...|...|...

ক্যাম্পাস

আবরার ফাহাদের স্মরণে ঢাবিতে নিপীড়নের স্মৃতি ‘আর্তনাদ-নীরব ক্রন্দন’

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৫:৪৪
Shares
আবরার ফাহাদের স্মরণে ঢাবিতে নিপীড়নের স্মৃতি ‘আর্তনাদ-নীরব ক্রন্দন’

কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি চত্বরে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ‘আর্তনাদ’ স্মৃতিস্তম্ভের উদ্বোধন করা হয়। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আবাসিক হলগুলোতে প্রচলিত রাজনৈতিক গেস্টরুম সংস্কৃতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ওপর সংঘটিত শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের স্মৃতি ধরে রাখতে ‘আর্তনাদ-নীরব ক্রন্দন’ নামে একটি স্মারক স্থাপন করা হয়েছে। বুধবার (৭ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি চত্বরে স্মারকটির উদ্বোধন করা হয়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের শহীদ হওয়ার দিন উপলক্ষে এর উদ্বোধন করা হয়।

বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের বাবা মো. বরকত উল্লাহকে সাথে নিয়ে স্মারকটির উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি আবু সাদিক কায়েম। এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ। স্মারকটির নামকরণ করেন ডাকসুর এজিএস মহিউদ্দিন খান। স্থাপত্যটির নকশা করেছেন স্থপতি নাজমুল ও তার দল।

স্মারকটির শিরোনাম ‘আর্তনাদ-নীরব ক্রন্দন’। এর সাথে লেখা রয়েছে, ‘যে কণ্ঠ রুদ্ধ করা হয়েছিল, স্থাপত্যে আজ সেই কণ্ঠই প্রতিধ্বনিত।’

স্মারকটির নকশা ও ধারণাপত্রে বলা হয়েছে, ঢাবির আবাসিক হলগুলোতে প্রচলিত রাজনৈতিক গেস্টরুম সংস্কৃতির মাধ্যমে জুনিয়র শিক্ষার্থীদের ওপর সংঘটিত শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের স্মারক হিসেবে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। বিভিন্ন নথিভুক্ত বর্ণনায় গেস্টরুমকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, জোরপূর্বক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে বাধ্য করা, মৌখিক নির্যাতন ও শারীরিক সহিংসতার স্থানে পরিণত হওয়ার কথা উঠে এসেছে।

স্থাপত্যটির আকৃতি একটি উঁচু, একখণ্ড ত্রিভুজাকার উল্লম্ব স্ল্যাবের মতো। নকশাকারদের মতে, এর মাধ্যমে গেস্টরুমের আবদ্ধ দেয়াল ও সংকুচিত পরিসরকে প্রতীকীভাবে তুলে ধরা হয়েছে। যে স্থানটির মূল অর্থ আতিথেয়তা ও আশ্রয়, অনেক শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতায় সেই স্থানই ভয়, চাপ ও জবরদস্তির পরিসরে পরিণত হয়েছিল।

স্মারকটির কালো ঊর্ধ্বমুখী অংশ অন্ধকার, গোপনীয়তা ও বন্ধ দরজার ভেতরের মানসিক চাপকে প্রতীকায়িত করছে। ওই কালো অংশের নিচ থেকে উঠে এসেছে একাধিক উজ্জ্বল সাদা মানবহাত। এগুলোকে প্রতিরোধ, আকুতি ও মুক্তির প্রচেষ্টার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। হাতগুলো নিপীড়নের শিকার অসংখ্য জুনিয়র শিক্ষার্থীর সম্মিলিত অথচ স্তব্ধ কণ্ঠকে প্রতিনিধিত্ব করছে।

এতে থাকা কালো হাতগুলো প্রতীকায়িত করছে ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক পরিচয় ও আধিপত্যকে। নকশার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, সেই আধিপত্যের আড়ালে সিনিয়ররা নির্যাতনের আয়োজন করত এবং সেটিকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করত।

স্মারকটির পৃষ্ঠে বিভিন্ন শব্দ, বিচ্ছিন্ন বাক্য ও খণ্ডিত সংলাপ খোদাই করা হয়েছে। নকশাকারদের মতে, এসব শিলালিপিতে নির্যাতনের সাথে যুক্ত সময়, নির্দেশ, প্রশ্ন, হুমকি ও কথোপকথনের অংশবিশেষ তুলে ধরা হয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক কালানুক্রম অনুসরণ না করে খণ্ডিত শব্দ ও বাক্যের মাধ্যমে গেস্টরুমের সেই আবহ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যেখানে শব্দই ভয় দেখানো ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম হয়ে উঠেছিল।

ধারণাপত্রে বলা হয়েছে, এ ধরনের চর্চার বর্ণনায় গভীর রাতের বিভিন্ন সেশনের উল্লেখ রয়েছে। এসব সময়ে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ডেকে নেওয়া হতো এবং সিনিয়রদের রাজনৈতিক নির্দেশনা অনুসরণে ব্যর্থ হলে তাদের শাস্তির মুখোমুখি হতে হতো।

স্থাপত্যটির কালো থেকে সাদায় তীব্র রূপান্তরকে নিপীড়নের অন্ধকার থেকে সত্য, প্রকাশ ও স্মৃতির দিকে যাত্রার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অন্ধকার ভেদ করে উঠে আসা হাত ও খোদাই করা শব্দগুলো ধীরে ধীরে কণ্ঠে রূপান্তরিত হওয়ার বার্তা বহন করছে।

স্মারকটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন ডাকসুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক মো. ইকবাল হায়দার, ছাত্র পরিবহন সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক মোসাদ্দেক আলী ইবনে মুহাম্মদ, ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সম্পাদক মাজাহারুল ইসলাম এবং সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের।

স্মারকটি নির্মাণে বিশেষ ধন্যবাদ জানানো হয়েছে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল সংসদের ভিপি আহসান হাবিব ইমরোজ, ডাকসুর কার্যকরী সদস্য মিফতাহুল মারুফ এবং ফজলুল হক মুসলিম হল সংসদের জিএস ইমামুল হাসানকে।

স্মারকটির ধারণাপত্রের শেষাংশে বলা হয়েছে, ‘আর্তনাদ’ কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতার উদ্‌যাপনের স্মারক নয়; এটি ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকার শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতার একটি স্থানিক সাক্ষ্য।