানে মাত্র ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাদের পাঠানো হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে। প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে তাদের ‘শিকার’ হিসেবে ব্যবহার করা হতো বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানতে পেরেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। এভাবে যুদ্ধে গিয়ে ড্রোন হামলায় অন্তত ২০ বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি।

এ ঘটনায় মানব পাচার চক্রের অন্যতম দুই সদস্য জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান (৫৫) ও আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহা. আসাদুজ্জামান।

এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরির আশ্বাস দিয়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল।

তবে রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর প্রতিশ্রুত কাজে নিয়োগ না দিয়ে তাদের রুশ সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে মাত্র ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ থেকে নেওয়া ব্যক্তিদের যুদ্ধ করার মতো শারীরিক সক্ষমতা, প্রশিক্ষণ কিংবা কৌশলগত প্রস্তুতি ছিল না। এত অল্প সময়ের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর পেছনে অন্য উদ্দেশ্য ছিল বলে ধারণা করছে এসআরবি।

এসআরবির প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে বাংলাদেশিদের একধরনের ‘শিকার’ হিসেবে সামনে পাঠানো হতো। তাদের লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা হলে সেই হামলার সূত্র ধরে প্রতিপক্ষের অবস্থান ও দূরত্ব নির্ণয় করা সম্ভব হতো বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের প্রথম ভাগ, মধ্যভাগ ও শেষভাগ এই তিন অংশে মোতায়েন করা হয়েছিল। প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় ১৭ জন নিহত হন। পরবর্তী সময়ে আরও তিনজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে ৩০ জনের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে এসআরবি।

জীবিতদের বিষয়ে এসআরবি জানিয়েছে, দুজন আহত অবস্থায় দেশে ফিরেছেন। তাদের একজন রাজন। তার বর্ণনা অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের আঘাতে তাঁর কোমর ভেঙে যায় এবং শরীরের নিচের অংশ অবশ হয়ে পড়ে। এমন অবস্থায় বুকের ওপর ভর দিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে তিনি ক্যাম্পে পৌঁছান।

বাকি আটজনের মধ্যে দুজন মস্কোর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অন্য ছয়জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে আছেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

মোহা. আসাদুজ্জামান জানান, এ মানব পাচারে বাংলাদেশি চক্রের পাশাপাশি রাশিয়ার ইগর নামের এক ব্যক্তি এবং কিরগিজস্তানের জুলিয়া নামের এক নারী জড়িত ছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি অভিযান চলছে। চক্রের আরেক সদস্য মোস্তাফিজুরকেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে।

এসআরবির এই কর্মকর্তা আরও বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে তারা জানতে পেরেছেন, রাশিয়ার যুদ্ধে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের একই কৌশলে যুক্ত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, জামালপুর, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও গাজীপুরের বাসিন্দারা গেছেন বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।

মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, ভুক্তভোগীদের বেশির ভাগই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তাদের কেউ কেউ ঋণ করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। এখন পরিবারের সদস্যরা স্বজনের মৃত্যুর খবর পেলেও অনেক ক্ষেত্রে তাদের মরদেহ দেখতে পারছেন না, এমনকি দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগও পাচ্ছেন না।

বিদেশে চাকরির প্রলোভনে অর্থ লেনদেনের আগে এবং যাত্রার পূর্বে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই করার জন্য সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।