জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত নেতার বিরুদ্ধে আনা চারটি করে অভিযোগই প্রমাণিত হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে আসামিদের কাউকে একাধিক কাউন্টে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য কাউন্টে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।
সাত আসামিই পলাতক থাকায় তাদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগ করেছিল ট্রাইব্যুনাল।
রায়ের পর সংবাদ সম্মেলনে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানান, প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো আদালতে প্রমাণিত হয়েছে। তবে অভিযোগের ধরন ও কাউন্ট অনুযায়ী সাজা ভিন্ন হয়েছে।
কে কোন অভিযোগে কী সাজা পেলেন
চিফ প্রসিকিউটরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মামলার প্রধান আসামি ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে চারটি অভিযোগের মধ্যে তিনটিতে মৃত্যুদণ্ড এবং একটিতে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম একটি অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েছেন। একটি অভিযোগে তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং অপর দুই অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মোহাম্মদ আলী আরাফাত একটি অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েছেন। বাকি তিনটির মধ্যে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড এবং একটিতে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
শেখ ফজলে শামস পরশও একটি অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েছেন। একটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং অন্য দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মাইনুল হোসেন খান নিখিলের একটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং বাকি তিনটিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে একটি ও দুই নম্বর অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং তিন ও চার নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের ক্ষেত্রেও প্রথম দুই অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং তৃতীয় ও চতুর্থ অভিযোগ একসাথে বিবেচনা করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এখানে ‘কাউন্ট’ বলতে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা পৃথক অভিযোগকে বোঝানো হয়েছে।
ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ

প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমনে ষড়যন্ত্র, উসকানি, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ, অপহরণ ও হত্যাসহ বিভিন্ন মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে ওবায়দুল কাদেরের ভূমিকা ছিল।
মামলার শুনানিতে তার বিভিন্ন ফোনালাপ আদালতে উপস্থাপন করা হয়। প্রসিকিউশনের দাবি, এসব কথোপকথনে আন্দোলন দমনে দলীয় নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দেওয়ার বিষয় উঠে এসেছে।
২০২৪ সালের ১১ জুলাই ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের সাথে ফোনালাপের প্রসঙ্গও মামলায় তুলে ধরা হয়। ওই কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে প্রসিকিউশনের অভিযোগ।
এর কয়েক দিন পর ১৪ জুলাই গণভবনে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ওবায়দুল কাদের। ওই সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের নিয়ে শেখ হাসিনার বিতর্কিত বক্তব্যের মাধ্যমে উসকানি দেওয়া হয়েছিল এবং সেখানে উপস্থিত থেকে কাদের তাতে সমর্থন করেছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
পরদিন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলন দমনের অংশ হিসেবে ইন্টারনেটের গতি কমানো এবং বিভিন্ন এলাকায় দলীয় নেতা-কর্মীদের সক্রিয় করার বিষয়েও তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন।
১৬ জুলাই চট্টগ্রামের তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের সঙ্গে ফোনে কথা বলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও নগরের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়। এর পর চট্টগ্রামের মুরাদপুরে আন্দোলনকারীদের হত্যার ঘটনা ঘটে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সময়ে রংপুরে আবু সাঈদসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের মৃত্যুর ঘটনাও মামলার অভিযোগে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ১৭ জুলাই দলীয় নেতাদের নিজ নিজ এলাকায় আন্দোলন প্রতিহত করার নির্দেশ এবং পরদিন আন্দোলনকে সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
১৯ জুলাই গণভবনে বৈঠকের পর কারফিউ ও সেনা মোতায়েনের বিষয়ে দেওয়া বক্তব্যেরও উল্লেখ করেছে প্রসিকিউশন। তাদের দাবি, ওই বক্তব্যের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছিল।
হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ
প্রসিকিউশনের অভিযোগে বলা হয়েছে, আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের ব্যবহার করা হয়েছিল।
ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশের পর মিরপুর, ফেনীর মহিপাল, লক্ষ্মীপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গুলিতে বহু আন্দোলনকারী নিহত হন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। ৪ ও ৫ আগস্টের ঘটনাতেও ব্যাপক প্রাণহানির অভিযোগ আনা হয়েছে।
আরাফাতের বিরুদ্ধে অভিযোগ
মোহাম্মদ আলী আরাফাতের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়নে সমর্থন ও উসকানির পাশাপাশি গণমাধ্যমের সম্প্রচার বন্ধের অভিযোগ আনা হয়।
প্রসিকিউশনের দাবি, ১৪ জুলাই গণভবনে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে তিনি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দেওয়া বক্তব্যকে সমর্থন করেন।
এ ছাড়া ১৮ জুলাই কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলের সংবাদ সম্প্রচার সাময়িকভাবে বন্ধ করার ঘটনায় তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী আরাফাতের ভূমিকার কথা মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। ২২ জুলাইও দুটি টেলিভিশন চ্যানেলের সংবাদ সম্প্রচার বন্ধের অভিযোগ আনা হয়।
৪ আগস্ট সংসদ ভবন এলাকায় দেওয়া এক প্রেস ব্রিফিংয়ে আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী হিসেবে অভিহিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানোর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
গণঅভ্যুত্থানে প্রাণহানির অভিযোগ
প্রসিকিউশনের দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সশস্ত্র নেতা-কর্মীদের ব্যবহারের ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত ও আহত হন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই সময় এক হাজার চারশর বেশি ছাত্র-জনতা নিহত এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষ গুরুতর আহত হন। এসব ঘটনায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের নির্দেশনা, উসকানি ও ভূমিকা ছিল কি না-তা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিচার করা হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় ওবায়দুল কাদেরসহ সাত নেতার বিরুদ্ধে আনা চারটি করে অভিযোগের ওপর রায় ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।


