...|...|...

বরিশাল

বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণ শোধে ১৭০০ কোটি টাকার চাপ

আসাদুল্লাহ হাসান মুসা, পটুয়াখালী প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৩:৫৫
Shares
বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণ শোধে ১৭০০ কোটি টাকার চাপ

পটুয়াখালীর ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাচালিত তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণের দ্বিতীয় কিস্তির মূলধন ও সুদ বাবদ চলতি সেপ্টেম্বর মাসে প্রায় ১৩ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার পরিশোধ করতে হবে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই অর্থ পরিশোধ নিশ্চিত করতে প্রকল্পের ঋণদাতা চায়না এক্সিম ব্যাংক থেকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

ঋণের কিস্তি পরিশোধে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন ও পর্যাপ্ত রাজস্ব প্রবাহ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে চীনা ব্যাংকটি। একই সাথে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কাছে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির পাওনা বিল আদায়, উৎপাদন ও বিদ্যুৎ বিক্রির অর্থের তথ্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে অবহিত করা এবং কিস্তির অর্থ যথাসময়ে নির্ধারিত হিসাবে জমা দেওয়ার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ আগস্ট আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেডের (আরএনপিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে চিঠি পাঠায় চায়না এক্সিম ব্যাংক। ওই চিঠিতে পটুয়াখালী বিদ্যুৎকেন্দ্রটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে উল্লেখ করা হয়। একই সাথে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত দ্বিতীয় কিস্তির মূলধন ও সুদ পরিশোধের জন্য আনুমানিক ১৩ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার প্রস্তুত রাখার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

ব্যাংকটির পক্ষ থেকে আশা করা হচ্ছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে যে নগদপ্রবাহ তৈরি হবে, সেই অর্থের মাধ্যমেই প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধের প্রয়োজনীয় অর্থের বড় অংশ সংস্থান করা সম্ভব হবে। এ কারণে কেন্দ্রটির উৎপাদন ও বিদ্যুৎ বিক্রির অর্থপ্রবাহ যেন কোনো কারণে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

পটুয়াখালীর এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল) এবং চীনের নোরিনকো ইন্টারন্যাশনালের যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয়ের ৩০ শতাংশ ইকুইটি বিনিয়োগ হিসেবে দুই প্রতিষ্ঠান সমানভাবে বহন করেছে। আর বাকি ৭০ শতাংশ ব্যয় মেটানোর জন্য চীনের এক্সিম ব্যাংক ও ব্যাংক অব চায়না যৌথভাবে প্রায় ১৭৭ কোটি মার্কিন ডলারের সিন্ডিকেটেড ঋণ দিয়েছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। এখানে দুটি ইউনিট রয়েছে এবং প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন সক্ষমতা ৬৬০ মেগাওয়াট।

ঋণের কিস্তি পরিশোধের অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করতে কেন্দ্রটির স্থিতিশীল ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে চায়না এক্সিম ব্যাংক। এ জন্য বিদ্যুৎ বিভাগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, বিপিডিবি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার সাথে যোগাযোগ ও প্রয়োজনীয় সমন্বয় করতে আরএনপিএলকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে প্রত্যাশিত নগদপ্রবাহ নির্ভর করে উৎপাদন ও বিদ্যুৎ বিক্রির ওপর। ফলে কোনো কারণে উৎপাদন কমে গেলে কিংবা কেন্দ্রটির কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটলে বিদ্যুৎ বিক্রি থেকে প্রত্যাশিত রাজস্বও কমে যেতে পারে। এতে ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান কঠিন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ কারণে চায়না এক্সিম ব্যাংকের চিঠিতে বর্তমান বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ এবং উৎপাদনের বিপরীতে বিদ্যুৎ বিলের তথ্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে জানাতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি বিপিডিবির কাছে যে বিদ্যুৎ বিল বকেয়া রয়েছে, তা দ্রুত যাচাই করে নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।

ঋণদাতা ব্যাংকটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন ও রাজস্ব আদায়ের ওপরই গুরুত্ব দেয়নি; কিস্তির অর্থ কোন হিসাবে জমা হবে, সেটিও স্পষ্ট করেছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট তহবিল সিন্ডিকেট ঋণের জন্য মনোনীত এজেন্ট ব্যাংকের হিসাবে জমা করতে হবে। এর মাধ্যমে ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থপ্রবাহ নির্ধারিত ব্যবস্থার মধ্যে রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করতে চায় ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানটি।

তবে এই ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বৈদেশিক মুদ্রা। বিদ্যুৎকেন্দ্রের আয় মূলত স্থানীয় মুদ্রায় হলেও প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হবে মার্কিন ডলারে। ফলে বিদ্যুৎ বিক্রি থেকে স্থানীয় মুদ্রায় যে রাজস্ব আসবে, তা থেকে নির্ধারিত সময়ে প্রয়োজনীয় ডলার সংগ্রহ করে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছে চায়না এক্সিম ব্যাংক। নির্ধারিত সময়ের আগে প্রয়োজনীয় মার্কিন ডলার রূপান্তর ও বিদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে।

চিঠি অনুযায়ী, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় দফার মূলধন ও সুদ পরিশোধের নির্ধারিত শেষ তারিখ। অর্থাৎ ওই সময়ের মধ্যে প্রায় ১৩ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ পরিশোধের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে। কোনো কারণে প্রয়োজনীয় অর্থের ঘাটতি দেখা দিলে নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধে সমস্যা তৈরি হতে পারে।

এ ধরনের পরিস্থিতির সম্ভাব্য আর্থিক পরিণতি নিয়েও সতর্ক করেছে চায়না এক্সিম ব্যাংক। ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্ধারিত অর্থ পরিশোধে ঘাটতি হলে তা সার্বভৌম গ্যারান্টির আওতায় খেলাপি হিসেবে গণ্য হতে পারে। একই সাথে বাংলাদেশ সরকারের গ্যারান্টিযুক্ত অন্য ঋণ সুবিধার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

বিশেষ করে একটি ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে অন্য সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত ঋণ সুবিধাগুলোও ‘ক্রস ডিফল্ট’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কিস্তি পরিশোধের বিষয়টি শুধু একটি প্রকল্পের আর্থিক দায় পরিশোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর সাথে সরকারি গ্যারান্টির আওতায় থাকা অন্যান্য ঋণ ব্যবস্থার বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়ছে।

এ পরিস্থিতিতে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় কিস্তি পরিশোধের জন্য পটুয়াখালী বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন অব্যাহত রাখা, উৎপাদিত বিদ্যুতের বিপরীতে বিপিডিবির কাছ থেকে বকেয়া বিল আদায় এবং প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা সংস্থানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

চায়না এক্সিম ব্যাংকের চিঠিতে মূলত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করার বিষয়টিকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রের বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে রাজস্ব আয়, বিপিডিবির বিল পরিশোধ, অর্থ নির্ধারিত এজেন্ট ব্যাংকের হিসাবে জমা এবং শেষ পর্যন্ত সেই অর্থকে প্রয়োজনীয় মার্কিন ডলারে রূপান্তর করে বিদেশে পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়াটি সময়মতো সম্পন্ন করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

পটুয়াখালীর ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা ৬৬০ মেগাওয়াট। প্রকল্পটির ৭০ শতাংশ ব্যয় বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে এবং ৩০ শতাংশ ইকুইটি বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হয়েছে। এখন বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর পর সেই প্রকল্প থেকে তৈরি হওয়া অর্থপ্রবাহের ওপরই ঋণের কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা অনেকাংশে নির্ভর করছে।

ফলে ৩০ সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত দ্বিতীয় কিস্তির আগে প্রায় ১৩ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার সংস্থানের পাশাপাশি বিপিডিবির বকেয়া বিল আদায়, নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন এবং প্রয়োজনীয় ডলার সংগ্রহ ও বিদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে প্রকল্পের ঋণদাতা চায়না এক্সিম ব্যাংক।