কুড়িগ্রামে রাতের আঁধারে নদীপথ ব্যবহার করে ভারতে পাচার হচ্ছে দেশের অন্যতম অর্থকরী ফসল ‘সোনালি আঁশ’ পাট। জেলার সীমান্তবর্তী বিভিন্ন নদীপথ ও চরাঞ্চলকে ব্যবহার করে পাট সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
দিনের বেলায় স্বাভাবিক বেচাকেনার আড়ালে চললেও রাত নামলেই সক্রিয় হয়ে উঠছে একটি চক্র। নদীপথে ইঞ্জিনচালিত নৌযানে করে পাট পরিবহনের একাধিক তথ্য উঠে এসেছে সমকালের অনুসন্ধানে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাত ২ টার পরে জেলার ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র ও নীলকমল নদের অববাহিকার চর দ্বীপচরাঞ্চলগুলোতে স্তুপ করে রাখা পাট নৌকায় উঠিয়ে ভারতের নদী পথের সীমান্ত পার হয়ে এসব পাট পরিবহন। করতে দেখা যায়।
বাংলাদেশ অংশের কুড়িগ্রাম জেলার এসব নদ-নদী অববাহিকার জাহাজের আলগা, সাহেবের আলগা, নারায়ণপুর, পাখিউড়া, শৌলমারী, বেরুবাড়ী, নুনখাওয়া, কাপনা, পদ্মারচর, যাত্রাপুর, কচাকাটা, মাদারগঞ্জ ইত্যাদি এসব এলাকায় দিনের বেলা বিক্ষিপ্ত ভাবে কৃষকদের কাছ থেকে পাট সংগ্রহ করে স্তূপ করে রেখে রাতে নৌকায় উঠিয়ে এসব এলাকার নদীপথের সীমান্ত ব্যবহার করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ধুবরী জেলার কাটামারি এলাকায় এসব পাট পাচার করা হয়।
নাম পরিচয় গোপন রাখার শর্তে সম্প্রতি, মধ্যরাতে জেলা সদরের যাত্রাপুর নৌ-ঘাট থেকে পাট পরিবহন করা একটি নৌকার যাত্রী হন টাইমস টুডে'র এই প্রতিবেদক। কয়েকজন পাটচাষির সাথে কথা হলে তারা জানান, পাট বেচা-কেনার এই মৌসুমে গত ১ মাস থেকেই ভালো দাম পাওয়ায় ভারতের ধুবরীর কাটামারিতে এসব পাট বিক্রি করেন স্থানীয়রা। প্রতি রাতে ১০-১২ টি নৌকা বিভিন্ন চর থেকে পাট সংগ্রহ করে ভোর হওয়ার আগেই এসব পাট পরিবহন করে। প্রতি নৌকাতে ৫০ - ৬০ মণ পাট পরিবহন করা যায়। গড়ে প্রতি মাসে বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলার নদীপথের সীমান্ত দিয়ে ৩০-৩৫ হাজার মণ পাট ভারতে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, রাত হলেই বদলে যায় নদীপথের চিত্র। দিনের বেলায় যে নদীপথে সাধারণ নৌযান চলাচল স্বাভাবিক মনে হয়, রাত গভীর হলেই আন্তঃসীমানা নদ-নদীর প্রায় ২০-২৫ টি পয়েন্টে বাড়ে সন্দেহজনক নৌযানের চলাচল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চর নারায়নপুরের এক পাট চাষী বলেন,' বাংলাদেশে প্রতি মণ পাটের বর্তমান বাজার মূল্য ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকা। অন্যদিকে, ভারতে প্রতিমণ পাটের বর্তমান বাজার মূল্য ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকা। লাভ বেশি,কষ্ট নাই তাই পাট বিক্রি করি ভারতে।'
পাশের চর শৌলমারির আরেক পাট চাষী বলেন,' নৌকাত করি যাত্রাপুর নিয়া যাওয়া নাগে পাট, কামলা খরচ,নৌকা ভাড়া সোগ হিসেব করি পাটের লাভ তেমন থাকে না। সরকার তো আর পাটের দাম বাড়ায় না। ভারতের সাথে যোগাযোগ করে এখানকার লোকজন দিনের বেলা বাড়িত আসি পাট দেখে, ভালো পাটগুলো আলাদা করে মেপে দাম দিয়া যায়। রাতে তারাই নৌকাতে পাট তুলি নিয়া যায়। হামারগুল্যার তেমন কোন ক্ষতি হয় না।'
কৃষক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, জেলা সব চেয়ে বড় যাত্রাপুর হাটে বিভিন্ন চরাঞ্চলগুলো থেকে প্রতিবছর পাটের এই মৌসুমে সপ্তাহের শনিবার ও মঙ্গলবার হাটের দিনগুলোতে ৪-৫ হাজার মণ পাট বেচা-কেনা হয়। কিন্তু গত এক মাস থেকে এই হাটে সেই পরিসংখ্যান নেমে এসেছে অর্ধেকেরও নিচে।
পাট ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন,' আমাদের দেশের নৌপথে যেভাবে ভারতে পাট পাচার হচ্ছে। এতে আমরা সাধারণ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। অন্যদিকে অবৈধভাবে পাট বিদেশে রপ্তানি হওয়ার কারণে বাংলাদেশ রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।'
আরেক ব্যবসায়ী শাহানুর ইসলাম বলেন,'আমাদের সোনালী আঁশ আরেকটা দেশে পাচার হবে এটা মেনে নেয়ার মতোন না। ভারত চাইলে রাজস্ব দিয়ে বৈধভাবে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের কাছে পাট কিনুক। কিন্তু রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে এমন কাজ শোভনীয় নয়। আমরা শুরুর দিকে বিজিবিকে বললেও তারা কোন পদক্ষেপ নেননি।'
নদীপথে রাতের বেলায় পাট পরিবহনের ঘটনা ঘটলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত নজরদারি কতটা রয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) এবং জেলা পাট পরিদর্শকের দায়িত্বে থাকা ব্যাক্তিদের মাঠ পর্যায়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে এছাড়াও নৌ পুলিশের টহল না থাকায় ভারতে পাট পরিবহনের এই চক্রটি আরো সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
এই বিষয়ে কুড়িগ্রাম পাট অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য পরিদর্শক এটিএম খায়রুল হক বলেন,'আমরা।কয়েক জনের নাম পেয়েছি,কিন্তু তারা স্বীকার করে না। আমার জনবল নাই আমি একাই কি করবো? ‘
কুড়িগ্রাম ২২ বিজিবি ব্যাটালিয়নে'র সহকারী পরিচালক মো. মতিউর রহমান বলেন,' আমরা এ রকমটা লোকমুখে শুনেছি। শোনার পর থেকে গত ৭ দিন ধরে টহল আরো বাড়িয়েছি কিন্তু আমরা কাউকে পাট পাচার করতে দেখছি না। আপনার(সাংবাদিক) কাছে পাচারের সময় তথ্য থাকলে জানাইয়েন আমরা অ্যাকশনে যাব।'


