দরিদ্র, অতি দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারকে সমন্বিত সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় আনতে ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা, ২০২৬’ জারি করেছে সরকার। নতুন নীতিমালার আওতায় পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকা ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি এখন সারা দেশে বৃহৎ পরিসরে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামো পেল।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা নীতিমালায় কারা এই সুবিধা পাবেন এবং কারা পাবেন না, সে বিষয়ে বিস্তারিত শর্ত দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আট ধরনের ব্যক্তি বা পরিবারের জন্য ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা প্রযোজ্য হবে না।
সরকারের লক্ষ্য, এ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের প্রায় ২ কোটি নারী পরিবার প্রধানকে সরাসরি সরকারি পদ্ধতিতে মাসিক নগদ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জীবনধারণের মৌলিক চাহিদা পূরণে সহায়তা দেওয়াই এ কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য।
নীতিমালায় পরিবারকে উন্নয়নের প্রধান একক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এই ধারণার ভিত্তিতে প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
‘ওয়ান-আইডি’ হবে কর্মসূচির ভিত্তি
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে দেশের প্রতিটি পরিবারকে একটি একক ডিজিটাল পরিচয়ের আওতায় আনার জন্য ‘ওয়ান-আইডি’ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হবে। এটি শুধু একটি পরিচয় নম্বর হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় তথ্য ব্যবস্থাপনার একটি সমন্বিত ডেটা কাঠামো হিসেবে কাজ করবে। প্রয়োজন ও যথাযথ অনুমোদন সাপেক্ষে জাতীয় স্বার্থে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এ তথ্য ব্যবহারের সুযোগ পাবে।
যে ৮ শ্রেণির মানুষ ফ্যামিলি কার্ড পাবেন না
নীতিমালায় একটি বহির্ভূত তালিকা বা ‘নেগেটিভ লিস্ট’ রাখা হয়েছে। তালিকাভুক্ত যেকোনো একটি শর্ত কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলে তারা ফ্যামিলি কার্ডের নগদ সহায়তার জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন না।
১. নির্ধারিত পিএমটি স্কোরের বেশি:
সরকার নির্ধারিত পিএমটি স্কোরের সর্বোচ্চ সীমার চেয়ে বেশি স্কোর পাওয়া পরিবার এ সুবিধার বাইরে থাকবে।
২. নিয়মিত বেতন পাওয়া সরকারি চাকরিজীবী:
পরিবারের মনোনীত নারী প্রধান সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে নিয়মিত বেতন-ভাতা পেলে তিনি ফ্যামিলি কার্ড পাবেন না। এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীরাও এ সুবিধার আওতায় আসবেন না।
৩. নিয়মিত সরকারি পেনশনভোগী:
মনোনীত নারী প্রধান নিয়মিত সরকারি পেনশন বা একই ধরনের অবসরকালীন সুবিধা গ্রহণ করলে তিনি ফ্যামিলি কার্ডের জন্য বিবেচিত হবেন না। তবে প্রতিবন্ধী সন্তান হিসেবে বিশেষ পেনশন পাওয়া ব্যক্তির ক্ষেত্রে এ শর্ত প্রযোজ্য হবে না।
৪. ৫ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয় বা বিনিয়োগ:
পরিবারের কোনো সদস্যের নামে জাতীয় সঞ্চয়পত্রে ৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ থাকলে ওই পরিবার সুবিধা পাবে না। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৫ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়, স্থায়ী আমানত বা অন্য ধরনের বিনিয়োগ থাকলেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে।
৫. তিন বা চার চাকার নিবন্ধিত মোটরযানের মালিক:
পরিবারের কোনো সদস্যের নামে বিআরটিএ নিবন্ধিত নির্দিষ্ট ধরনের তিন বা চার চাকার যানবাহন থাকলে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে না। এর মধ্যে ফোর-স্ট্রোক সিএনজি বা পেট্রলচালিত থ্রি-হুইলার, কার, জিপ, পিকআপ, বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, লরি ও মাইক্রোবাস অন্তর্ভুক্ত।
৬. বড় ব্যবসা বা সক্রিয় বাণিজ্যিক কার্যক্রম:
পরিবারের কোনো সদস্যের নামে বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান অথবা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে হালনাগাদ লাইসেন্সসহ ব্যবসা পরিচালিত হলে সেই পরিবার এ কর্মসূচির সুবিধা থেকে বাদ পড়বে।
৭. নিয়মিত আয়করদাতা:
পরিবারের কোনো সদস্য নিয়মিত করদাতা হলে এবং তার করযোগ্য আয় থাকলে ওই পরিবার ফ্যামিলি কার্ড পাওয়ার যোগ্য হবে না।
৮. নির্ধারিত সীমার বেশি জমি বা সম্পত্তি:
বসতভিটাসহ পরিবারের মোট আবাদি জমির পরিমাণ শূন্য দশমিক ৫০ একর বা তার বেশি হলে ফ্যামিলি কার্ড মিলবে না। এ ছাড়া অকৃষি জমি, বাণিজ্যিক জমি বা স্পেসের বাজারমূল্য ৫ লাখ টাকার বেশি হলেও সংশ্লিষ্ট পরিবার এ সুবিধার বাইরে থাকবে।
একই সাথে একাধিক সমজাতীয় সরকারি সুবিধা নয়
নীতিমালায় বলা হয়েছে, ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় থাকা মনোনীত নারী পরিবার প্রধান একই সময়ে অন্য কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সমজাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে আর্থিক, খাদ্য বা অনুরূপ সুবিধা নিতে পারবেন না।
কোনো নারী আগে থেকেই টিসিবির স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি বা ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট (ভিডব্লিউবি) কর্মসূচির সুবিধা পেয়ে থাকলে কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ যাচাইয়ের পর তার পূর্ববর্তী সুবিধা বাতিল বা স্থগিত করা হতে পারে।
একইভাবে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা কিংবা এ ধরনের অন্য কোনো সরকারি নগদ সহায়তা গ্রহণকারী মনোনীত নারী প্রধানকে ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা নিতে হলে পূর্বের সমজাতীয় সুবিধা ছাড়তে হবে।
তবে মনোনীত নারী পরিবার প্রধান ছাড়া পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বিভিন্ন সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন।


