...|...|...

খেলা

সেজদা, নামাজ, রোজা: ইউরোপীয় ফুটবলে মুসলিম পরিচয়ের উত্থান

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, বিকেল ৪:৪৩ | আপডেট: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৭:৩২
Shares
সেজদা, নামাজ, রোজা: ইউরোপীয় ফুটবলে মুসলিম পরিচয়ের উত্থান

ছবি : সংগৃহীত

কয়েক দশক ধরে ইউরোপের রাজনীতিতে ইসলাম একটি প্রধান স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে এক নতুন প্রজন্মের ফুটবলাররা প্রমাণ করে দিচ্ছেন যে, ইসলাম ধর্ম এখন এই মহাদেশের সামগ্রিক কাঠামোরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বিশ্বজুড়ে বর্তমানে প্রায় ২০০ কোটি মুসলিম রয়েছেন, যা বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। ফলে, ১৩টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপে ইসলামের প্রকাশ্য ধর্মীয় অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ কোনও বিস্ময়ের বিষয় নয়। তা সত্ত্বেও, ইসলাম ধর্মের সবচেয়ে আলোচিত প্রদর্শনগুলোর কয়েকটি এসেছে খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের প্রতিনিধিত্ব করা খেলোয়াড়দের কাছ থেকে।

স্পেন ও বার্সেলোনার আক্রমণভাগের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণ বিস্ময় বালক লামিন ইয়ামাল সৌদি আরবের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোল করার পর ‘সেজদা’ দিয়ে সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হন। এর আগে গত মার্চে ইয়ামালের নিজ শহর বার্সেলোনায় স্পেন ও মিসরের মধ্যকার একটি প্রীতি ম্যাচের সময় তার ধর্মবিশ্বাস লাইমলাইটে আসে। 

তখন গ্যালারির একাংশ থেকে চ্যান্ট বা স্লোগান দেওয়া হয়, ‘যে লাফায় না সে মুসলিম’। জবাবে ইয়ামাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমি একজন মুসলিম... ফুটবল মানুষকে বিনোদন ও অনুপ্রাণিত করার জন্য, কারও বিশ্বাসের প্রতি অসম্মান দেখানোর জন্য নয়।’

২০২৪ সালে জার্মানির সেন্ট্রাল ব্যাক আন্তোনিও রুডিগার রমজান মাসের শুরুতে ইনস্টাগ্রামে একটি ছবি পোস্ট করেন, যেখানে তিনি এক আঙুল উঁচিয়ে তৌহিদের (একত্ববাদ) প্রতীকী প্রদর্শন করেছিলেন। ধর্মীয় বিশ্বাসের এই সাধারণ প্রকাশকে বিল্ড জাইতুং পত্রিকার প্রধান সম্পাদক জুলিয়ান রাইশেল্ট দাবি করেন যে, এটি তথাকথিত ইসলামিক স্টেট (আইএস) গোষ্ঠীর সমর্থনের প্রতীক। পরবর্তীতে রুডিগার রাইশেল্টের বিরুদ্ধে মানহানি ও বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগে মামলা করলেও প্রসিকিউটর বা সরকারি আইনজীবী পরে সেই আইনি প্রক্রিয়া বাদ দেন।

সৌদি আরবের বিপক্ষে ইয়ামালের গোলের ঠিক কয়েক দিন আগে আরেক ইউরোপীয় খেলোয়াড়ও সেজদা দিয়ে গোল উদযাপন করেছিলেন। তিউনিসিয়ার বিপক্ষে সুইডেনের হয়ে ইয়াসিন আইয়ারি যখন প্রথম গোলটি করেন, তখন অনেকের মনোযোগ ছিল তার তিউনিসীয় বংশোদ্ভূত হওয়ার দিকে এবং তিউনিসিয়া ফুটবল ফেডারেশন যে এর আগে তাকে তাদের দেশের হয়ে খেলার জন্য রাজি করানোর চেষ্টা করেছিল, সেই তথ্যের ওপর। 

বাবার মাতৃভূমির প্রতি সম্মান জানিয়ে আইয়ারি ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে হাত তুলেছিলেন। তবে এই খেলোয়াড় ও সুইডিশ দলের সাফল্য একটি চিরচেনা বিতর্ককে নতুন করে উসকে দেয়। সুইডিশ ডেমোক্র্যাটস দলের নেতা জিম্মি আকেসনসহ অনেকেই আইয়ারিকে সুইডিশ হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো তার এই ধর্মীয় প্রকাশ এবং শান্ত উদযাপনের সমালোচনায় ভরে ওঠে।

আইয়ারি, ইয়ামাল বা রুডিগাররা তাদের অভিবাসী পরিবারের কাছ থেকে এই ধর্মবিশ্বাস পেলেও, ইউরোপের অনেক ফুটবলার আবার ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন নেদারল্যান্ডসের মিডফিল্ডার ও চারবারের উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ বিজয়ী ক্লারেন্স সিডর্ফ, ফ্রান্সে জন্মগ্রহণকারী মালির স্ট্রাইকার ফ্রেডেরিক কানুতে এবং ২০১৮ সালের বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্সের মিডফিল্ডার পল পগবা।

আরেক ধর্মান্তরিত খেলোয়াড় ডেড স্পেন্স এই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের লেফট ব্যাক হিসেবে খেলছেন। গত বছর সার্বিয়ার বিরুদ্ধে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অভিষেকের মাধ্যমে তিনি ইংল্যান্ডের প্রতিনিধিত্বকারী প্রথম মুসলিম খেলোয়াড় হিসেবে ইতিহাস গড়েন। ৫-০ ব্যবধানের সেই জয়ের পর স্পেন্স বলেন, ‘আমি অবাক হয়েছিলাম কারণ আমি জানতাম না যে আমিই প্রথম। এটি একটি আশীর্বাদ। ইতিহাস গড়তে পারা এবং বিশ্বজুড়ে তরুণদের অনুপ্রাণিত করতে পারাটা দারুণ ব্যাপার।’

ইউরোপের এই পরিবেশ কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ স্কোয়াডের তিন সদস্যকেও ইসলামের পথ দেখিয়েছে। স্পেন, উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে দুর্দান্ত পারফর্ম করে টুর্নামেন্টের অন্যতম চমক হওয়া এই ছোট দ্বীপরাষ্ট্রটি মূলত রোমান ক্যাথলিক সংখ্যাগরিষ্ঠ। তবে ইতিহাস গড়া এই দলটির প্রায় অর্ধেক খেলোয়াড়ই কেপ ভার্দের বাইরে জন্মগ্রহণকারী প্রবাসী। ৩২ বছর বয়সী জামিরো মন্তেইরো ২০১৬ সালে প্রথম কেপ ভার্দের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং এর পাঁচ বছর পর নিজের জন্মশহর রটারডামে ইসলাম গ্রহণ করেন। ফ্রান্সে জন্মগ্রহণকারী তার সতীর্থ লোগান কস্তা এবং স্টিভেন মোরেইরাও তাদের পেশাদার ক্যারিয়ার চলাকালীন ইসলামে দীক্ষিত হন।

নিজের আধ্যাত্মিক যাত্রার বর্ণনা দিয়ে ২৫ বছর বয়সী ডিফেন্ডার কস্তা বলেন, ছোটবেলা থেকেই ধর্মের প্রতি আমার আগ্রহ ছিল এবং ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা করেছি। পরে আমি একজন মুসলিম খেলোয়াড়ের সঙ্গে থাকতাম এবং সে আমাকে তার সঙ্গে নামাজ পড়ার উৎসাহ দেয়। তখনই আমি ভেতরে কিছু একটা অনুভব করি। তিনি ২০২০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন।

২০২৪ সালের এমএলএস বর্ষসেরা ডিফেন্ডার নির্বাচিত হওয়া ৩১ বছর বয়সী মোরেইরাও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, আমি রেনের একটি অ্যাকাডেমিতে ছিলাম এবং আমার এক বন্ধুর সঙ্গে রুমে থাকতাম। আমরা একটা ভুল করায় আমাদের আলাদা করে দেওয়া হয় এবং আমাকে একজন সিনিয়র খেলোয়াড়ের সঙ্গে রাখা হয়। সেই সিনিয়র খেলোয়াড়টি ছিলেন এভারটনের সাবেক মিডফিল্ডার আব্দুল্লা দুকুরে, যিনি একজন অনুশীলনকারী মুসলিম ছিলেন। তাকে দিনে পাঁচবার নামাজ পড়তে এবং রমজানে রোজা রাখতে দেখে মোরেইরার মনে কৌতূহল জাগে। এরপর তিনি নানা প্রশ্ন করতে শুরু করেন এবং একপর্যায়ে ইসলাম লালন করা শুরু করেন।

এই ত্রয়ী ২০২৩ সালের আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে জামিরো মন্তেইরোর প্রথম গোলের পর একসঙ্গে সেজদা দিয়ে উদযাপন করেছিলেন। এই বছর আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়া এবং গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে যাওয়া কেপ ভার্দে জাতীয় দলে তাদের এই বন্ধন এক বড় শক্তির উৎস। কস্তা এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা মুসলিম হই বা খ্রিস্টান, আমাদের শক্তি হলো আমরা সবাই একসঙ্গে এবং আমরা সবাই কেপ ভার্দিয়ান।’