যে দোকানে স্বামীকে হারিয়েছেন, এক বছর পরও সেই দোকানটিই আঁকড়ে বেঁচে আছেন ৫০ বছরের মীরা বেগম। পুত্র সন্তান নেই। একমাত্র মেয়েরও বিয়ে হয়ে গেছে। স্বামীর রেখে যাওয়া প্রায় দেড় লাখ টাকার ঋণ নিজের পরিশ্রমের টাকায় পরিশোধ করেছেন তিনি। এখন চা বিক্রি করেই চলছে তার জীবন। তবে কারও কাছে হাত পেতে নয়, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাজ করেই বাঁচতে চান মীরা।
খুলনা নগরীর বয়রা ইমাম প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সামনের ফুটপাতে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান। দোকানটি শুধু মীরার জীবিকার মাধ্যম নয়, এটি তার ঘর-সংসার, স্বামীর স্মৃতি আর বেঁচে থাকার অবলম্বন।
এই দোকানের সাথেই জড়িয়ে আছে মীরার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের স্মৃতি। গত বছরের ২৪ আগস্ট এই দোকানেই স্ট্রোক করে মারা যান তার স্বামী খোকন হাওলাদার। যে জায়গায় স্বামীর সাথে বসে সংসারের স্বপ্ন দেখেছিলেন, আজ সেই জায়গাতেই একা বসে জীবন চালাচ্ছেন মীরা।
স্বামীর কথা উঠতেই ভারী হয়ে আসে মীরার কণ্ঠ। চোখে পানি জমে। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর চোখ মুছে আবারও চায়ের কাপে পানি ঢালেন তিনি। কারণ, শোক করার জন্য থেমে থাকার সুযোগ নেই তার।
মীরা বেগম বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর খুব কষ্টে পড়েছিলাম। দোকানটা ছেড়ে দিলে আমার আর চলার কোনো পথ ছিল না। তাই এই দোকানেই বসে আছি। স্বামীর কথা মনে পড়লে খুব কষ্ট হয়, তারপরও কাজ করতে হয়।
পুত্র সন্তান না থাকায় স্বামীকে হারানোর পর একাই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন মীরা। একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। নিজের সংসারে মেয়েরও নানা দায়িত্ব। ফলে মীরার জীবনযুদ্ধটা মূলত একারই।
স্বামীর রেখে যাওয়া প্রায় দেড় লাখ টাকার ঋণও তাকে পরিশোধ করতে হয়েছে। কারও কাছে হাত না পেতে চা বিক্রি করে ধীরে ধীরে সেই ঋণ শোধ করেছেন তিনি।
মীরা বলেন, অনেক টাকা ঋণ ছিল। ধীরে ধীরে চা বিক্রি করে সেই টাকা পরিশোধ করেছি। কারও কাছে হাত পাততে চাই না। যতদিন শরীরে শক্তি আছে, কাজ করে খেতে চাই।
মীরার এই জীবনসংগ্রামে পাশে দাঁড়িয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন খুলনা ব্লাড ব্যাংক। যাকাতের অর্থায়নে কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগের অংশ হিসেবে মীরার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে ছোট্ট এই চায়ের দোকানটি। সংগঠনটির এই সহায়তা মীরার কাছে শুধু একটি দোকান নয়; স্বামীর স্মৃতিকে আঁকড়ে নতুন করে বেঁচে থাকার সাহসও দিয়েছে।
মীরার প্রতিদিনের জীবন শুরু হয় সেই একই দোকানে। সকালে চুলায় আগুন জ্বালান, পানি বসান, চা তৈরি করেন। সারাদিন ক্রেতাদের চা দেন। দিনের শেষে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে তার জীবন।
এক বছর আগে এই দোকানেই থেমে গিয়েছিল খোকন হাওলাদারের জীবন। কিন্তু থামেনি মীরা বেগমের পথচলা। স্বামীর স্মৃতি বুকে নিয়ে প্রতিদিন সেই দোকানেই বসেন তিনি। চোখের পানি লুকিয়ে হাতে তুলে নেন চায়ের কাপ। কারণ মীরার কাছে বেঁচে থাকার অর্থ কারও করুণায় নয়, নিজের শ্রমে নিজের জীবন চালানো।
কান্না জড়িত কন্ঠে মীরা বেগম বলেন, আমি কারও কাছে হাত পাততে চাই না। যতদিন বেঁচে আছি, কাজ করে খেতে চাই। এই দোকানটাই আমার ভরসা।
ছোট্ট এই চায়ের দোকান তাই মীরার কাছে শুধু জীবিকার স্থান নয় এটি তার হারানো স্বামীর শেষ স্মৃতি এবং নতুন করে বেঁচে থাকার একমাত্র আশ্রয়।


