রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবার মান, চিকিৎসক ও কর্মচারীদের কর্মস্থলে উপস্থিতি, ওষুধ সরবরাহ, রোগীবাহী গাড়ির ব্যবহার এবং হাসপাতালের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ উত্তোলন, রোগীদের খাবার সরবরাহে অনিয়ম, জেনারেটর ব্যবহার না করা এবং প্রয়োজনের সময় রোগীবাহী গাড়ির চালককে না পাওয়ার অভিযোগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও রোগীদের স্বজনেরা।
অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় কয়েকজন কর্মচারীর প্রভাব এবং দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের সুযোগকে কেন্দ্র করে নানা অনিয়মের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। এমনকি হাসপাতালের কিছু আর্থিক কার্যক্রম ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো, হাসপাতালের বিভিন্ন খাতে নামে-বেনামে বিল তৈরি এবং আপ্যায়ন ও অন্যান্য ব্যয়ের ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নওশাদ খান সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের কথা স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে। তিনি এটিকে নিয়মবহির্ভূত বলেও উল্লেখ করেন।
তবে এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট বিল-ভাউচার, ক্রয়সংক্রান্ত নথি, সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ উত্তোলনের হিসাব, উপস্থিতি রেজিস্টার এবং অন্যান্য প্রশাসনিক নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
১০ শয্যা থেকে ৫০ শয্যা, তবু সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন
রাজস্থলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি উপজেলার সাধারণ মানুষের সরকারি চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান ভরসা। প্রায় ৪০ হাজার মানুষের স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন মেটাতে এ প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু হাসপাতালটির শয্যাসংখ্যা ১০ থেকে ৫০-এ উন্নীত হওয়ার পরও চিকিৎসাসেবার মান, জনবল ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে অনেক সময় প্রত্যাশিত সেবা পাওয়া যায় না। চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্ট কর্মীদের খুঁজে পেতে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। প্রয়োজনীয় ওষুধ সব সময় পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনেক রোগীকে বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে।
বিশেষ করে জরুরি রোগীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। কোনো রোগীর উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কিংবা চন্দ্রঘোনা খ্রিষ্টিয়ান হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর প্রয়োজন হলে দ্রুত পরিবহন নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু রোগীবাহী গাড়ির চালককে সময়মতো পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক, কর্মচারী, ওষুধ, রোগীবাহী গাড়ি এবং জরুরি সেবার ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও রোগীদের কেন বারবার ভোগান্তিতে পড়তে হবে?
সরেজমিন পরিদর্শনে উঠে আসে নানা অভিযোগ
গত ১৪ অক্টোবর সকাল ১০টার দিকে হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবা ও ব্যবস্থাপনা পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শনে যান সাংবাদিকেরা। এ সময় রোগী ও তাদের স্বজনদের সাথে কথা বলে বিভিন্ন অভিযোগের কথা জানা যায়।
পরিদর্শনকালে হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মচারীদের উপস্থিতি, রোগীবাহী গাড়ির দায়িত্ব পালন, ওষুধ সরবরাহ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। হাসপাতালের কয়েকটি খাতে ব্যয় ও বিল-ভাউচার তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কেও অভিযোগ পাওয়া যায়।
সাংবাদিকদের কাছে স্থানীয় কয়েকজন অভিযোগ করেন, হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করা কিছু কর্মচারীর প্রভাব রয়েছে। তাদের দাবি, হাসপাতালের প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রমের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এসব কর্মচারীর ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মচারী, যিনি স্থানীয়ভাবে ‘বড় বাবু’ নামে পরিচিত, এবং ক্যাশিয়ারকে ঘিরে আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। তাদের দাবি, হাসপাতালের কিছু কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পরিবর্তে ওই কর্মচারীদের প্রভাব বেশি বলে মনে হয়।
তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের বক্তব্য এবং তাদের দায়িত্বের পরিধি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া প্রয়োজন। তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রশাসনিক নথি, আর্থিক হিসাব ও দায়িত্ব বণ্টনের তথ্য যাচাই জরুরি।
ভুয়া বিল-ভাউচারে সরকারি অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ
হাসপাতালের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ উত্তোলনের বিষয়টি।
অভিযোগ রয়েছে, নামে-বেনামে টেন্ডার, আপ্যায়নসহ বিভিন্ন খাতের বিল তৈরি করে সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। এসব বিলের বিপরীতে প্রকৃতপক্ষে কাজ সম্পন্ন হয়েছে কি না, পণ্য বা সেবা সরবরাহ করা হয়েছে কি না এবং ব্যয়ের যথাযথ প্রমাণ রয়েছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নওশাদ খানের বক্তব্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে তিনি ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের কথা স্বীকার করেন এবং এ ধরনের কার্যক্রমকে নিয়মবহির্ভূত বলে উল্লেখ করেন বলে জানা গেছে।
তবে কোন খাতে কত টাকা উত্তোলন করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিলগুলো কারা প্রস্তুত করেছেন, কার অনুমোদনে অর্থ ছাড় হয়েছে এবং অর্থ উত্তোলনের সাথে কারা জড়িত এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো যাচাই করা প্রয়োজন।
সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি নিরীক্ষা করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
রোগীদের খাবার সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগ
সরকারি হাসপাতালের রোগীদের জন্য বরাদ্দ করা খাবারের মান ও সরবরাহব্যবস্থা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, হাসপাতালের রোগীদের খাবার সরবরাহের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারের মাধ্যমে যথাযথভাবে খাবার প্রস্তুত ও বিতরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের অভিযোগ, খাবার প্রস্তুত ও সরবরাহের দায়িত্ব অন্যের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হচ্ছে। এতে খাবারের মান, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ এবং সরবরাহের স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পর থেকে খাবার সরবরাহের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারদের কার্যক্রম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। প্রকৃত ঠিকাদার কে, কীভাবে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, চুক্তির শর্ত কী এবং খাবার সরবরাহের মান নিয়মিত তদারকি করা হয় কি না এসব বিষয় প্রকাশ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
তবে খাবার সরবরাহের চুক্তি, ঠিকাদার নিয়োগের নথি, খাবারের বিল, সরবরাহের রেজিস্টার এবং সংশ্লিষ্ট পরিদর্শন প্রতিবেদন যাচাই না করে অনিয়মের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
রোগীদের জন্য বরাদ্দ করা খাবার নিরাপদ, পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে পরিবেশন করা নিশ্চিত করা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম প্রমাণিত হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন
হাসপাতালের চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিতি নিয়েও অভিযোগ করেছেন রোগী ও তাদের স্বজনেরা।
তাদের দাবি, চিকিৎসককে প্রয়োজনের সময় না পাওয়ায় অনেক রোগীকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। বিশেষ করে ডেন্টাল বিভাগের চিকিৎসকের উপস্থিতি নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্য, রোগীরা হাসপাতালে গিয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে না পেলে কখনো কখনো ফোনে পরামর্শ নিতে কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ব্যবস্থাপত্র সংগ্রহ করতে বলা হয়।
এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের দায়িত্বসূচি, কর্মঘণ্টা, উপস্থিতি রেজিস্টার এবং রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
সাংবাদিকদের সরেজমিন পরিদর্শনের সময় হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পর্যায়ে কয়েকজন চিকিৎসককে হাসপাতালে প্রবেশ করতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন উপস্থিত সাংবাদিকেরা। তবে এ পর্যবেক্ষণ থেকে তাদের নিয়মিত অনুপস্থিতির বিষয়টি নিশ্চিত করা যায় না। এ জন্য নির্ধারিত কর্মঘণ্টা ও উপস্থিতির নথি যাচাই করা জরুরি।
রোগীদের প্রত্যাশা, সরকারি কর্মঘণ্টা অনুযায়ী চিকিৎসকেরা কর্মস্থলে উপস্থিত থাকবেন এবং জরুরি প্রয়োজনে রোগীরা যথাসময়ে চিকিৎসাসেবা পাবেন।
হাসপাতালের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধেও অনিয়মিত উপস্থিতির অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন হাসপাতালে উপস্থিত থাকেন এবং কোনো কোনো দিন সকাল ১১টার দিকে কর্মস্থল ত্যাগ করেন। এ ছাড়া চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার রাজার হাট এলাকায় তার একটি মেডিকেল টেকনোলজিস্ট সেন্টার রয়েছে এবং সেখানে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার কারণে সরকারি দায়িত্ব পালনে ব্যাঘাত ঘটছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তার উপস্থিতি রেজিস্টার, ছুটির আবেদন, দায়িত্বসূচি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য যাচাই প্রয়োজন।
এ বিষয়ে জসিম উদ্দিন বলেন, আমি মৌখিকভাবে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে থাকি। আমি নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত থাকি।
অন্যদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নওশাদ খান জানিয়েছেন, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট জসিম উদ্দিনকে কয়েকবার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জসিম উদ্দিন নোটিশের সুনির্দিষ্ট জবাব দিতে পারেননি।
তবে নোটিশগুলোর তারিখ, অভিযোগের ধরন, জবাবের কপি এবং পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা প্রয়োজন। সরকারি কর্মচারীর উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা বিধি অনুযায়ী তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটর ব্যবহার না করার অভিযোগ
হাসপাতালে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে রোগীদের ভোগান্তির অভিযোগও পাওয়া গেছে। রোগীদের কয়েকজন জানান, বিদ্যুৎ চলে গেলে কখনো কখনো মোমবাতির ওপর নির্ভর করতে হয়। তাদের দাবি, হাসপাতালে জেনারেটর থাকার পরও সেটি নিয়মিত ব্যবহার করা হয় না।
এ অভিযোগ সত্য হলে তা হাসপাতালের জরুরি সেবা, রাতের চিকিৎসা, প্রসূতি বিভাগ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের জন্য উদ্বেগজনক হতে পারে।
হাসপাতালের জেনারেটর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকারি বরাদ্দ রয়েছে কি না, থাকলে বছরে কত টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়, কী পরিমাণ জ্বালানি কেনা হয় এবং জেনারেটর কত ঘণ্টা চালানো হয়েছে এসব তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
জেনারেটরের লগবুক, জ্বালানি ক্রয়ের বিল, রক্ষণাবেক্ষণের নথি এবং সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যয়ের হিসাব পরীক্ষা করলে অভিযোগের প্রকৃত অবস্থা জানা সম্ভব হবে।
বিদ্যুৎ চলে গেলে হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলো সচল রাখা এবং রোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তাই জেনারেটর সচল রাখা ও এর ব্যবহার নিয়মিত তদারকির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
কাপড় ধোলাইয়ের বরাদ্দ নিয়েও প্রশ্ন
হাসপাতালের রোগী, বিশেষ করে প্রসূতি বিভাগের ব্যবহৃত কাপড় ধোলাই ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে বরাদ্দ করা অর্থের ব্যবহার নিয়েও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এ খাতে বরাদ্দ করা অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। হাসপাতালের ব্যবহৃত কাপড় নিয়মিত পরিষ্কার করা, জীবাণুমুক্ত রাখা এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখা রোগীদের নিরাপত্তার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।
তবে কাপড় ধোলাইয়ের জন্য বরাদ্দের পরিমাণ, প্রকৃত ব্যয়, সেবা প্রদানকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় এবং কাজ সম্পন্ন হওয়ার প্রমাণ সম্পর্কে নথিপত্র যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাই এ অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট বিল-ভাউচার, কাজের রেকর্ড ও পরিদর্শন প্রতিবেদন পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতার কাজে বরাদ্দ করা অর্থের ব্যবহার স্বচ্ছ হওয়া এবং বাস্তবে নির্ধারিত সেবা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
রোগীবাহী গাড়ির চালককে ঘিরে ক্ষোভ
রাজস্থলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রোগীবাহী গাড়ির চালকের দায়িত্ব পালন নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চালক নিয়মিত মদ্যপান করে কর্মস্থলে আসেন। জরুরি রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর প্রয়োজন হলে অনেক সময় তাকে পাওয়া যায় না। এতে রোগী পরিবহনে সংকট তৈরি হয় এবং রোগীর স্বজনদের উদ্বেগ বাড়ে।
তবে মদ্যপ অবস্থায় দায়িত্ব পালনের অভিযোগটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে চালকের বক্তব্য, দায়িত্বকালীন উপস্থিতির নথি, গাড়ি ব্যবহারের লগবুক এবং প্রয়োজন হলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রমাণ সংগ্রহ করা জরুরি।
স্থানীয়দের দাবি, জরুরি রোগী পরিবহনে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হোক। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রয়োজনে দায়িত্বশীল চালক নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা হোক।
তাদের মতে, রোগীবাহী গাড়ি কোনো সাধারণ পরিবহন নয়; এটি জরুরি স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দুর্ঘটনা, গুরুতর অসুস্থতা কিংবা প্রসূতি রোগীর ক্ষেত্রে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া বা উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে স্থানান্তর করা অনেক সময় জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে, তদারকি নিয়ে প্রশ্ন
হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন বলে স্থানীয়দের দাবি। তাদের কেউ কেউ ২৫ থেকে ৩০ বছর ধরে একই প্রতিষ্ঠানে রয়েছেন বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।
তাদের প্রশ্ন, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করলে প্রশাসনিক তদারকি, দায়িত্ব বণ্টন ও আর্থিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
তবে একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন চাকরি করাই অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ নয়। সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের চাকরির ইতিহাস, পদায়ন, বদলির বিধান এবং দায়িত্ব পালনের রেকর্ড যাচাই করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয়দের দাবি, হাসপাতালের প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রমে কার কী দায়িত্ব, কোন কর্মকর্তা কোন খাতের বিল অনুমোদন করেন এবং অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে কী ধরনের যাচাই-বাছাই করা হয় তা পরিষ্কার করা হোক।
বিশেষ করে ভুয়া বিল-ভাউচারের অভিযোগ সামনে আসার পর হাসপাতালের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
কর্মকর্তার বক্তব্যে সন্তুষ্ট নন অভিযোগকারীরা
হাসপাতালের বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নওশাদ খানের কাছে জানতে চান সাংবাদিকেরা।
মেডিকেল টেকনোলজিস্ট জসিম উদ্দিনের অনিয়মিত উপস্থিতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, তাকে কয়েকবার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে পরবর্তী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানতে চাইলে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন সাংবাদিকেরা।
অন্যদিকে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের বিষয়টি নিয়ে তার বক্তব্য বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি এ ধরনের অর্থ উত্তোলনকে নিয়মবহির্ভূত বলে স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে।
তবে হাসপাতালের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, রোগীদের খাবার সরবরাহ, জেনারেটর পরিচালনা, কাপড় ধোলাইয়ের বরাদ্দ এবং রোগীবাহী গাড়ির চালকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর প্রতিটির বিষয়ে তার বিস্তারিত বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।
একটি সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত করে দেখা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য গ্রহণের পাশাপাশি নথিপত্রের ভিত্তিতে প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করাই হওয়া উচিত পরবর্তী পদক্ষেপ।
প্রায় ৪০ হাজার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হবে কবে?
রাজস্থলী উপজেলার সাধারণ মানুষের জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। প্রত্যন্ত এলাকার অনেক রোগীর পক্ষে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া কিংবা দূরের শহরে যাতায়াত করা ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য।
এ অবস্থায় সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট ও অন্যান্য কর্মচারীদের নিয়মিত উপস্থিতি, প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ, সচল রোগীবাহী গাড়ি, মানসম্মত খাবার এবং স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
কিন্তু এসব বিষয়ে একের পর এক অভিযোগ ওঠায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, অভিযোগগুলো শুধু বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নথিপত্রের ভিত্তিতে তদন্ত করা হোক।
বিশেষ করে ভুয়া বিল-ভাউচারের অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সরকারি অর্থের হিসাব পরীক্ষা, চিকিৎসক ও কর্মচারীদের উপস্থিতি পর্যালোচনা, রোগীবাহী গাড়ির কার্যক্রম তদন্ত এবং রোগীদের খাবার সরবরাহের মান যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি এলাকাবাসীর
রাজস্থলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসাসেবা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তাদের মতে, স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উচিত হাসপাতালের আর্থিক নথি, বিল-ভাউচার, টেন্ডার ও ঠিকাদার নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র, জেনারেটর পরিচালনার হিসাব, রোগীদের খাবার সরবরাহের রেকর্ড এবং চিকিৎসক-কর্মচারীদের উপস্থিতি রেজিস্টার যাচাই করা।
পাশাপাশি রোগীবাহী গাড়ির চালকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তদন্তে কোনো অনিয়ম বা সরকারি অর্থের অপব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, রাজস্থলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবা নিয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে, সরকারি বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং হাসপাতালের প্রতিটি বিভাগে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হবে।
জনগণের করের টাকায় পরিচালিত সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবা পাওয়া মানুষের অধিকার। তাই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি নিশ্চিত করে রাজস্থলীর সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এমনটাই প্রত্যাশা এলাকাবাসীর।


