ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে এমন অনেক অভিনেতা আছেন যারা নিজেদের অভিনয় দক্ষতা দিয়ে কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেছেন। কিন্তু অভিনয় জগতের চাকচিক্য পেছনে ফেলে বাস্তব জীবনের কঠিন মাটিতে নেমে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, এমন মানুষের সংখ্যা মেলা ভার। এই বিরল ব্যক্তিত্বদের অন্যতম ছিলেন নানা পাটেকর, যার আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকর। পর্দায় তার অগ্নিঝরা সংলাপ যেমন দর্শকদের শিহরিত করত, তেমনই বাস্তব জীবনে তার সরলতা ও মানবিকতা মানুষকে অনুপ্রাণিত করে।
ভারত সরকারের পদ্মশ্রী পুরস্কার আর্কাইভ, নাআম ফাউন্ডেশন ইন্ডিয়া এবং ভারতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের অফিশিয়াল রেকর্ড বুক সূত্রে জানা গেছে।
১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া নানা পাটেকরের শৈশব কেটেছে চরম আর্থিক অনটনের মধ্য দিয়ে। মুম্বাইয়ের বিখ্যাত স্যার জে. জে. স্কুল অব অ্যাপ্লায়েড আর্ট থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর, থিয়েটারের মাধ্যমে তার অভিনয় জীবনের শুরু হয়। ১৯৭৮ সালে গমন চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রুপালি পর্দায় পা রাখলেও, আশির দশকের শেষের দিকে তিনি চলচ্চিত্র জগতে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিলেন।
নানা পাটেকর বলিউডের একমাত্র অভিনেতা ছিলেন যিনি ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা, শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা এবং শ্রেষ্ঠ খলনায়ক—এই তিনটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতেই পুরস্কার জয়ের এক অনন্য রেকর্ড গড়েছিলেন। ১৯৮৯ সালের পরিন্দা এবং ১৯৯৪ সালের ক্রান্তিবীর চলচ্চিত্রে তার অভিনয় আজও ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে গণ্য করা হয়। শিল্পকলায় তার অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৩ সালে ভারত সরকার তাকে দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মশ্রীতে ভূষিত করে।
খুব কম মানুষই জানেন যে, নানা পাটেকরের হৃদয়ে অভিনয়ের পাশাপাশি দেশের প্রতি ছিল গভীর দেশপ্রেম। তিনি ভারতীয় টেরিটোরিয়াল আর্মির সাথে যুক্ত ছিলেন। ১৯৯৯ সালে যখন কারগিল যুদ্ধ শুরু হয়, তখন তিনি কেবল পর্দার নায়ক হিসেবে ঘরে বসে থাকেননি। তিনি সরাসরি মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের সাথে যুক্ত হয়ে সীমান্তে সেনা সদস্যদের মনোবল বাড়াতে কাজ করেছিলেন। পরে তিনি অনারারি ক্যাপ্টেন পদমর্যাদাও লাভ করেন।
কোটি টাকার মালিক হয়েও নানা পাটেকর মুম্বাইয়ের একটি সাধারণ ফ্ল্যাটে মায়ের সাথে জীবন কাটাতেন। তার এই মাটির কাছাকাছি থাকার মানসিকতাই তাকে সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের অংশীদার করেছে। ২০১৫ সালে যখন মহারাষ্ট্রের কৃষকেরা চরম খরা ও ঋণের দায়ে আত্মহত্যা করছিলেন, তখন তিনি ঘরে বসে থাকতে পারেননি।
অভিনেতা মকরন্দ আনাসপুরের সাথে মিলে তিনি গড়ে তোলেন নাআম ফাউন্ডেশন। এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তিনি আত্মহত্যাকারী শত শত কৃষকের পরিবারকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছেন। খরাপীড়িত গ্রামগুলোতে নদী পুনর্খনন ও জলশোভা প্রকল্পের মাধ্যমে পানির সংকট দূর করেছেন। এ ছাড়া কৃষকদের বিকল্প আয়ের উৎস তৈরিতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। নিজের উপার্জিত অর্থের একটি বিশাল অংশ তিনি এই ফাউন্ডেশনে দান করে দিয়েছেন এবং দেশ-বিদেশ থেকে আসা অনুদানের প্রতিটি অর্থ সরাসরি কৃষকদের কল্যাণে ব্যয় নিশ্চিত করেছেন।
আজকের যুগে যখন সেলিব্রিটি বা তারকারা নিজেদের বিলাসবহুল জীবন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণায় ব্যস্ত, সেখানে নানা পাটেকর ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, একজন প্রকৃত নায়কের কাজ কেবল ক্যামেরার সামনে অভিনয় করা নয়; বরং ক্যামেরার পেছনে সমাজের অন্ধকার দূর করতে ভূমিকা রাখা। নানা পাটেকর শুধু একজন মহান অভিনেতাই নন, তিনি আধুনিক ভারতের এক সত্যিকারের মহাপুরুষ ও মানবতার মূর্ত প্রতীক।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরে গোয়ার নিজ বাড়িতে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।


