ইসরায়েলে চলমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যদি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা হারান, তবে তার আন্তর্জাতিক আইনি পরিণতি কী হবে? আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত-এর গ্রেফতারি পরোয়ানা কিংবা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে চলা গণহত্যার মামলার ভবিষ্যৎ কী দাঁড়াবে—এমন নানা প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক মহলে জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে। মিডল ইস্ট আই-এর এক প্রতিবেদনে এই বিশ্লেষণ উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী দলগুলোর সাথে জোট করে কেউ যদি নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করে বা তিনি নিজে পদত্যাগও করেন, তবুও ইসরায়েলকে ঘিরে চলমান আন্তর্জাতিক আইনি পদক্ষেপগুলো বন্ধ হবে না। বরং ক্ষমতা হারালে তিনি সেই বিশেষ ব্যক্তিগত দায়মুক্তি বা ‘ইমিউনিটি’ হারাবেন, যা এতদিন কয়েকটি বন্ধুভাবাপন্ন দেশের কাছে তাকে গ্রেফতার না করার আইনি বাহানা হিসেবে কাজ করেছে। এর ফলে তিনি আইসিসির গ্রেফতারি পরোয়ানা এবং বিদেশি জাতীয় আদালতগুলোর বিচারপ্রক্রিয়ার মুখে পড়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়বেন।
উল্লেখ্য, গাজায় অনাহারকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার, হত্যা ও নিপীড়নের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গত বছরের নভেম্বরে নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিল আইসিসি। এ ছাড়া, গাজাগামী ত্রাণ বহরে বাধার ঘটনায় নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তুরস্কের আদালতেও তার অনুপস্থিতিতে বিচার ও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি রয়েছে।
আইসিসির পরোয়ানা কি বহাল থাকবে?
আইনি বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেছেন যে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতানিয়াহু দায়িত্বে থাকুন আর না থাকুন, এই পরোয়ানা বাতিল হবে না। কারণ পরোয়ানাটি তার ব্যক্তিগত অপরাধমূলক দায়বদ্ধতার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। রোম সংবিধির ধারা ৫৮(৪) অনুযায়ী, আদালত অন্য কোনো নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পরোয়ানা কার্যকর থাকবে।
যদিও ইসরায়েল বরাবরই আদালতের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছে এবং দাবি করছে যে তারা রোম সংবিধির সদস্য নয়। তা সত্ত্বেও আইসিসির আপিল চেম্বার বা বিচারকেরা বিচারপ্রক্রিয়ার সময় পরোয়ানা স্থগিত রাখতে রাজি হননি।
ব্যক্তিগত দায়মুক্তি বনাম কার্যকর দায়মুক্তি
আইসিসি এবং বিভিন্ন জাতীয় আদালতের বিচারিক নিয়মে দায়মুক্তির বিধান ভিন্ন। আইসিসির ক্ষেত্রে কোনো সরকারি পদমর্যাদা বা রাষ্ট্রপ্রধানের ইমিউনিটি আসামিকে রক্ষা করতে পারে না। রোম সংবিধির ধারা ২৭ অনুযায়ী, পদের সুবাদে পাওয়া দায়মুক্তি সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে গ্রেফতারের অনুরোধ বাস্তবায়ন থেকে অব্যাহতি দেয় না। অতীতে সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশির বা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ক্ষেত্রেও আদালত এই নীতি প্রয়োগ করেছে।
আন্তর্জাতিক আইন বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু ক্ষমতা ছাড়লে তার ‘ব্যক্তিগত দায়মুক্তি’ (যা শুধু দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সাময়িক সুরক্ষা দেয়) চিরতরে শেষ হয়ে যাবে। তবে সরকারি ক্ষমতাবলে পরিচালিত কাজের সাথে সম্পর্কিত ‘কার্যকর দায়মুক্তি’র বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন হলেও যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনে এই সুরক্ষার সুযোগ বহু আগেই সীমিত করা হয়েছে।
ফ্রান্স, ইতালি ও হাঙ্গেরির মতো কিছু দেশ এর আগে দায়মুক্তির দোহাই দিয়ে নেতানিয়াহুকে গ্রেফতারের বিরোধিতা করলেও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে বাস্তবিক দিক দিয়ে আইসিসির নিজস্ব কোনো পুলিশ বাহিনী না থাকায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতার ওপরই পরোয়ানার বাস্তবায়ন নির্ভর করছে।
বিদেশি আদালতেও বাড়তে পারে আইনি ঝুঁকি
ক্ষমতা হারালে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাতীয় আদালতে ‘সর্বজনীন এখতিয়ার’-এর অধীনে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হওয়ার বড় সুযোগ তৈরি হবে। অতীতে চিলির অগাস্তো পিনোশে কিংবা সম্প্রতি সিরিয়ার বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে চলা আইনি প্রক্রিয়াগুলো তারই প্রমাণ। যদিও নেতানিয়াহু গ্রেফতার এড়াতে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ এড়িয়ে চলতে পারেন এবং ইসরায়েল রাষ্ট্রও তাকে সহজে হস্তান্তর করতে রাজি হবে না, তবুও ভবিষ্যতে যেকোনো বিদেশি সফর তাঁর জন্য বড় বিপদের কারণ হতে পারে।
আইসিজের গণহত্যা মামলা ও দুর্নীতির বিচার
এদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার করা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের গণহত্যা মামলাটি মূলত রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার সাথে সম্পর্কিত, কোনো ব্যক্তির সাথে নয়। ফলে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে নেতানিয়াহু সরে গেলেও এই মামলার কার্যক্রমে কোনো প্রভাব পড়বে না। তবে এই মামলার চূড়ান্ত রায় পেতে ২০২৯ সাল বা তারও বেশি সময় লেগে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের অভ্যন্তরে ঘুষ গ্রহণ, জালিয়াতি ও বিশ্বাস ভঙ্গের অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলা দুর্নীতির তিনটি মামলার বিচারকাজও প্রধানমন্ত্রী পদ হারানোর সাথে সাথে বন্ধ হয়ে যাবে না। এর আগে গত নভেম্বর মাসে তিনি দোষ স্বীকার না করেই প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। তবে বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদ পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন যে, দোষ স্বীকার এবং রাজনীতি থেকে অবসর না নেওয়া পর্যন্ত তাকে কোনো ক্ষমা প্রদর্শন করা উচিত নয়।


