...|...|...

সারাদেশ

সিজারের পর পেটে গজ রেখেই সেলাই, রোগীর মৃত্যু

ফরিদপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ১১:১৫
Shares
সিজারের পর পেটে গজ রেখেই সেলাই, রোগীর মৃত্যু

ফরিদপুরে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর এক রোগীর পেটের ভেতরে সার্জিক্যাল গজ রেখে সেলাই দেওয়ার অভিযোগ এবং পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কনিকা মণ্ডল নামে ওই নারীর মৃত্যুর ঘটনায় শহরের সমরিতা জেনারেল হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের (ওটি) কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনার পর ফরিদপুরের সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে হাসপাতালটির ওটি কার্যক্রম বন্ধ করা হয়। পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন স্বাস্থ্য বিভাগে জমা দেওয়ার পর এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ফরিদপুরের সিভিল সার্জন।

ঘটনার সূত্রপাত গত ২৯ জুন। প্রসবব্যথা শুরু হলে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বাঘুটিয়া গ্রামের অশান্ত মণ্ডলের স্ত্রী কনিকা মণ্ডলকে ফরিদপুর শহরের নিলটুলী মুজিব সড়ক এলাকার সমরিতা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় হাসপাতালের কনসালটেন্ট ও স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ সার্জন লক্ষ্মী রানী দত্ত তার সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করেন। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়।

পরিবারের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের পর থেকেই কনিকা মণ্ডলের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। একপর্যায়ে তার পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায় এবং শারীরিক নানা জটিলতা দেখা দেয়।

অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় গত ১৯ আগস্ট দিবাগত রাত সোয়া ২টার দিকে তাকে ঢাকার কল্যাণপুরের ইবনে সিনা হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরিবারের দাবি, সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা তার পেটের ভেতরে সার্জিক্যাল গজ কাপড় থাকার বিষয়টি শনাক্ত করেন। পরে অস্ত্রোপচার করে পেট থেকে গজ বের করা হয়।

দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৯ আগস্ট রাতেই কনিকা মণ্ডলের মৃত্যু হয়।

তবে কনিকা মণ্ডলের ভুল চিকিৎসার ঘটনায় চিকিৎসক লক্ষ্মী রানী দত্ত বিষয়টি স্বীকার করে কনিকা মণ্ডলের স্বামী অশান্ত মণ্ডলের হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় তার ভুল চিকিৎসার বিষয়ে ক্ষমা চেয়েছিলেন।

এ ঘটনায় বিষয়টি জানাজানি হলে স্বাস্থ্য বিভাগ তদন্তের উদ্যোগ নেয়। পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। কমিটি দীর্ঘ তদন্ত শেষে তাদের প্রতিবেদন স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে জমা দেয়।

তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনায় সমরিতা জেনারেল হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

তবে তদন্ত প্রতিবেদনে ঠিক কী কী অনিয়ম বা ত্রুটি চিহ্নিত করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

কনিকা মণ্ডলের মৃত্যুর পরদিন সকালে তার বাড়িতে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। এ সময় তিনি ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্তের আশ্বাস দেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

এদিকে, ওটির কার্যক্রম বন্ধের ঘটনায় হাসপাতালটির চিকিৎসা কার্যক্রম ও অস্ত্রোপচার ব্যবস্থাপনা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে অস্ত্রোপচারের পর রোগীর পেটের ভেতরে গজ কীভাবে রয়ে গেল, অস্ত্রোপচার শেষে প্রয়োজনীয় গণনা ও যাচাই যথাযথভাবে করা হয়েছিল কি না এবং পরবর্তী সময়ে রোগীর শারীরিক অবনতির কারণ যথাসময়ে শনাক্ত করা হয়েছিল কি না-এসব বিষয় এখন তদন্তের আওতায় এসেছে।

ফরিদপুরের সিভিল সার্জন মাহমুদুল হাসান বলেন, কনিকা মণ্ডলের মৃত্যুর ঘটনায় সমরিতা হাসপাতালের বিষয়ে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। দীর্ঘ তদন্ত শেষে কমিটি তাদের প্রতিবেদন স্বাস্থ্য বিভাগে জমা দেয়। স্বাস্থ্য বিভাগের তদন্ত প্রতিবেদনের নির্দেশনা অনুযায়ী মঙ্গলবার বিকেলে সমরিতা হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ সতর্ক রয়েছে। কোনো হাসপাতালের বিরুদ্ধে এ ধরনের অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একজন প্রসূতির সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর পেটের ভেতরে গজ থাকার অভিযোগ এবং পরবর্তীতে তার মৃত্যুর ঘটনায় সমরিতা হাসপাতালের ওটি বন্ধের এই সিদ্ধান্তে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর অস্ত্রোপচার ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসা-নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।