নব্বইয়ের দশকের ঢাকাই চলচ্চিত্রের বরপুত্র ও ফ্যাশন আইকন সালমান শাহর প্রয়াণের দীর্ঘ তিন দশক অতিক্রান্ত হতে চলেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, মৃত্যুর এত বছর পরও নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি সমানভাবে জনপ্রিয়, প্রাসঙ্গিক এবং প্রবল কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। যে তরুণ-তরুণীদের জন্মই হয়েছিল এই নায়কের মৃত্যুর পর, তাদের হৃদয়েও সালমান শাহ এক দারুণ ভালোলাগার নাম। ঢাকার মিরপুর কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যম্পাস- সব জায়গায় আজও সমানভাবে উচ্চারিত হয় তার নাম।
১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ঢালিউডে অভিষেক ঘটে চৌধুরী মোহাম্মদ সালমান শাহরিয়ার তথা সবার প্রিয় সালমান শাহর।
প্রথম ছবি দিয়েই তিনি রাতারাতি তারকাখ্যাতি অর্জন করেন। অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত চার বছরের ক্যারিয়ারে তিনি উপহার দিয়েছিলেন ২৭টি চলচ্চিত্র, যার প্রায় প্রতিটিই ছিল সুপারহিট। চলচ্চিত্র বোদ্ধা ও সাধারণ দর্শকদের মতে, সে সময়কার অন্য সব নায়কদের তুলনায় তিনি ছিলেন অনেক আধুনিক ও ব্যতিক্রমী।
তার সাবলীল অভিনয়, মার্জিত বাচনভঙ্গি, চমৎকার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এবং ইউনিক ফ্যাশন সেন্স তাকে সাধারণ নায়কদের চেয়ে বহু ধাপ এগিয়ে রেখেছিল। আজকের জেন-জি বা তরুণ প্রজন্মের কাছেও তিনি একজন আসল ট্রেন্ডসেটার।
চলচ্চিত্র গবেষক ও অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন রাজুর মতে, তরুণদের রোমান্টিক ধারার চলচ্চিত্রের সাথে তার অনবদ্য অভিনয় এমনভাবে মিশে আছে যে আজও তার একনিষ্ঠ ফ্যানডম টিকে রয়েছে, যা বাংলা চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল।
সিলেটের ইমন থেকে ঢালিউডের মুকুটহীন সম্রাট
সিলেটের নানাবাড়িতে ১৯৭১ সালে জন্ম নেওয়া সালমান শাহর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে। তার নানা কামরুজ্জামান ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র 'মুখ ও মুখোশ'-এর অভিনেতা এবং তার মা নীলা চৌধুরীও ছিলেন বিটিভির তালিকাভুক্ত শিল্পী ও গায়িকা। নাটকে ও বিজ্ঞাপনে শখের বশে অভিনয় শুরু করলেও পরিচালক সোহানুর রহমান সোহানের হাত ধরে বড়পর্দায় পা রাখেন তিনি।
বাবা-মায়ের প্রাথমিক অমত সত্ত্বেও 'কেয়ামত থেকে কেয়ামত' ছবিটির আকাশচুম্বী সাফল্য তাকে রাতারাতি টিনএজারদের হৃদয়ে জায়গা করে দেয়। তার অভিনীত চরিত্রগুলোর সাথে দর্শকরা নিজেদের মেলাতে পারত খুব সহজেই।
অমীমাংসিত রহস্য ও মৃত্যুর পরের জীবন
সালমান শাহকে ঘিরে আগ্রহ ও কৌতুহলের আরেকটি বড় কারণ হলো তার আকস্মিক ও মর্মান্তিক প্রয়াণ। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর নিউ ইস্কাটনের বাসা থেকে তার নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। তৎকালীন ময়নাতদন্তে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলা হলেও শুরু থেকেই তা জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করে তার পরিবার।
মা নীলা চৌধুরী ও স্বজনদের দাবি, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এরপর দীর্ঘ তিন দশক ধরে সিআইডি, বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি ও পিবিআই দফায় দফায় তদন্ত করে প্রতিবেদন দিলেও আইনি লড়াই ও রহস্যের জট পুরোপুরি কাটেনি। সম্প্রতি আদালত মামলাটি পুনরায় সিআইডিকে দিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেওয়ায় বিষয়টি নতুন মোড় নিয়েছে।
চলচ্চিত্র পরিচালক ড. মতিন রহমানের মতে, এই রহস্যজনক মৃত্যু সালমান শাহকে এক ভিন্ন মাত্রার অমরত্ব দিয়েছে।
স্মৃতি আঁকড়ে থাকা ভক্ত ও বিচারহীনতার ক্ষোভ
সিলেটের হযরত শাহজালালের মাজারসংলগ্ন কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন এই মহানায়ক। আজও দেশের দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা ছুটে যান তার কবর জিয়ারত করতে। অনেকে প্রিয় তারকার মতো বাঁ হাতে ঘড়ি পরা বা অবচেতনমনে তার মতো নানা অভ্যাস ধরে রেখেছেন।
অন্যদিকে, তার মৃত্যু নিয়ে রহস্যের জট না খোলায় ভক্ত ও পরিবার এখনও ন্যায়বিচারের দাবিতে সোচ্চার। অপরাধীদের বিচার ও মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে তারা দীর্ঘদিন ধরে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
যুগের পর যুগ পেরিয়ে ঢালিউডে অনেক নতুন মুখ এসেছে, অনেক সুপারস্টার জন্ম নিয়েছে, কিন্তু চার বছরের ছোট্ট ক্যারিয়ারে সালমান শাহ মানুষের মনে যে গভীর ও চিরস্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন, তা তাকে আজও অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও অনন্য উচ্চতায় টিকিয়ে রেখেছে।




