...|...|...

বিশ্ব

নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদন

ইসরায়েল সাম্রাজ্যে বড় হুমকি ইসলামপন্থি ‘কিংমেকার’ আব্বাস, যাকে হারাতে মরিয়া নেতানিয়াহু

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ১১:২৪
Shares
ইসরায়েল সাম্রাজ্যে বড় হুমকি ইসলামপন্থি ‘কিংমেকার’ আব্বাস, যাকে হারাতে মরিয়া নেতানিয়াহু

ছবি: সংগৃহীত

ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে এবার এক অভাবনীয় কৌশল নিয়েছেন আরব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মনসুর আব্বাস। দন্তচিকিৎসক থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া মনসুর আব্বাস এবং একজন ইহুদি সাবেক পুলিশ কমান্ডার মিলে ইসরায়েলের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায় রচনার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনে এমনভাবে প্রচার চালানো হচ্ছে যেন দেশটির ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হলেন মনসুর আব্বাস নামের এই ব্যক্তি। ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা ‘রাম’ নামক ইসলামপন্থি দলের প্রধান মনসুর আব্বাসকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিয়মিত প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। নেতানিয়াহু ইহুদি ভোটারদের সতর্ক করে বলছেন যে, তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হলে পরবর্তী সরকারের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠবেন এই আব্বাস, যা ইসরায়েলের ভেতর থেকেই দেশটির জন্য বিপদ ডেকে আনবে এবং ডানপন্থিদের সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ—একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে ত্বরান্বিত করবে।

তবে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। মনসুর আব্বাসের ঘোষিত অগ্রাধিকার তালিকায় পশ্চিম তীর বা গাজার চেয়ে ইসরায়েলের নিজেদের আরব নাগরিকদের স্বার্থই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ এই আরব নাগরিকেরা বর্তমানে হিংসাত্মক অপরাধ এবং বৈষম্যমূলক আবাসন নীতির কারণে মারাত্মক দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

নেতানিয়াহুর এই লাগাতার আক্রমণ মনসুর আব্বাসকে এবারের নির্বাচনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক অবস্থানে নিয়ে এসেছে। তিনি হয়ে উঠেছেন নির্বাচনের সেই ‘কিংমেকার’, যে ভূমিকা তিনি অতীতেও পালন করেছিলেন। ইসরায়েলের বহুদলীয় শাসনব্যবস্থায় বিরোধীদলীয় নেতারা যদি আব্বাসের সমর্থন গ্রহণ না করেন, তবে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে হটাতে সক্ষম এমন বড় কোনো জোট গঠন করা তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এর মধ্য দিয়ে মনসুর আব্বাস ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী আরব রাজনীতিবিদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। অথচ ১৯৯৬ সালে ইসরায়েলের ইসলামিক মুভমেন্টের একটি শাখা হিসেবে গঠিত ‘রাম’ মূলত একটি সামাজিক রক্ষণশীল দল, যা উদারপন্থি দলগুলোর সাথে তার মেলবন্ধনকে এক অদ্ভুত রাজনৈতিক সমীকরণে রূপ দিয়েছে।

মনসুর আব্বাস এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করে ‘এই বর্ণবাদী, ফ্যাসিবাদী সরকারকে’ কেবল পরাজিত করার ইচ্ছাই নয়, বরং এমন একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করা যেখানে আরব নাগরিকেরা অংশীদার হবেন, যেখানে আমাদের একটি কণ্ঠস্বর থাকবে এবং যেখানে আমাদের প্রভাব থাকবে।

উত্তর ইসরায়েলের বেদুইন শহর তুবা-জানগারিয়ায় শত শত ভোটারের এক সমাবেশে তিনি জোরালোভাবে বলেন, ক্ষমতাশালীদের টেবিলে আমরা এতিমের মতো অবহেলিত হয়ে পড়ে থাকব না। সেখানে তিনি আরব ও ইহুদিদের মধ্যে অংশীদারত্বের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

অনেকেই তাকে দেশের অন্যতম কুশলী রাজনীতিবিদ বলে মনে করেন। ২০২১ সালে নেতানিয়াহুর সাথে আলোচনা করে তার নতুন সরকারে যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে প্রথম সবার নজর কেড়েছিলেন মনসুর আব্বাস। এটি ছিল কোনো ইসলামপন্থি দলের জন্য এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি নেতানিয়াহুর বিরোধীদের সাথে হাত মিলিয়ে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। তবে এর পরের বছরই নেতানিয়াহু আবার ক্ষমতা ফিরে পান এবং ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে ডানপন্থি সরকার গঠন করেন।

এরপর ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে পরিচালিত হামলায় ইসরায়েলে প্রায় ১,২০০ মানুষ নিহত এবং প্রায় ২৫০ জন বন্দী হওয়ার পর অনেক ইসরায়েলিই দেশটির আরব নাগরিকসহ সব ফিলিস্তিনিকে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করেন।

তবে ৫২ বছর বয়সি মনসুর আব্বাস এর জবাবে ইসরায়েলি ইহুদিদের কাছে পৌঁছানোর এবং তাদের গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের প্রচেষ্টা দ্বিগুণ করেন। তিনি ঘটনার দিনই ৭ অক্টোবরের হামলার নিন্দা জানান এবং গাজা সীমান্ত থেকে পালিয়ে আসা ইসরায়েলিদের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে সাহায্য করেন। তিনি বারবার হামাসের নিন্দা করে বলেছেন যে সহিংসতার ব্যবহার কেবল ফিলিস্তিনিদেরই ক্ষতি করেছে।

তবে আসন্ন ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের আগে তিনি সব দিক থেকেই আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। নেতানিয়াহু ও তার মিত্ররা তাকে ‘সন্ত্রাসী সমর্থক’ বা তার চেয়েও খারাপ কিছু হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, একসময় যে জায়নবাদী বিরোধী নেতারা তাকে একজন সাহসী অগ্রদূত হিসেবে প্রশংসা করেছিলেন, তারাও এখন ডানপন্থি ভোটারদের মন জয় করতে প্রকাশ্যে তার থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন। এমনকি অন্য আরব দলগুলোর নেতারা—যারা সব ইসরায়েলি সরকারের প্রতিবাদ করার সহজ পথ বেছে নেন এবং কাউকেই সমর্থন করেন না—তারাও তাকে একপ্রকার ‘বিক্রি হয়ে যাওয়া ব্যক্তি’ বলে আখ্যা দেওয়ার কাছাকাছি চলে গেছেন।

তবে এসবে বিন্দুমাত্র দমে যাননি তিনি। তুবা-জানগারিয়ায় গোধূলি লগ্নে সাদা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসা শত শত মুসলিম পুরুষের সামনে দাঁড়িয়ে ইমাম হিসেবেও পরিচিত মনসুর আব্বাস নেতৃত্ব সম্পর্কে প্রবীণ মুহাম্মদের (সা.) শিক্ষা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একজন নেতার তার পথের প্রতি আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে।

এর মাত্র কয়েক দিন পর নাজারেতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি তার এ যাবতকালের সবচেয়ে সাহসী পদক্ষেপটি ঘোষণা করেন। তিনি জানান যে, মধ্য-বামপন্থি আইনপ্রণেতা এবং সাবেক শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা ইওয়াভ সেগালভিত্স হতে যাচ্ছেন ‘রাম’ দলের প্রার্থী তালিকায় দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তি। মূলধারার আরব এবং জায়নবাদী ইহুদি রাজনীতিবিদদের মধ্যে এটি একটি অভূতপূর্ব জোট।

সেগালভিত্সকে পাশে রেখে হিব্রু ভাষায় মনসুর আব্বাস বলেন, পরিবর্তন আনতে হলে অন্য ব্যক্তিকে শত্রু হিসেবে নয়, বরং একজন মানুষ হিসেবে দেখতে হবে।

আগামী ২৭ অক্টোবর এই আশার আসল পরীক্ষা হতে চলেছে। উত্তর ইসরায়েলের সাকনিমে নির্বাচনী প্রচারণার সময় শেষ বক্তৃতা শেষ হওয়ার পরেও মনসুর আব্বাস সেখানে দাঁড়িয়ে সেলফির জন্য হাসিমুখে পোজ দেন এবং পরিচিত মুখগুলোকে শুভেচ্ছা জানান। সেখানকার ৫৩ বছর বয়সি এক ভোটার ইহসান বশির অপরাধের হার কমানোর স্বার্থে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে হলেও পরবর্তী সরকারে যোগ দেওয়ার জন্য মনসুর আব্বাসের প্রতি অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, আমার এক ছেলে ও চার মেয়ে আছে। বাইরে যেতে তাদের ভয় হয়।

মনসুর আব্বাস তখন মৃদু হেসে মাথা নাড়েন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে ‘রাম’ দল প্রচুর আসন জিতবে এবং নতুন সরকারের একটি বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে।