মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম দক্ষিণ ক্রোকচর। একসময় বিকালবেলা আড্ডা দেওয়ার জায়গা ছিল, এখন সেই জায়গাই হয়ে উঠেছে চা-পিপাসু মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্র। মাত্র ৫০ হাজার টাকা মূলধন, নিজেদের শ্রম ও উদ্যমকে পুঁজি করে কয়েকজন শিক্ষার্থী গড়ে তুলেছেন ‘চায়ের কুটির’ নামে একটি চায়ের দোকান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর সুবাদে অল্প সময়ের মধ্যেই দোকানটি পরিচিতি পেয়েছে দেশজুড়ে। প্রতিদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে ভিড় করছেন বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা দর্শনার্থী ও ভোজনরসিকেরা।
উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চায়ের দোকানের ভিডিও দেখে অনুপ্রাণিত হয়েই তাঁরা এমন উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করেন। শুরুতে দোকানের স্থাপনা নির্মাণের সময় গ্রামের অনেকের কাছ থেকে হাস্যরসের শিকার হতে হয়েছিল তাঁদের। তবে মানুষের এমন মন্তব্যে দমে যাননি তরুণেরা। নিজেদের পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসকে সম্বল করে চালু করেন ‘চায়ের কুটির’।
দোকান চালুর কয়েকদিনের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এর ভিডিও। এরপর থেকেই বাড়তে থাকে ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের আনাগোনা। বর্তমানে শিবচর ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ আসছেন এই কুটিরের চায়ের স্বাদ নিতে। কেউ আসছেন পরিবার নিয়ে, কেউবা বন্ধুদের সঙ্গে। একদিকে চায়ের স্বাদ, অন্যদিকে গ্রামীণ পরিবেশ—দুইয়ের সমন্বয়ে জায়গাটি হয়ে উঠেছে বিকেলবেলার আড্ডা ও ঘোরাঘুরির নতুন গন্তব্য।
চা খেতে আসা খাদিজা আক্তার বলেন, ‘ফেসবুকে দেখেছি, এখানে একটি চায়ের দোকান হয়েছে। তখনই ভেবেছিলাম একদিন আসব। আজ ছুটির দিন, তাই পরিবারের সঙ্গে ঘুরতে এসেছি। অনেকের মুখে শুনেছি, এখানকার চা বেশ সুস্বাদু। শিবচরে ঘোরাঘুরির জায়গাও তেমন নেই। তাই চা খাওয়ার পাশাপাশি একটু ঘোরাঘুরি করতে চলে এলাম।’
সৌদি আরবপ্রবাসী জুনায়েদ মিয়া বলেন, ‘আমি সৌদি আরবপ্রবাসী। কিছুদিন আগে দেশে এসেছি। কয়েক দিন আগে ইউটিউব, টিকটক ও ফেসবুকে এই ভাইরাল চায়ের দোকানের ভিডিও দেখেছি। তাই পরিবার নিয়ে চলে এলাম। বিকেলের সময়টা পরিবারের সঙ্গে এখানে কাটাতে পেরে খুব ভালো লাগছে। এখানকার চা সত্যিই অনেক সুস্বাদু। একবার খেলে আবার খেতে ইচ্ছে করে।’
আরেক দর্শনার্থী সিয়াম হোসেন বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখানকার ভাইরাল চায়ের বিষয়ে জানতে পেরেছি। তাই বন্ধুদের নিয়ে চা খেতে এসেছি। চায়ের পাশাপাশি এখানকার পরিবেশটাও বেশ সুন্দর। সব মিলিয়ে সময়টা ভালো কাটছে।’
চায়ের কুটিরের উদ্যোক্তা সবুজ মিয়া বলেন, ‘এখানে চায়ের দোকান শুরু করেছি মাত্র এক মাস হলো। প্রথম দিকে কিছুটা নার্ভাস ছিলাম। তবে আলহামদুলিল্লাহ, এখন সবকিছু ভালোভাবেই চলছে। ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ এখানে চা খেতে আসছেন। আমাদের জন্য সবাই দোয়া করবেন, যেন চায়ের দোকানের পাশাপাশি আশপাশের এলাকার উন্নয়নেও ভূমিকা রাখতে পারি।’
দোকানটির আরেক উদ্যোক্তা দ্বীন ইসলাম বলেন, ‘টিকটকে কুমিল্লার একটি মালাই চায়ের ভিডিও দেখে আমাদেরও এমন একটি দোকান দেওয়ার চিন্তা মাথায় আসে। পরে নিজেদের উদ্যোগে মাত্র ৫০ হাজার টাকা মূলধন নিয়ে চায়ের কুটির গড়ে তুলি। এখানে মালাই চা, পোড়া রুটি, দুধ চা ও কফি পাওয়া যায়। প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কেজি দুধ দিয়ে চা তৈরি করা হয়। পাশাপাশি ২০ থেকে ২৫ কেজি রুটি বিক্রি হয়। সব মিলিয়ে প্রতিদিন আমাদের আয় প্রায় ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা। এক মাসের মধ্যেই এমন সাড়া পাব, তা ভাবিনি। সব মিলিয়ে আমরা বেশ ভালো আছি।’
পড়াশোনার পাশাপাশি কয়েকজন তরুণের এমন উদ্যোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও প্রশংসা কুড়াচ্ছে। অল্প পুঁজি ও নিজেদের শ্রম কাজে লাগিয়ে তারা শুধু একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই গড়ে তোলেননি, বরং প্রত্যন্ত গ্রামের একটি জায়গাকে মানুষের মিলনমেলা ও বিনোদনের কেন্দ্রে পরিণত করেছেন। তাঁদের এই উদ্যোগ স্থানীয় তরুণদের মধ্যেও স্বাবলম্বী হওয়ার নতুন অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।


