...|...|...

জাতীয়

১৩ নভেম্বর কি পৃথিবী ধ্বংস হবে, ৬৬ বছর আগের গবেষণায় যা ছিল

বিবিসি
প্রকাশ: ৬ নভেম্বর ২০২৬, বিকেল ৪:০২ | আপডেট: ৬ নভেম্বর ২০২৬, বিকেল ৪:১৪
Shares
১৩ নভেম্বর কি পৃথিবী ধ্বংস হবে, ৬৬ বছর আগের গবেষণায় যা ছিল

ছবি: সংগৃহীত

২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর পৃথিবী ধ্বংস হবে- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন দাবি ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে দিনটির সাথে পৃথিবীর ধ্বংস কিংবা কোনো মহাজাগতিক বিপর্যয়ের বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক নেই। ১৯৬০ সালে প্রকাশিত একটি জনসংখ্যাবিষয়ক গবেষণার গাণিতিক হিসাবকে কেন্দ্র করেই মূলত এই ধারণার সূত্রপাত।

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬০ সালের ৪ নভেম্বর মার্কিন বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ। অস্ট্রীয়-মার্কিন পদার্থবিদ হেইঞ্জ ফন ফোরস্টার, প্যাট্রিশিয়া মোরা ও লরেন্স অ্যামিয়ট যৌথভাবে এটি প্রস্তুত করেন। গবেষণার শিরোনাম ছিল ‘ডুমসডে: ফ্রাইডে, নভেম্বর ১৩’।

গবেষকেরা প্রায় দুই হাজার বছরের জনসংখ্যা বৃদ্ধির তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি গাণিতিক মডেল তৈরি করেছিলেন। তাদের হিসাব অনুযায়ী, অতীতের জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধারা একইভাবে অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালের নভেম্বরে মানুষের সংখ্যা গাণিতিকভাবে ‘অসীমে’ পৌঁছানোর কথা। মডেলটির হিসাব অনুযায়ী, সেই সময়টি ছিল ২০২৬.৮৭; সেখান থেকেই ১৩ নভেম্বর তারিখটি নির্ধারণ করা হয়।

তবে গবেষকেরা মানবজাতির বিলুপ্তি কিংবা পৃথিবী ধ্বংসের কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করেননি। তাদের ব্যবহৃত ‘ডুমসডে’ শব্দটি ছিল জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটি কাল্পনিক গাণিতিক পরিস্থিতি বোঝানোর জন্য। বাস্তবে কোনো নির্দিষ্ট দিনে পৃথিবীর জনসংখ্যা অসীম হয়ে যাওয়ার অর্থও নেই।

১৯৬৪ সালের সংবাদপত্রের নিবন্ধ ঘিরে বিভ্রান্তি

বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসার আরেকটি কারণ ১৯৬৪ সালের ২৯ নভেম্বর মিশরীয় সংবাদপত্র ‘ওয়াতানি’-তে প্রকাশিত মিশেল তাকলারের একটি নিবন্ধ। ওই লেখার শিরোনামেও ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর পৃথিবীর সমাপ্তির কথা উল্লেখ ছিল। সম্প্রতি বিভিন্ন আরব গণমাধ্যমে পুরোনো নিবন্ধটির ছবি প্রকাশিত হলে বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ বাড়ে।

তবে ১৯৬০ সালের বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং ১৯৬৪ সালের সংবাদপত্রের নিবন্ধ এক বিষয় নয়। ফন ফোরস্টার ও তার সহকর্মীদের গবেষণাটি মিশেল তাকলারের লেখা বা গবেষণা ছিল না। আবার তাকলারের নিবন্ধের বিষয়বস্তু নিয়েও বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। তাই দুটি বিষয়কে এক করে কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।

কিছু প্রতিবেদনে ১৩ নভেম্বরের সাথে সৌর কার্যকলাপ, চৌম্বকীয় অস্থিরতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্ভাবনাও যুক্ত করা হয়েছে। তবে ১৯৬০ সালের গবেষণায় ওই তারিখের সাথে সৌরঝড়, ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত কিংবা অন্য কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্পর্ক দেখানো হয়নি।

১৩ নভেম্বর নিয়ে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক আতঙ্কের কারণ নেই

জর্ডানীয় জ্যোতির্বিদ এমাদ মুজাহেদ বলেছেন, ২০২৬ সালে সৌর কার্যকলাপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকলেও এটি বিজ্ঞানীদের কাছে পরিচিত একটি প্রাকৃতিক চক্র। সৌরঝড়ও নতুন কোনো ঘটনা নয়। বিজ্ঞানীরা এখন আগের তুলনায় এসব ঘটনা আরও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ ও পূর্বাভাস দিতে পারেন।

বিবিসিকে মুজাহেদ বলেন, ১৩ নভেম্বর এমন কোনো পরিচিত বা প্রত্যাশিত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা নেই, যা পৃথিবীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বা আতঙ্কের কারণ হতে পারে। গাণিতিক সমীকরণ কিংবা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মডেল দিয়ে পৃথিবীর সমাপ্তির তারিখ নির্ধারণের সম্ভাবনাও নাকচ করেন তিনি।

শক্তিশালী সৌরঝড় পৃথিবীর যোগাযোগব্যবস্থা, উপগ্রহ, নেভিগেশন ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটাতে পারে। তবে এ ধরনের ঝুঁকির অর্থ এই নয় যে সূর্য কোনো নির্দিষ্ট দিনে পৃথিবী ধ্বংস করবে।

কেন ১৯৬০ সালের হিসাব বাস্তব হয়নি

পুরোনো গবেষণার প্রধান সীমাবদ্ধতা ছিল, এতে ধরে নেওয়া হয়েছিল অতীতের জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধারা ভবিষ্যতেও একইভাবে চলবে। কিন্তু গত কয়েক দশকে জন্মহার, মৃত্যুহার এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে।

১৯৬০-এর দশকে বিশ্বে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর তা কমতে শুরু করে। ফলে গবেষকদের ব্যবহৃত গাণিতিক মডেলের অনুমিত প্রবৃদ্ধি বাস্তবে অব্যাহত থাকেনি।

গবেষণাটি প্রকাশের সময় বিশ্বের জনসংখ্যা ছিল আনুমানিক ৩০০ কোটি। বর্তমানে তা ৮০০ কোটির বেশি। তবে এটি ওই গবেষণার সমীকরণে অনুমিত অসীম জনসংখ্যার কাছাকাছিও নয়।

জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগের ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন প্রসপেক্টস ২০২৪’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৮২০ কোটি। ২০৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তা প্রায় ১ হাজার ৩০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। এরপর কমে ২১০০ সালে প্রায় ১ হাজার ২০ কোটিতে নেমে আসার পূর্বাভাস রয়েছে।

অর্থাৎ, ১৯৬০ সালের গবেষণায় ব্যবহৃত গাণিতিক অনুমানের সাথে বর্তমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির বাস্তব প্রবণতার মিল নেই। তাই ১৩ নভেম্বর ২০২৬ পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার দাবি ওই গবেষণার বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত নয়।