সাদাকালো যুগের জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুজাতা। ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র ‘রূপবান’-এ নাম ভূমিকায় অভিনয় করে ব্যাপক পরিচিতি পান তিনি। ষাটের দশকের অন্যতম সফল এই অভিনেত্রী উপহার দিয়েছেন অসংখ্য দর্শকপ্রিয় সিনেমা।
‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘অশ্রু দিয়ে লেখা’, ‘অবুঝ মন’, ‘আয়না ও অবশিষ্ট’, ‘আলোর মিছিল’, ‘এতটুকু আশা’, ‘গাজী কালু চম্পাবতী’ ও ‘অবাঞ্ছিত’সহ বহু চলচ্চিত্রে অভিনয় করে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন বাংলা চলচ্চিত্রে।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে বহু জনপ্রিয় নায়কের সঙ্গে জুটি বেঁধেছেন সুজাতা। স্বামী অভিনেতা আজিমের সঙ্গেও জুটি হয়ে অভিনয় করেছেন বেশ কয়েকটি সিনেমায়। পর্দার সেই জুটি একসময় বাস্তব জীবনেও গড়েছিলেন দাম্পত্য।
সম্প্রতি উত্তরার দোলনচাঁপা শুটিং হাউসে একটি বিজ্ঞাপনের শুটিংয়ে দেখা গেল এই অভিনেত্রীকে। সেখানে তার সঙ্গে জুটি বেঁধেছেন বরেণ্য অভিনেতা আবুল হায়াত। দীর্ঘ বিরতি, নতুন প্রজন্মের সঙ্গে কাজ এবং চলচ্চিত্রের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন সুজাতা।
দীর্ঘ বিরতির পর ক্যামেরার সামনে ফেরা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ বিরতির পর ক্যামেরার সামনে এলাম। এখন নিয়মিত নাটক, সিনেমা ও টিভিসি করছি। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে কাজ করতে ভালো লাগে। তাদের সব সময় উৎসাহিত করি। তাদের সঙ্গে কাজ করতে পারলে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করব।’
অভিনেতা আবুল হায়াতের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে সুজাতা বলেন, ‘তার মতো গুণী শিল্পীর সঙ্গে কাজ করতে পারাটা আনন্দের। তিনি একজন গুণী মানুষ, ভালো মানুষ।’
নিজের দীর্ঘ অভিনয়জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মজার ছলে এই অভিনেত্রী বলেন, ‘আমি এখন পর্যন্ত পাঁচ প্রজন্মের সঙ্গে কাজ করেছি। এটা আমার জন্য খুবই সৌভাগ্যের ব্যাপার।’
তবে চলচ্চিত্রের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কিছুটা আক্ষেপও ঝরে পড়ে বর্ষীয়ান এই অভিনেত্রীর কণ্ঠে। বিশেষ করে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (এফডিসি) নিয়ে নিজের আবেগ ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন তিনি।
সুজাতা বলেন, ‘চলচ্চিত্র মানেই এফডিসি। এফডিসিকে আমরা মা-বাবার সঙ্গে তুলনা করি। মসজিদ, মন্দিরের মতো পবিত্র স্থান মনে করি। আমরা যখন এফডিসিতে ঢুকতাম, সেটে প্রবেশ করতাম সালাম দিয়ে।
আমার পিতা দুজন—একজন আমার জন্মদাতা, আরেকজন আমার এফডিসি। জন্মদাতা আমাকে তন্দ্রা মজুমদার করেছেন, আর এফডিসি আমাকে সুজাতা বানিয়েছে। সেখানে আমার সম্মানটা অন্যরকম।’
এফডিসির সোনালি দিনের স্মৃতিচারণ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যখন এফডিসিতে শুটিং করতাম, তখন সবাই ছিলাম এক পরিবারের মতো। ভাই-বোন, চাচা-কাকা, বাবা-মা—সবাই মিলে ছিলাম এক সংসার। তখনো নানা কিছু ছিল, কিন্তু এফডিসি ঠিক ছিল। এখন এফডিসি শূন্য, চলচ্চিত্রও আগের মতো নেই। বাবা না থাকলে বাচ্চারা যেমন এতিম হয়ে যায়, তেমনি এফডিসিও এতিম হয়ে গেছে।’
এফডিসিতে অভিভাবকসুলভ নেতৃত্বের অভাবের কথা উল্লেখ করে সুজাতা বলেন, ‘এফডিসি চালানোর মতো কোনো অভিভাবক নেই। যারা প্রতিবাদ করবেন, শাসন করবেন, যাদের কথায় এফডিসি কেঁপে উঠবে, সেই মানুষগুলো এখন নেই।
আমাদের সময় খান আতা, আজিম, কাজী জহির—তাদের এক আওয়াজেই এফডিসি কেঁপে উঠত। কাকে বাদ দেব, তখন এফডিসিতে বাঘেরা থাকতেন। বাঘকে কে না ভয় পায়! এখন এফডিসিতে বাঘ নেই, বাঘ তৈরি হয়নি। আমরাই ব্যর্থ হয়েছি বাঘ তৈরি করতে।’
এফডিসির পরিবর্তন প্রসঙ্গে এই অভিনেত্রীর পরামর্শ, চলচ্চিত্রে ফিরিয়ে আনতে হবে গল্পনির্ভর সিনেমা এবং সবার মধ্যে তৈরি করতে হবে এফডিসির প্রতি ভালোবাসা। আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে এফডিসিতে যে আবর্জনা আছে, তা ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করে বসবাস করতে হবে।’
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে কোনো অপূর্ণতা বা আক্ষেপ রয়েছে কি না, জানতে চাইলে সুজাতা বলেন, ‘আমার আর কোনো আক্ষেপ নেই। সব পেয়েছি।’

