যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ওপর হামলার জন্য তেহরানের পক্ষ থেকে তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত নিজেদের চারটি দূতাবাসের কর্মী সংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-এর এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিওকে পাঠানো এক গোপনীয় মেমোতে ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের ডিরেক্টর জে ক্লেটন জানান, মার্কিন কর্মীদের নিশানা করার প্রচেষ্টা ইরান বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
ক্লেটন ওই মেমোতে উল্লেখ করেন, মার্কিন নাগরিকদের ওপর প্রাণঘাতী হামলার জন্য ইরানের এই চক্রান্ত মধ্যপ্রাচ্যসহ নির্দিষ্ট কিছু দেশে এখন চূড়ান্ত বা উন্নত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের হাতে আসা এবং এর আগে ‘অ্যাক্সিওস’-এর প্রকাশিত এই মেমোটি তিনজন মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিশ্চিত করেছেন। ওই কর্মকর্তাদের মতে, জর্ডান, লেবানন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে কর্মী কমানোর সাম্প্রতিক ঘোষণার ঠিক পরপরই এই তথ্য সামনে আসে। ইরান এবং ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের তরফ থেকে আসা হুমকির সাথেই এই কর্মী ছাঁটাইয়ের সম্পর্ক রয়েছে।
সীমিত কার্যক্রম ও সৌদি আরবের পরিস্থিতি
যেসব দূতাবাসের কর্মী কমানো হচ্ছে, সেগুলো বর্তমানে ‘সীমাবদ্ধ কার্যক্রম’-এর আওতায় রয়েছে, যার ফলে ইতোমধ্যে সেখানে স্টাফদের উপস্থিতি কমিয়ে আনা হয়েছিল। তবে দূতাবাসগুলো খোলা থাকবে।
অবশ্য সৌদি আরবের পরিস্থিতি একটু আলাদা। গত বুধবার দেশটির কর্তৃপক্ষ সৌদি আরব থেকে অপ্রয়োজনীয় মার্কিন কর্মী ও তাদের পরিবারকে অবিলম্বে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিলেও, অপর চার দেশের কর্মীদের ক্ষেত্রে এমন বাধ্যতামূলক প্রস্থানের নির্দেশ দেওয়া হয়নি।
এই সপ্তাহে কর্মী কমানোর ঘোষণা দেওয়ার সময় মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর সরাসরি ইরানের হুমকির কথা উল্লেখ না করে মূলত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হুমকিকে দায়ী করেছিল। বর্তমানে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এবং হুথিদের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
নির্বাচনী রাজনীতি ও ট্রাম্পের বক্তব্য
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে অস্বীকার করে বলা হয়েছে যে, এই কর্মী কমানোর সিদ্ধান্তের সাথে ইরান বা ইয়েমেনে নতুন করে কোনো মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক হামলার কোনো যোগসূত্র নেই। চলমান এই ব্যয়বহুল ও অজনপ্রিয় যুদ্ধ মার্কিন নাগরিকদের জন্য জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টির জন্য রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে। কারণ আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচনে ক্ষমতা ধরে রাখতে বেশ চাপের মুখে রয়েছে রিপাবলিকানরা।
গত শুক্রবার ফ্লোরিডার এক নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানে চালানো মার্কিন সামরিক অভিযানের প্রশংসা করেন। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামের ওই অভিযানের কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, আমরা হয়তো আরও একটি ছোট্ট এপিক ফিউরি পরিচালনা করতে পারি, অথবা তারা কোনো চুক্তিতে রাজি হবে। যদি তারা বুদ্ধিমান হয়, তবে তারা বলবে— ‘আসুন এবার কাজের কথায় আসি’।
যুদ্ধ যখন একটি অচলাবস্থার দিকে মোড় নিয়েছে, তখন ওয়াশিংটন ও তেহরানকে পুনরায় আনুষ্ঠানিক আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে মধ্যস্থতাকারীরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে যুক্তরাষ্ট্র যদি সহায়তা অব্যাহত রাখে, তবে এই অঞ্চলের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে আবারও হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে রেভল্যুশনারি গার্ডের নৌবাহিনী।
চলতি সপ্তাহে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-এ প্রকাশিত এক কলামে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সতর্ক করে লিখেছেন, হরমুজ প্রণালী বা এই অঞ্চলের অন্যত্র যেকোনো ধরনের উত্তেজনা বেসামরিক মানুষের জীবন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলবে।


