...|...|...

সারাদেশ

১৮ লাখ মানুষের শহরে গণপরিবহনের সংকট

খুলনা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২ নভেম্বর ২০২৬, দুপুর ১:৫৮
Shares
১৮ লাখ মানুষের শহরে গণপরিবহনের সংকট

ছবি: টাইমস টুডে

দেশের তৃতীয় বৃহত্তম নগরী খুলনা। শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে প্রতিদিন এ শহরে চলাচল করেন অসংখ্য মানুষ। অথচ নগরীর ভেতরে নিয়মিত বাসসেবা না থাকায় সাশ্রয়ী গণপরিবহনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নগরবাসী। যাতায়াতের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক, রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা। এতে একদিকে বাড়ছে যাতায়াত ব্যয়, অন্যদিকে যানজট ও ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা।

চলতি বছরের গত ৩১ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, খুলনা নগরীতে একসময় ২০০৫ সালে প্রায় ৬০টি বাস চলাচল করত। ২০১৭ সালে তা কমে পাঁচটিতে দাঁড়ায়। ২০১৮ সাল নাগাদ চলাচলকারী বাসের সংখ্যা নেমে আসে একটিতে। পরে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়।

বাসসেবা না থাকায় শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষকে বিকল্প যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। যাত্রীদের অভিযোগ, এসব যানবাহনে ভাড়া নির্ধারণে অনেক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নেই। ফলে একই দূরত্বে যাতায়াতেও ভাড়ার ভিন্নতা দেখা যায়।

খুলনা সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে সড়কের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৪০ কিলোমিটার। উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত এ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াতপথের একটি ফুলতলা-রূপসা সড়ক। সংশ্লিষ্টদের মতে, নগরীর বড় একটি অংশের মানুষ কোনো না কোনোভাবে এ পথ ব্যবহার করেন।

এদিকে গণপরিবহনের বিকল্প হিসেবে ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা বেড়েছে। গত ৯ মার্চ মাসে নগরীর যানজট নিরসনে কেসিসির এক যৌথসভায় জানানো হয়, নগরীতে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের জন্য প্রায় ১০ হাজার ইজিবাইক চলাচলের অনুমতি রয়েছে। পাশাপাশি ১৭ হাজার রিকশার লাইসেন্স দেওয়া হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নবায়ন করা হয়েছিল মাত্র ৬৮০টি। সভায় অনুমোদনহীন যানবাহনের প্রবেশ, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা ও নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড না থাকাকে যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

শহরের শিববাড়ী, ময়লাপোতা, রয়্যাল মোড়, ডাকবাংলা, সোনাডাঙ্গা ও দৌলতপুর এলাকায় ব্যস্ত সময়ে যানজটের চাপ বেশি দেখা যায়। গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ইজিবাইকের জটলা, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা এবং সড়কের পাশে অবৈধ পার্কিং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন নারী, শিক্ষার্থী, প্রবীণ ও কর্মজীবী মানুষ। বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে যানবাহনে আসন না পাওয়া, গাদাগাদি করে যাতায়াত এবং বাড়তি ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁদের।

খুলনা নগরীর রায়েরমহলের বাসিন্দা আনাস বলেন, খুলনা শহরে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে হলে বেশির ভাগ সময় ইজিবাইক বা রিকশার ওপর নির্ভর করতে হয়। নিয়মিত বাস চলাচল না থাকায় যাতায়াতে খরচও বেশি পড়ে। শহরে সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী গণপরিবহন চালু করা জরুরি।

পাওয়ার হাউজ এলাকার কর্মজীবী রাজু শেখ বলেন, প্রতিদিন কাজের প্রয়োজনে আমাকে বাইরে যেতে হয়। যাতায়াতের পেছনেই প্রতিদিন একটা উল্লেখযোগ্য টাকা খরচ হয়ে যায়। বাস থাকলে কম খরচে যাতায়াত করতে পারতাম। কিন্তু খুলনায় সেই সুযোগ নেই। আমাদের মতো সীমিত আয়ের মানুষের জন্য নিয়মিত বাসসেবা খুব প্রয়োজন।

নগরীর বৈকালী এলাকার শিক্ষার্থী মিজানুর রহমান সুজন আকন বলেন, প্রতিদিন ক্লাস করতে যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু বাস না থাকায় ইজিবাইক বা অন্য যানবাহনে চলাচল করতে হয়। এতে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত খরচ বেড়ে যায়। অনেক সময় যানজটে পড়ে ক্লাসেও দেরি হয়। শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট রুটে বাস চালু হলে অনেক উপকার হতো।

নারীদের জন্য আলাদা বাসসেবা চালুর দাবিও উঠেছে। কর্মজীবী নারী ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, গণপরিবহনের সীমিত সুযোগ এবং বিকল্প যানবাহনে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত হচ্ছে না।

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, খুলনার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় শহরে নিয়মিত গণপরিবহন না থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষার্থী, কর্মজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষ। ইজিবাইক ও রিকশা নগরীর যাতায়াতের চাহিদা পূরণ করলেও এগুলো কখনোই পরিকল্পিত গণপরিবহনের বিকল্প হতে পারে না। নগরীর জনসংখ্যা ও যাত্রী চাহিদা বিবেচনায় নির্দিষ্ট রুটে পর্যাপ্ত বাস চালু করা জরুরি। পাশাপাশি ভাড়া নির্ধারণ, নির্দিষ্ট স্টপেজ ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু পরিকল্পনা ঘোষণা নয়, দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে নগরবাসীর দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তি দূর করতে হবে।

গত মার্চে কেসিসির সভায় যানজট কমাতে বাস ও ট্রাক নির্ধারিত স্ট্যান্ডে রাখা, ইজিবাইক ও রিকশার জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্ট্যান্ড নির্মাণ এবং যানবাহন চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আনার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। তবে নগরবাসীর প্রত্যাশা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পরিকল্পিত বাসসেবা চালুর উদ্যোগও নেওয়া হবে।

খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, নগরীতে বাসসেবা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কার্যকর বিকল্প হিসেবে ইলেকট্রিক বাস চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং যানজট নিরসনে সিটি করপোরেশন বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে কাজ করছে। বাসসেবা পুনরায় চালু করা সেই পরিকল্পনারই একটি অংশ।

এ বিষয়ে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এস এম শফিকুল আলম মনা বলেন, জাতীয় সংসদের মাননীয় হুইপ ও খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ রকিবুল ইসলাম বকুল খুলনা মহানগরীতে ইলেকট্রিক বাস চালুর পরিকল্পনা গ্রহণ করছেন। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নগরবাসীর জন্য সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।

বিশেষজ্ঞ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ করে নগরীর পরিবহন সংকট সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট রুটে নিয়মিত বাসসেবা, নির্ধারিত স্টপেজ, ভাড়ার স্বচ্ছতা এবং সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা।