...|...|...

ধর্ম

ইসলামে তালাকের বিধান

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ১১:৩৪
Shares
ইসলামে তালাকের বিধান

বিয়ে ইসলামে শুধু সামাজিক সম্পর্ক নয়, বরং স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্ধন। তাই দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ দেখা দিলেই বিচ্ছেদের পথে যাওয়াকে ইসলাম উৎসাহিত করে না। বরং সমস্যা সমাধান, পারস্পরিক সমঝোতা এবং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করতে বলা হয়েছে। তবে কোনো কারণে একসাথে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়লে শরিয়তে বিবাহ বিচ্ছেদের বৈধ পথও রাখা হয়েছে।

ইসলামী শরিয়তে তালাক দেওয়ার মূল ক্ষমতা সাধারণভাবে স্বামীর হাতে ন্যস্ত। তবে এর অর্থ এই নয় যে, স্ত্রী কোনো অবস্থাতেই বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন না। স্ত্রীকে বিচ্ছেদের জন্য খুলা, তাফভিজে তালাক এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিচারিক বিচ্ছেদ বা ফাসখের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

তালাকের আগে সমঝোতার চেষ্টা

দাম্পত্য কলহ দেখা দিলে সরাসরি বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত না নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করতে কুরআনে নির্দেশনা রয়েছে। সূরা আন-নিসার ৩৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা হলে উভয় পরিবারের পক্ষ থেকে একজন করে সালিশ নিয়োগের কথা।

অর্থাৎ, দাম্পত্য সংকট দেখা দিলে প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করা। পারিবারিকভাবে সমাধান সম্ভব না হলে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মধ্যস্থতার মাধ্যমে সম্পর্ক রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

স্বামীর তালাক দেওয়ার অধিকার

ইসলামী শরিয়তের সাধারণ বিধান অনুযায়ী, তালাক দেওয়ার ক্ষমতা স্বামীর হাতে। তবে এই ক্ষমতা ইচ্ছামতো বা অন্যায়ভাবে প্রয়োগ করার অনুমতি হিসেবে দেখা উচিত নয়। তালাক একটি গুরুতর সিদ্ধান্ত এবং এর সাথে স্ত্রী, সন্তান ও দুই পরিবারের ওপর নানা ধরনের প্রভাব পড়ে।

কুরআনে তালাকের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নিয়ম ও ইদ্দতের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সূরা আত-তালাকের প্রথম আয়াতে ইদ্দত যথাযথভাবে গণনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং স্ত্রীকে ইদ্দতের সময় তার বাসস্থান থেকে বের করে না দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

সুন্নাহসম্মত তালাকের ক্ষেত্রে একবার তালাক দিয়ে ইদ্দত পালন করার বিধান রয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় তালাকের পর ইদ্দতের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর পুনর্মিলনের সুযোগ থাকে। কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তালাক দুইবার; এরপর হয় বিধি অনুযায়ী রেখে দেওয়া, নয়তো সুন্দরভাবে বিদায় দেওয়া।’—সূরা আল-বাকারা, ২২৯।

তৃতীয় তালাক কার্যকর হলে বিচ্ছেদ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এ ক্ষেত্রে আগের স্বামী-স্ত্রী সরাসরি পুনরায় দাম্পত্য সম্পর্কে ফিরতে পারেন না।

একসাথে তিন তালাক কি সুন্নাহসম্মত?

একসাথে তিন তালাক উচ্চারণ করা নিয়ে ইসলামী ফিকহে বিস্তারিত আলোচনা ও মতভেদ রয়েছে। তবে তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রে সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি হলো ধাপে ধাপে তালাক দেওয়া এবং পুনর্মিলনের সুযোগ রাখা।

হাদিসে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) তার স্ত্রীকে মাসিক অবস্থায় তালাক দিলে বিষয়টি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে জানানো হয়। তখন নবীজি (সা.) তাকে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে এবং পরবর্তী সময়ে উপযুক্ত সময়ে তালাক দেওয়ার নির্দেশ দেন। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে এ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।

এ থেকে বোঝা যায়, তালাকও নির্ধারিত নিয়ম ও সময় বিবেচনা করে দেওয়া উচিত; রাগের মাথায় বা হঠাৎ করে একাধিক তালাক উচ্চারণ করা শরিয়তের আদর্শ পদ্ধতি নয়।

স্ত্রী কি নিজে তালাক দিতে পারেন?

সাধারণভাবে স্ত্রী স্বামীকে তালাক দেওয়ার অধিকারী নন। তবে শরিয়তে স্ত্রীর জন্য বিচ্ছেদের একাধিক ব্যবস্থা রয়েছে।

এর একটি হলো তালাক-এ-তাফভিজ। স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা অর্পণ করেন, তাহলে সেই অর্পিত ক্ষমতার ভিত্তিতে স্ত্রী নিজেকে তালাক দিতে পারেন। এই ক্ষমতা বিয়ের সময় বা পরবর্তী কোনো পর্যায়ে নির্দিষ্ট শর্তে অর্পণ করা হতে পারে।

বাংলাদেশের প্রচলিত কাবিননামাতেও স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট ঘর রয়েছে। তবে কাবিননামার ঘর পূরণ করা এবং এর আইনগত প্রভাবের বিষয়টি আলাদাভাবে প্রযোজ্য আইন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিধানের সাথে সম্পর্কিত।

খুলা কী এবং কীভাবে হয়?

স্ত্রীর জন্য বিচ্ছেদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা হলো খুলা। স্ত্রী যদি মনে করেন, স্বামীর সাথে সংসার করা তার পক্ষে আর সম্ভব নয় এবং এ অবস্থায় দাম্পত্য দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা কঠিন, তাহলে তিনি স্বামীর কাছে বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারেন।

কুরআনে খুলার ভিত্তি হিসেবে সূরা আল-বাকারার ২২৯ নম্বর আয়াতের শেষাংশে এমন পরিস্থিতির কথা এসেছে, যেখানে স্বামী-স্ত্রী আল্লাহর নির্ধারিত সীমা রক্ষা করতে না পারার আশঙ্কা করেন। সেখানে স্ত্রী কোনো বিনিময়ের মাধ্যমে নিজেকে মুক্ত করে নেওয়ার বিষয়ে বিধান রয়েছে।

হাদিসেও খুলার একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা পাওয়া যায়। সাবিত ইবনে কায়েস (রা.)-এর স্ত্রী রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে জানান, তিনি স্বামীর চরিত্র বা দ্বীন নিয়ে অভিযোগ করছেন না, কিন্তু তার সাথে সংসার চালিয়ে যেতে পারছেন না। তখন নবীজি (সা.) মোহর হিসেবে দেওয়া বাগানটি ফেরত দেওয়ার বিষয়ে জানতে চান এবং স্বামীকে তা গ্রহণ করে বিচ্ছেদ ঘটানোর নির্দেশ দেন। সহিহ বুখারিতে এ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।

তবে খুলার ক্ষেত্রে ঠিক কী ফেরত দিতে হবে, কীভাবে বিচ্ছেদ কার্যকর হবে এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক অধিকার কী হবে—এসব বিষয়ে মাজহাবভেদে ফিকহি পার্থক্য রয়েছে। তাই বাস্তব কোনো ঘটনায় স্থানীয় আলেম, মুফতি বা আইনজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

স্বামী রাজি না হলে কী করবেন স্ত্রী?

শুধু স্বামী খুলায় সম্মত না হওয়ায় একজন নারী সব পরিস্থিতিতে অসহায় হয়ে পড়েন না। নির্দিষ্ট কারণ ও পরিস্থিতিতে ইসলামী বিচারিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদের ব্যবস্থা রয়েছে, যাকে ফাসখ বলা হয়।

স্বামীর নির্যাতন, ভরণপোষণ না দেওয়া, দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকা, দাম্পত্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা বা অন্যান্য স্বীকৃত কারণে বিচারিক বিচ্ছেদের প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে কোন কারণ ফাসখের জন্য যথেষ্ট এবং কী প্রক্রিয়ায় তা কার্যকর হবে, তা ফিকহি মত ও দেশের প্রচলিত আইনের ওপর নির্ভর করতে পারে।

তালাক কি ইসলামে নিষিদ্ধ?

না, তালাক ইসলামে বৈধ। তবে বৈধ হওয়া আর উৎসাহিত হওয়া এক বিষয় নয়। দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার আগে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করাই ইসলামের নির্দেশনার সাথে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

‘তালাক আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল’—এমন একটি বর্ণনা সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। তবে এই বর্ণনাটির হাদিসের সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। তাই এটিকে সহিহ হাদিস হিসেবে নিঃশর্তভাবে উদ্ধৃত করার পরিবর্তে বলা ভালো, ইসলামী শিক্ষায় অকারণে দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে ফেলা নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

কুরআন বরং বিচ্ছেদের ক্ষেত্রেও সুন্দর আচরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। সূরা আল-বাকারায় তালাকের প্রসঙ্গে স্ত্রীকে হয় সুন্দরভাবে রেখে দেওয়া, নয়তো সুন্দরভাবে বিদায় দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিচ্ছেদের পরও অধিকার রয়েছে

ইসলামে তালাক হয়ে গেলেই স্বামী-স্ত্রীর সব দায়িত্ব ও অধিকার একই মুহূর্তে শেষ হয়ে যায়—বিষয়টি এমন নয়। তালাকের ধরন, ইদ্দত, মোহর, ভরণপোষণ, সন্তানের অধিকার ও হেফাজতসহ বিভিন্ন বিষয় পরিস্থিতি অনুযায়ী বিবেচিত হয়।

বিশেষ করে গর্ভবতী নারীর ইদ্দত, তালাকপ্রাপ্তা নারীর বাসস্থান ও ভরণপোষণ এবং সন্তানের দায়িত্ব নিয়ে কুরআনে পৃথক নির্দেশনা রয়েছে। সূরা আত-তালাকের ৬ ও ৭ নম্বর আয়াতে এ বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তাই তালাককে শুধু ‘সম্পর্ক শেষ করার ঘোষণা’ হিসেবে দেখলে ইসলামী বিধানের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। এর সাথে জড়িয়ে আছে ইদ্দত, আর্থিক অধিকার, সন্তানের কল্যাণ এবং উভয় পক্ষের মর্যাদা রক্ষার বিষয়।

ইসলামে বিচ্ছেদের মূল শিক্ষা

ইসলামী বিধানে তালাকের ক্ষমতা স্বামীর হাতে থাকলেও স্ত্রীকে বিচ্ছেদের পথ থেকে বঞ্চিত করা হয়নি। স্বামীর তালাকের পাশাপাশি তাফভিজে তালাক, খুলা এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ফাসখের ব্যবস্থা রয়েছে।

মূল লক্ষ্য হলো—দাম্পত্য সম্পর্ক সম্ভব হলে রক্ষা করা, আর সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা বাস্তবে অসম্ভব হলে অন্যায়, নির্যাতন বা জুলুমের মধ্যে কাউকে আটকে না রেখে শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে বিচ্ছেদের সুযোগ দেওয়া। একই সাথে বিচ্ছেদের সময়ও প্রতিশোধ, অপমান বা অধিকার হরণের পরিবর্তে ন্যায়, সংযম ও সুন্দর আচরণ বজায় রাখার শিক্ষা দিয়েছে ইসলাম।