নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার ৪ নম্বর বাহাগিলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সুজাউদ্দৌলা লিপ্টনের বিরুদ্ধে ভিজিএফের চাল বিতরণে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও আত্মসাতের অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে সরকারি তদন্ত কমিটি।
তদন্ত প্রতিবেদনে মৃত ও ভুয়া ব্যক্তির নামে চাল উত্তোলন, একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে কার্ড দেওয়া, প্রকৃত দরিদ্রদের বঞ্চিত করা এবং পরিষদের সদস্যদের সাথে আলোচনা না করে এককভাবে উপকারভোগীদের তালিকা তৈরির মতো বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে এসব অনিয়মের তথ্য উঠে আসার পরও চূড়ান্ত ব্যবস্থা না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত ইউনিয়ন পরিষদের আর্থিক কার্যক্রমে চেয়ারম্যানের একক ক্ষমতা সাময়িকভাবে স্থগিত বা সীমিত রাখার দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাহাগিলী ইউনিয়নে মানবিক সহায়তার ভিজিএফের চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কিশোরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নির্দেশে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি সরেজমিনে তদন্ত করে অভিযোগের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দাখিল করে।
তদন্ত কমিটির দাখিল করা প্রতিবেদনের স্মারক নম্বর ৪৭.৫২.৭০৪৫.০২৮.০২.০০১.২৫-২৫৬, তারিখ ২ আগস্ট ২০২৬।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউপি চেয়ারম্যান পরিষদের সদস্য ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে আলোচনা না করে এককভাবে রেজুলেশন করে ভিজিএফের উপকারভোগীদের তালিকা প্রস্তুত করেন। ১ নম্বর ওয়ার্ড কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসরণ না করে তালিকা তৈরির বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের ৯ জন সদস্য স্বাক্ষর করেননি। তালিকায় থাকা কয়েকজন উপকারভোগীর বাড়িঘর সেমিপাকা এবং তাদের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা তুলনামূলক স্বচ্ছল বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।
মৃত ও ভুয়া ব্যক্তির নামে চাল উত্তোলনের তথ্য
তদন্ত প্রতিবেদনে কয়েক বছর আগে মৃত্যুবরণ করা ব্যক্তিদের নামেও ভিজিএফের চাল উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই ব্যক্তির নাম একাধিকবার ব্যবহার এবং স্বামী-স্ত্রীর নামে পৃথক কার্ড দিয়ে চাল উত্তোলনের তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে।
এ ছাড়া তালিকায় নাম থাকার পরও অনেক প্রকৃত উপকারভোগী চাল পাননি বলে তদন্ত কমিটি উল্লেখ করেছে। এমনকি কারও কারও নামে স্লিপ থাকার পরও তারা চাল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাহাগিলী ইউনিয়নে ভিজিএফের চাল বিতরণে স্পষ্ট অসংগতি রয়েছে।
তদন্ত কমিটিতে উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা আহ্বায়ক, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের ব্যবস্থাপক সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট বিট অফিসার সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাদের স্বাক্ষরিত তদন্ত প্রতিবেদনটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়।
পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে স্মারক নম্বর ০৪.৪৭.৭০৪৫.০০১.০০২.১২.২৫-৮১০, তারিখ ১৭ আগস্ট ২০২৬-এর মাধ্যমে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে ৪ নম্বর বাহাগিলী ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত সদস্য/সদস্যবৃন্দ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে আবেদন করেছেন।
আবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি তদন্তে অনিয়মের বিষয়গুলো উঠে আসার পরও চূড়ান্ত ব্যবস্থা না হওয়ায় পরিষদের কার্যক্রম ও সরকারি অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত ইউনিয়ন পরিষদের যৌথ ব্যাংক হিসাব পরিচালনা ও আর্থিক লেনদেনে চেয়ারম্যানের একক ক্ষমতা সাময়িকভাবে স্থগিত বা সীমিত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে ৪ নম্বর বাহাগিলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সুজাউদ্দৌলা লিপ্টন বলেন, নিয়ম মেনেই কার্ডগুলো করা হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। তদন্ত কমিটি এসে যেসব নাম পেয়েছে, সেগুলো পরবর্তীতে বাদ দেওয়া হয়েছে।


