বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের ইতিহাসে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচন হয়েছে মাত্র একবার। ১৯৮৯ সালের ২৫ জুন তৎকালীন বান্দরবান পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদের প্রথম প্রত্যক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর কেটে গেছে ৩৭ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে আর কোনো প্রত্যক্ষ নির্বাচন হয়নি। সরকার মনোনীত চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়েই বিভিন্ন সময়ে পরিষদের কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সরকারি ওয়েবসাইটের ‘এক নজরে জেলা পরিষদ’ অংশের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালের ২৫ জুন প্রথম প্রত্যক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১১ জুলাই নির্বাচিত পরিষদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয় এবং ১২ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে পরিষদের কার্যক্রম শুরু হয়। একই সরকারি সূত্রে বলা হয়েছে, ওই নির্বাচনের পর অদ্যাবধি আর কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি।
অর্থাৎ, ২০২৬ সালের আগস্টে এসে ওই প্রথম নির্বাচনের পর পেরিয়ে গেছে প্রায় ৩৭ বছর দুই মাস।
নির্বাচনের পর প্রথম চেয়ারম্যান সা চিং প্রু জেরী
১৯৮৯ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন সা চিং প্রু জেরী। তোমার সংগৃহীত জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও সদস্যদের তালিকার তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২ জুলাই ১৯৮৯ থেকে ৩ মার্চ ১৯৯৬ পর্যন্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ওই পরিষদে পাহাড়ের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং বাঙালি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব ছিল। তৎকালীন পরিষদের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন মোহাম্মদ ইউনুস, আমির হোসেন মজুমদার, মেলে ম্রো, থোয়াইন চহ্লা, মং থোয়াইন চাক, বাচা খিয়াং, মিলন স্মৃতি চাকমা, প্রদয় ম্রো, লক্ষ্মী পদ পাল, ইউ ফো চা মারমা, মং ক্য চিং চৌধুরী, জলিলুর রহমান, অধ্যাপক ওসমান গণি, মোহাম্মদ আবদুস শুক্কুর, বদিউল আলম, প্রসন্ন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা, হ্লা চিং মং ও অং সিং মারমাসহ অনেকে।
ওই সময়ের পরিষদের সদস্য ছিলেন বীর বাহাদুর উশৈ সিংও। পরবর্তী সময়ে তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য ও সরকারের মন্ত্রী হন।
নাম বদলেছে, নির্বাচন ফেরেনি
১৯৮৯ সালের নির্বাচনের সময় পরিষদটির নাম ছিল পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ। পরে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন করা হয়। ১৯৯৮ সালে পরিষদের নাম পরিবর্তন করে পার্বত্য জেলা পরিষদ করা হয়। কিন্তু নাম পরিবর্তনের পরও আর নির্বাচন হয়নি।
এর আগে ১৯৯৬ সালের ৫ আগস্ট তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ভেঙে দিয়ে চেয়ারম্যান ও চার সদস্যের সমন্বয়ে অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ গঠন করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকার পরিষদ পুনর্গঠন করেছে।
২০১৫ সালে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্যসংখ্যা বাড়িয়ে চেয়ারম্যানসহ ১৫ সদস্যের কাঠামো করা হয়। তবুও নির্বাচন হয়নি।
ফলে দেশের অন্যান্য জেলা পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—এই তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ নির্বাচনের বাইরে থেকে গেছে। ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর দেশের ৬১টি জেলা পরিষদে নির্বাচন হলেও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে কোনো নির্বাচন হয়নি।
২০২৬-এও অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ
দীর্ঘ অপেক্ষার পরও ২০২৬ সালে এসে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদে নির্বাচনের পরিবর্তে আবারও অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে।
২০ আগস্ট সরকার মাম্যাচিংকে চেয়ারম্যান করে ১৫ সদস্যের নতুন অন্তর্বর্তীকালীন বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন করে। চেয়ারম্যানের সাথে ১৪ জন সদস্য রয়েছেন। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা প্রজ্ঞাপনের ভিত্তিতে নতুন পরিষদ গঠনের খবর প্রকাশ করেছে বাসসসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।
নতুন পরিষদের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন চনুমং, মং ক্যনু মারমা, লুসাই মং, মাওসেতুং তংচংগ্যা, দনওয়াই ম্রো, আগস্টিন ত্রিপুরা, অংজাই উই চাক, রিয়াল দাও বম, আবদুল মাবুদ, মশিউর রহমান, মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন, ক্যউ প্রু খিয়াং, উম্যাসিং মারমা ও কাজী নিরুতাজ বেগম।
অর্থাৎ, ১৯৮৯ সালের ২৫ জুনের নির্বাচনের পর ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদে আর কোনো প্রত্যক্ষ নির্বাচন হয়নি।
সেই প্রথম চেয়ারম্যান এখন পার্বত্যমন্ত্রী
এই দীর্ঘ ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক সমাপতনও রয়েছে।
১৯৮৯ সালে বান্দরবান পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদের প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান হয়েছিলেন সা চিং প্রু জেরী। ৩৭ বছর পর তিনি এখন জাতীয় রাজনীতির আরও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে।
২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বান্দরবান-৩০০ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ২১ আগস্ট তাঁকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে শপথ করানো হয়েছে। বাসসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২২ আগস্ট তিনি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পেয়েছেন।
অর্থাৎ, যে ব্যক্তির নেতৃত্বে বান্দরবান পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদের নির্বাচনী যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই সা চিং প্রু জেরী এখন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। অথচ তার নেতৃত্বে শুরু হওয়া সেই নির্বাচনী ধারাবাহিকতা আর ফিরে আসেনি।
আইনে নির্বাচন, বাস্তবে মনোনয়ন
বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্যেই বলা হয়েছে, ১৯৮৯ সালের পর আর কোনো নির্বাচন হয়নি।
এখানেই তৈরি হয়েছে দীর্ঘদিনের একটি মৌলিক প্রশ্ন—আইনে নির্বাচিত পরিষদের যে কাঠামো নির্ধারিত রয়েছে, সেটি বাস্তবে কবে কার্যকর হবে?
সরকারি একটি নথিতেও উল্লেখ রয়েছে, ২৫ জুন ১৯৮৯ সালে তিন পার্বত্য জেলার তৎকালীন স্থানীয় সরকার পরিষদে প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং চেয়ারম্যান ও সদস্যরা সরাসরি নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে তিন দশকের বেশি সময় নির্বাচন না হওয়ায় পরিষদগুলোর চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগের মাধ্যমে দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছে।
এখানে শুধু নির্বাচন হওয়ার বিষয়টি নয়, জনপ্রতিনিধিত্বের ধারাবাহিকতা, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং পরিষদের সাংবিধানিক-আইনি অবস্থান—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এখন প্রশ্ন—পরবর্তী নির্বাচন কবে?
১৯৮৯ সালের ২৫ জুন ভোট হয়েছিল। সেই নির্বাচনের পর নির্বাচিত পরিষদ দায়িত্ব নিয়েছিল। এরপর সরকার পরিবর্তন হয়েছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলেছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি হয়েছে, আইন সংশোধন হয়েছে, পরিষদের কাঠামো বদলেছে, সদস্যসংখ্যা বেড়েছে—কিন্তু নির্বাচন হয়নি।
২০২৬ সালের আগস্টে এসেও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ আবার একটি অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
তাই ৩৭ বছরের ইতিহাস এখন একটি সরল পরিসংখ্যানের চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৯৮৯ সালের ২৫ জুন যে নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তার দ্বিতীয় অধ্যায় কবে শুরু হবে?
বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সামনে এখন এটাই সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক প্রশ্ন।


