...|...|...

সারাদেশ

ধানক্ষেতে নেওয়ার পর গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয় তাজমিনকে, জানাল পুলিশ

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৮:৫৭ | আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ১১:০৯
Shares
ধানক্ষেতে নেওয়ার পর গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয় তাজমিনকে, জানাল পুলিশ

নূরজাহান হোটেলের সামনে সিসিটিভি ফুটেজে সবশেষ দেখা যায় স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনকে। ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজার থেকে বাসে কুমিল্লায় ফিরেছিলেন জান্নাতুল তাজমিন (১৫)। রাত সাড়ে ১০টার দিকে পদুয়ার বাজারের নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নেমে বাসায় ফেরার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠে সে। কিন্তু সেই যাত্রা আর বাসা পর্যন্ত গড়ায়নি। পরদিন সকালে লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার করা হয় সপ্তম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর লাশ।

তাজমিনের মৃত্যু ঘিরে রহস্যের জট খুলতে তদন্তে নেমে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পেয়েছে পুলিশ। অটোরিকশার চালক সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেফতারের পাশাপাশি তার ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, তাজমিনের মোবাইল ফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডে একাধিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। একইসাথে হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কেও বেশ কিছু তথ্য সামনে এসেছে।

তবে ঠিক কী কারণে তাজমিনকে হত্যা করা হয়েছে এবং এ ঘটনায় আর কেউ জড়িত কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ।

বাস থেকে নামার পর অটোরিকশায় তাজমিন

তাজমিনের বাড়ি যশোর সদর উপজেলার চূড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ায়। তার বাবা আবদুল আলীম রেনেটা ওষুধ কোম্পানির কুমিল্লা অঞ্চলে চাকরি করেন। এ কারণে পরিবারের সাথে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকত সে। নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল তাজমিন। তবে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সে আর স্কুলে যাচ্ছিল না।

পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর সকালে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তাজমিন। পরে সে কক্সবাজারে যায়। ৭ অক্টোবর দুপুরের পর সেখান থেকে বাসে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দেয় কিশোরীটি।

রাত সাড়ে ১০টার দিকে পদুয়ার বাজারের নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামে সে। ওই স্থানের সিসিটিভি ফুটেজে রাত ১২টা ১৯ মিনিটে তাকে সবশেষ দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর রেসকোর্স এলাকার বাসায় ফেরার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠে তাজমিন।

কিন্তু বাসায় ফেরার বদলে অটোরিকশাটি তাকে নিয়ে অন্য পথে চলতে শুরু করে। পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, চালক সুমন শহরের দিকে না গিয়ে উল্টো পথে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে বিষয়টি বুঝতে পেরে বাবার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাজমিন।

বাবাকে পাঠিয়েছিল লাইভ লোকেশন

তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, অটোরিকশায় থাকা অবস্থায় তাজমিন তার বাবার হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠায় এবং নিজের লাইভ লোকেশন শেয়ার করে। রাত ২টা ৫৮ মিনিটে পাঠানো ওই বার্তায় তাকে এসে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিল কিশোরীটি।

তবে গভীর রাতে ঘুমিয়ে থাকায় মেয়ের পাঠানো বার্তা ও লোকেশন তখন দেখতে পাননি আবদুল আলীম। সকালে ঘুম থেকে উঠে বার্তাটি দেখেন তিনি। পরে মেয়ের অবস্থান জানার চেষ্টা করতে গিয়ে তার মৃত্যুর খবর পান।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অটোরিকশাটি বিজরা হয়ে রসুলপুর ও শিকারীপাড়া দিয়ে লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের দিকে যায়। সেখানকার ধানক্ষেতেই পরে তাজমিনের লাশ পাওয়া যায়।

ধানক্ষেতে ধস্তাধস্তির চিহ্ন, গলায় গামছা

কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, তাজমিনের গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। ঘটনাস্থলের আশপাশের চার থেকে পাঁচটি ধানক্ষেতে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া গেছে। এসব আলামত থেকে পুলিশের ধারণা, প্রাণ বাঁচাতে তাজমিন পালানোর চেষ্টা করে থাকতে পারে।

পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। প্রথম দিকে চালক সুমন একাই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে জানানো হলেও পরবর্তী সময়ে মোবাইল ফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ করে একাধিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার কথা জানান পুলিশ সুপার।

ফলে হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত ছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখছে তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

অটোরিকশার সূত্রে গ্রেফতার সুমন

বৃহস্পতিবার সকালে জগতপুর গ্রামের ধানক্ষেত থেকে তাজমিনের লাশ উদ্ধারের সময় পাশেই একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পাওয়া যায়। গাড়িটি জব্দ করার পর এর নিবন্ধন ও মালিকের তথ্য ধরে তদন্ত শুরু করে পুলিশ।

পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার রাতে অটোরিকশার মালিককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি গাড়িটি সুমন নামে এক ব্যক্তি ভাড়ায় চালাতেন বলে জানান। এরপর সুমনের অবস্থান শনাক্ত করে শুক্রবার (৯ অক্টোবর) চট্টগ্রাম নগরী থেকে তাকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ।

পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করা হয়েছে। মোবাইল ফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ করেও তদন্তে নতুন তথ্য মিলেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সুমনের বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলায়। কয়েক বছর আগে বিয়ের পর তিনি লালমাই উপজেলার জয়নগর গ্রামে ঘরজামাই হিসেবে বসবাস শুরু করেন। পারিবারিক বিরোধের জেরে প্রায় এক মাস আগে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে যান তিনি। এরপর আর সেখানে ফেরেননি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তবে এসব ঘটনার সাথে তাজমিন হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।

হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে তদন্ত

পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, তাজমিনের মোবাইল ফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডে একাধিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। হত্যার উদ্দেশ্য বা নেপথ্যের কারণ সম্পর্কেও অনেকটা স্পষ্ট ধারণা পেয়েছে পুলিশ। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল ১০টায় সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে বলে শুক্রবার সন্ধ্যায় জানান তিনি।

এ ঘটনায় তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন।

মেয়েকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ পরিবার

তাজমিনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর যশোরের ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ায় তাদের বাড়িতে শোকের পরিবেশ তৈরি হয়। শুক্রবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে স্বজনদের ভিড় জমে বাড়িতে। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন তার মা কেয়া খাতুন।

সাংবাদিকেরা ছবি তুলতে গেলে ক্ষোভ ও কষ্ট প্রকাশ করে তিনি বলেন, কী হবে এসব ছবি তুলে! আমার কলিজার পাখিটা যখন চলে গেছে; এখন আর কিছু বলব না।

মেয়ের এক বান্ধবীকে দায়ী করে কেয়া খাতুন অভিযোগ করেন, ওই বান্ধবী তাজমিনকে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যেতেন। মেয়েকে বাইরে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে অনেক চেষ্টা করেছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি। এমনকি এ কারণে ছয় মাস মেয়েকে স্কুলে যেতে না দিয়ে ঘরে আটকে রেখেছিলেন বলে জানান।

তার অভিযোগ, ওই বান্ধবীই তাজমিনকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে কক্সবাজারে নিয়ে গিয়েছিলেন। তবে বান্ধবীর বিরুদ্ধে করা এসব অভিযোগের সত্যতা বা হত্যাকাণ্ডের সাথে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

মেয়েকে হারানোর কষ্ট প্রকাশ করে কেয়া খাতুন বলেন, গত ৪ অক্টোবর তাজমিন বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর ফোনে তার অবস্থান জানতে চেয়েছিলেন। মেয়েকে নিজে গিয়ে বাড়িতে ফিরিয়ে আনার কথাও বলেছিলেন তিনি।

শেষ বার্তাটিও দেখতে পারেননি বাবা

তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম জানান, ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তার মেয়ে। বিভিন্ন সময়ে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তাজমিন বান্ধবীর বাসায় আছে বলে জানিয়েছিল।

আবদুল আলীমের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক পৌনে ২টার দিকে মেয়ের কাছ থেকে একটি খুদে বার্তা ও লাইভ লোকেশন এসেছিল। সেখানে তাকে এসে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু ঘুমিয়ে থাকায় তখন বার্তাটি দেখতে পাননি তিনি। সকালে উঠে বার্তাটি দেখার পর মেয়ের অবস্থান জানার চেষ্টা করেন। এর মধ্যেই মেয়ের লাশ উদ্ধারের খবর জানতে পারেন।

তিনি বলেন, মেয়ের সাথে কী ঘটেছিল, কারা তাকে হত্যা করেছে এবং এর পেছনে কী রহস্য রয়েছে, তা জানতে চান। কাউকে নিয়ে অনুমানভিত্তিক অভিযোগ করতে চান না বলেও জানিয়েছেন তিনি। তাজমিন হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন শোকাহত এই বাবা।