কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজার গাড়িতে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামী ও গণঅধিকার পরিষদের মধ্যে সৃষ্ট উত্তেজনা নিরসনে সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়ার একদিন পরই গণঅধিকার পরিষদের কুষ্টিয়া জেলা সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালেকের মালিকানাধীন ইটভাটায় পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান ও ভাঙার ঘটনায় নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
সমঝোতা বৈঠকের পরদিন সরকারি সংস্থার অভিযান হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্ন উঠেছে। তবে সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজা এ অভিযানের সাথে নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেছেন। তার ভাষ্য, আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি এই বিষয়ে কিছুই জানি না।
গত ১৫ আগস্ট সন্ধ্যায় কুষ্টিয়া শহরের ছয় রাস্তার মোড়ে গণঅধিকার পরিষদের বিক্ষোভ কর্মসূচি চলাকালে মুফতি আমির হামজার গাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ সময় গাড়ির কাঁচ ভেঙে যায় এবং আমির হামজা মাথায় আঘাত পান বলে পুলিশ ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তার সাথে থাকা চাচার পা কেটে যায়। এ ঘটনার পর জামায়াত ও গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ থেকে ১৫ জন আহত হন বলে জানা গেছে।
ঘটনার পর দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা, ভাঙচুর ও মারধরের অভিযোগ তোলে। আমির হামজার গাড়িতে হামলার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় গণঅধিকার পরিষদের নেতাদের আসামি করা হয়। অন্যদিকে গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা এবং তাদের কার্যালয় ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরের অভিযোগে জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা হয়।

কুষ্টিয়া মডেল থানায় দায়ের হওয়া দুই মামলায় মোট ৩৬ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৭০ থেকে ৮৫ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
সংঘর্ষের পর রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনে গত ২৪ আগস্ট কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও কুষ্টিয়া জজ কোর্টের স্পেশাল পিপি অ্যাডভোকেট শামীম-উল হাসান অপুর উদ্যোগে জামায়াতে ইসলামী, গণঅধিকার পরিষদ এবং সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজার পক্ষের নেতাদের নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে দুই পক্ষের সাম্প্রতিক বিরোধ ও সংঘর্ষের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় এবং সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বৈঠক শেষে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতাকে একসঙ্গে ছবি তুলতেও দেখা যায়। পরে সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দুই রাজনৈতিক পক্ষের বিরোধ মিটিয়ে ফেলার একটি বার্তা প্রকাশ্যে আসে। তবে এর পরদিনই (২৫ আগস্ট) গণঅধিকার পরিষদের কুষ্টিয়া জেলা সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালেকের মালিকানাধীন ইটভাটায় পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান ও ভাঙার ঘটনা সামনে আসে।
গণঅধিকার পরিষদের নেতাদের অভিযোগ, সমঝোতা বৈঠকের পরদিনই আব্দুল খালেকের ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানোর বিষয়টি সময়ের দিক থেকে সন্দেহ তৈরি করেছে। তাঁদের দাবি, ওই সময়ে নিয়মিতভাবে ইটভাটা উচ্ছেদ বা ভাঙার কোনো অভিযান চলছিল না।
অভিযোগের বিষয়ে সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজা বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি এই বিষয়ে কিছুই জানি না।’
আমির হামজা জানান, পরে তিনি কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসকের সাথে কথা বলেন। জেলা প্রশাসক তাঁকে জানিয়েছেন, জেলার অবৈধ ইটভাটাগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। সেই ধারাবাহিকতায় আব্দুল খালেকের ইটভাটাতেও অভিযান হয়েছে বলে তিনি জানতে পারেন।
অন্যদিকে গণঅধিকার পরিষদের কুষ্টিয়া জেলা সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালেক অভিযোগ করেন, ওই সময়ে ইটভাটায় অভিযান চালানোর কোনো কার্যক্রম চলছিল না। তাঁর দাবি, জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীসহ একটি পক্ষ ষড়যন্ত্র করে তাঁর ইটভাটা ভেঙে দিয়েছে। আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তাঁর ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
অভিযানের বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এমদাদুল হক বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি। প্রতি সপ্তাহে অভিযান চলমান রয়েছে। হাইকোর্টের রিট থাকায় সেসব ভাটায় অভিযান করা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া অবৈধ সব ভাটার বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
সমঝোতা বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামীম-উল হাসান অপু বলেন, আমির হামজা, জামায়াত ও গণঅধিকার পরিষদের মধ্যে ঝামেলা হওয়ার পর দুই পক্ষকে এক জায়গায় বসিয়ে সমাধানের চেষ্টা করেছি। দুই পক্ষই একসময় সমঝোতার জন্য একমত হয়। পরের দিন ভাটায় অভিযানের বিষয়ে আমি শুনলাম। এটার সাথে কারও কোনো ইন্ধন আছে কি না, আমি জানি না।
১৫ আগস্টের সংঘর্ষ, মামলা-পাল্টা মামলা, ২৪ আগস্ট সমঝোতার উদ্যোগ এবং তার পরদিন গণঅধিকার পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ এক নেতার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সরকারি সংস্থার অভিযান-এই ঘটনাপ্রবাহ ঘিরেই এখন কুষ্টিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে।
তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এটি নিয়মিত অভিযানের অংশ। পাশাপাশি সংঘর্ষের মামলা এবং ইটভাটায় অভিযান নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দিকেও নজর রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।


