জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে সামনে রেখে দীর্ঘ নয় বছরের বাস্তুচ্যুত জীবনের অবসান চেয়ে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার আকুতি জানিয়েছেন কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গারা।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে উখিয়ার জামতলী ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা (ইউসিআর) আয়োজিত মানববন্ধন ও সমাবেশ থেকে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি এ আহ্বান জানানো হয়।
সমাবেশে রোহিঙ্গা নেতারা বলেন, ২০১৭ সালের পর থেকে প্রায় নয় বছর ধরে বাংলাদেশে বাস্তুচ্যুত জীবন কাটাচ্ছেন তারা। দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা ও সংহতি পেলেও প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। ফলে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
তাদের দাবি, শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি কিংবা আন্তর্জাতিক সহমর্মিতা নয়—রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরাতে এবার একটি সুনির্দিষ্ট, সময়ভিত্তিক ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। বক্তারা বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের মূল উৎপত্তি মিয়ানমারে। তাই এর স্থায়ী সমাধানও মিয়ানমারেই করতে হবে। তবে প্রত্যাবাসনের আগে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, অধিকার, নাগরিক মর্যাদা এবং স্বাধীনভাবে চলাফেরার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
ইউসিআরের নেতারা বলেন, অতীতে সহিংসতা ও নিপীড়নের কারণে রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশ মিয়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। ভবিষ্যতে একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হবে না—এমন বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা ছাড়া প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না।
ইউসিআরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মৌলভী সৈয়দ উল্লাহ বলেন, ‘রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরে আশ্রয়শিবিরে বসবাস করছেন। এখন তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। অনির্দিষ্টকাল শিবিরে রেখে এই সংকটের সমাধান করা যাবে না।’
রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার মো. সোইব বলেন, ‘আমরা আলোচনা নয়, কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চাই। এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা ও মর্যাদার সাথে নিজ দেশে ফিরতে পারেন।’
তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘ, সদস্য রাষ্ট্র, আঞ্চলিক পক্ষ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি আশ্রয়শিবিরে মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা, রোহিঙ্গাদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং সহিংসতার ঘটনায় ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ রফিক বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ঘরে ফেরার অধিকার নিয়ে বহুবার কথা হয়েছে। কিন্তু নয় বছর পরও আমরা শিবিরে। এবার প্রত্যাবাসনের একটি সুনির্দিষ্ট ও সময়ভিত্তিক রোডম্যাপ প্রয়োজন।’
রোহিঙ্গা নারী নেত্রী সাজিদা বেগম বলেন, দীর্ঘদিনের বাস্তুচ্যুত জীবনে রোহিঙ্গা নারীদের নানা ধরনের সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি না হলে সংকট আরও দীর্ঘায়িত হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
১৫ নম্বর আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দা নুরুজ্জামা বলেন, ‘বাংলাদেশ আমাদের আশ্রয় দিয়েছে, এজন্য আমরা কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমরা নিজেদের দেশ, ঘরবাড়ি ও স্বজনদের কাছে ফিরে যেতে চাই। নিরাপদে ফেরার ব্যবস্থা করা হোক।’ রোহিঙ্গা নেতা মো. সালেহ বলেন, শিবিরে দীর্ঘদিন বসবাসের কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্যসহ মৌলিক চাহিদার সংকট তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও পড়ছে। তাই দ্রুত প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
রোহিঙ্গা নেতা আনোয়ার হোসেন বলেন, জাতিসংঘের অধিবেশনে রোহিঙ্গাদের সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত। তাই আশ্রয়শিবির থেকেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তাদের প্রত্যাবাসনের দাবি তুলে ধরছেন তারা।
নুর আলম নামে এক রোহিঙ্গা বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব শুধু বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর আঞ্চলিক প্রভাবও বাড়তে পারে। তাই নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে সংকটের সমাধানে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
রোহিঙ্গা নেতাদের বক্তব্যে তারা স্থায়ীভাবে শরণার্থী হয়ে থাকতে চান না। তারা নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মর্যাদার সাথে নিজেদের মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে চান। আর সেই প্রত্যাবাসনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে একটি বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ বাস্তবায়ন এখনই প্রয়োজন।


