...|...|...

সারাদেশ

হাতে মোমবাতি, কণ্ঠে প্রার্থনা—গারো পাহাড়ে হাজারো পুণ্যার্থীর ঢল

স্টাফ রিপোর্টার, শেরপুর
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৪:২৮
Shares
হাতে মোমবাতি, কণ্ঠে প্রার্থনা—গারো পাহাড়ে হাজারো পুণ্যার্থীর ঢল

গারো পাহাড়ে হাজারো পুণ্যার্থীর ঢল। ছবি: টাইমস টুডে

হাতে জ্বলন্ত মোমবাতি, কণ্ঠে প্রার্থনার সুর, হৃদয়জুড়ে বিশ্বাস আর ভক্তি। গারো পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে এগিয়ে চলেছেন হাজারো পুণ্যার্থী। কেউ এসেছেন প্রিয়জনের রোগমুক্তির আশায়, কেউ পাপমোচনের প্রার্থনায়, আবার কেউ হাত তুলেছেন পরিবার, দেশ ও জাতির শান্তি-সমৃদ্ধি কামনায়। হাজারো মোমবাতির মৃদু আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ি জনপদ। সৃষ্টি হয় এক অপার্থিব, আবেগঘন পরিবেশ।

এমনই এক দৃশ্যের অবতারণা ঘটে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার বারোমারী সাধু লিওর ধর্মপল্লিতে অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী ফাতেমা রানী মা মারিয়ার তীর্থোৎসবে। দেশ-বিদেশ থেকে আসা প্রায় ৫০ হাজার পুণ্যার্থীর পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে গারো পাহাড়ের পাদদেশ।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেল ৪টায় পবিত্র খ্রিষ্টযাগের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ক্যাথলিক খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অন্যতম বৃহৎ এই ধর্মীয় আয়োজনের ২৯তম আসর। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘মানবতার জননী: ফাতেমা রানী মা মারিয়া’।

উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল রাত ৯টার মোমবাতির আলোক শোভাযাত্রা। হাজারো পুণ্যার্থী হাতে মোমবাতি নিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার পাহাড়ি পথ প্রদক্ষিণ করেন। অন্ধকার পাহাড়ের বুকজুড়ে জ্বলে ওঠা অসংখ্য মোমের আলো আর সম্মিলিত প্রার্থনার ধ্বনিতে সৃষ্টি হয় এক হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য। শোভাযাত্রা শেষে মা মারিয়ার মূর্তির পাদদেশে সমবেত হয়ে বিশ্বশান্তি, মানবকল্যাণ ও নিজেদের মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করেন ভক্তরা।

রাতভর আরাধনা, নিরাময় অনুষ্ঠান ও নিশি জাগরণের মধ্য দিয়ে চলে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) জীবন্ত ক্রুশের পথ ও মহাখ্রিষ্টযাগের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দুই দিনের এই তীর্থোৎসব।

আয়োজক সূত্রে জানা যায়, পর্তুগালের ফাতেমা নগরীর আদলে ১৯৪২ সালে প্রায় ৪২ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় বারোমারী সাধু লিওর ধর্মপল্লি। ১৯৯৮ সালে স্থানটি বার্ষিক তীর্থস্থান হিসেবে নির্বাচিত হয়। প্রতিবছর অক্টোবরের শেষ বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার এখানে অনুষ্ঠিত হয় ফাতেমা রানীর তীর্থোৎসব।

বারোমারী খ্রিষ্টান মিশনের ফাদার তরুণ বনোয়ারী জানান, মা মারিয়ার প্রতি গভীর বিশ্বাস ও ভালোবাসা থেকেই দূরদূরান্তের মানুষ এখানে ছুটে আসেন। নিজেদের পাপমোচন, পরিবারের মঙ্গল এবং দেশ ও জাতির কল্যাণে প্রার্থনা করেন তারা। এবার অন্য বছরের তুলনায় পুণ্যার্থীদের উপস্থিতি বেশি হয়েছে।

শুধু ধর্মীয় উৎসবই নয়, বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের উপস্থিতিতে পাহাড়ঘেরা এই তীর্থস্থান পরিণত হয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মানবিক ভালোবাসার এক অনন্য মিলনমেলায়।

এদিকে তীর্থোৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে নেওয়া হয় তিন স্তরের কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা। পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-সহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চার শতাধিক সদস্য দায়িত্ব পালন করেন।

শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন জানান, উৎসব সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে এক সপ্তাহ আগে থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়। পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

দুই দিনের উৎসব শেষে পুণ্যার্থীরা ফিরে গেলেও গারো পাহাড়ের বুকে জ্বলে ওঠা হাজারো মোমবাতির আলো যেন রেখে যায় শান্তি, বিশ্বাস, ভালোবাসা আর সম্প্রীতির এক অনন্য বার্তা।