একসময় নারিকেলের ছোবড়া ফেলে দেওয়া হতো, কোথাও আবার ব্যবহার করা হতো জ্বালানি হিসেবে। সেই অবহেলিত ছোবড়াই এখন হয়ে উঠেছে মূল্যবান কাঁচামাল। ছোবড়া প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি হচ্ছে ফাইবার ও কোকোপিট। এসব কাঁচামাল দিয়ে তৈরি হচ্ছে দড়ি, পাপোশ, দরজার মাদুর, ব্রাশ, জাজিম, পাখির বাসাসহ নানা ধরনের ব্যবহার্য ও শৌখিন পণ্য। এতে একদিকে যেমন বর্জ্যের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থান ও আয়ের নতুন সুযোগ।
বাগেরহাট সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের রহিমাবাদ গ্রামে গড়ে ওঠা একটি কারখানায় প্রতিদিন প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে কাঁচা, পাকা ও শুকনা নারিকেলের ছোবড়া। কারখানায় স্তূপ করে রাখা ছোবড়া যন্ত্রের সাহায্যে প্রক্রিয়াজাত করার পর আলাদা হয়ে যাচ্ছে আঁশ ও গুঁড়ো অংশ। আঁশ থেকে তৈরি হচ্ছে ফাইবার, আর গুঁড়ো অংশ প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হচ্ছে কোকোপিট। একসময় ফেলে দেওয়া এসব উপকরণই এখন হয়ে উঠেছে উৎপাদন ও আয়ের উৎস।
কারখানায় উৎপাদিত কোকোপিট সরবরাহ করা হচ্ছে রংপুর, দিনাজপুর, টাঙ্গাইল ও বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলার নার্সারিতে। গাছের চারা উৎপাদন, বীজের অঙ্কুরোদ্গম এবং টবের গাছের পরিচর্যায় মাটির বিকল্প হিসেবে কিংবা মাটির সাথে মিশিয়ে এটি ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে, উৎপাদিত ফাইবার যাচ্ছে বিভিন্ন কারখানা ও কুটিরশিল্প উদ্যোক্তাদের কাছে। এসব আঁশ থেকে তৈরি হচ্ছে দৈনন্দিন ব্যবহার্য নানা পণ্য।
নারিকেলের ছোবড়ার আঁশ দিয়ে দড়ি, পাপোশ, দরজার মাদুর, কার্পেট, ব্রাশ, গদি ও জাজিমের উপকরণ তৈরি করা যায়। এ ছাড়া গাড়ির আসনের কিছু অংশ, গাছের গোড়ায় ব্যবহারের ম্যাট, ঝুলন্ত টব এবং পাখির বাসা তৈরিতেও ব্যবহার করা হয় এই আঁশ। অন্যদিকে, ছোবড়ার গুঁড়ো থেকে তৈরি কোকোপিট বা কোকোপিট কৃষি ও নার্সারিশিল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে। যথাযথ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে নারিকেলের ছোবড়ার প্রায় প্রতিটি অংশই অর্থনৈতিকভাবে কাজে লাগানো সম্ভব।
আগে ছোবড়া প্রক্রিয়াজাত করার পর অবশিষ্ট গুঁড়ো অনেক সময় ফেলে দেওয়া হতো। কোথাও কোথাও তা নদীতেও ফেলা হতো। বর্তমানে সেই গুঁড়োই প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে অব্যবহৃত অংশ থেকেও আয় হচ্ছে, কমছে বর্জ্য। পাশাপাশি ছোবড়া সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করার কাজে যুক্ত হচ্ছেন স্থানীয় মানুষ।
স্থানীয় বাসিন্দা তরিকুল ইসলাম বলেন, নারিকেল এ অঞ্চলের পরিচিত একটি কৃষিপণ্য। নারিকেলের ছোবড়া কাজে লাগিয়ে পণ্য তৈরির উদ্যোগ স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে। ছোবড়া সংগ্রহ ও সরবরাহের কাজে স্থানীয় মানুষ যুক্ত হতে পারছেন। এ ধরনের কারখানা বাড়লে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে। তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে নিয়মিত কাঁচামাল সরবরাহ, আধুনিক যন্ত্রপাতি, শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও বাজার সম্প্রসারণ জরুরি।
কারখানার শ্রমিক সাগর বলেন,আগে নারিকেলের ছোবড়ার অনেক অংশ ফেলে দেওয়া হতো। এখন মেশিনের সাহায্যে ছোবড়া থেকে আঁশ ও গুঁড়ো আলাদা করা হয়। এগুলো দিয়ে বিভিন্ন পণ্য তৈরি হচ্ছে। এখানে কাজ করে আমরা আয় করতে পারছি, যা পরিবারের খরচ চালাতে সহায়তা করছে।
আরেক শ্রমিক মামুন বলেন,নারিকেলের ছোবড়া যে এত কাজে লাগে, আগে তা বুঝিনি। এখন ছোবড়া থেকে ফাইবার ও কোকোপিট তৈরি হচ্ছে। আগে যে অংশ ফেলে দেওয়া হতো, এখন সেটিও বিক্রি হচ্ছে। এ ধরনের কারখানা আরও গড়ে উঠলে স্থানীয় মানুষের কাজের সুযোগ বাড়বে।
কারখানার নারী শ্রমিক রিনা বেগম বলেন,আগে নারিকেলের ছোবড়া ফেলে দিতে দেখেছি। এখন সেই ছোবড়া থেকেই ফাইবার ও কোকোপিট তৈরি হচ্ছে। এখানে কাজ করে আমরা নিজেরা আয় করতে পারছি এবং পরিবারের খরচ চালাতে সহায়তা করছি। এ ধরনের কাজের সুযোগ বাড়লে আমাদের মতো গ্রামের নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার পথ আরও সহজ হবে।
প্রতিষ্ঠানের মালিক বেগ মোকারম হোসেন বলেন, নারিকেলের ছোবড়া একসময় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অব্যবহৃত পড়ে থাকত। সেই ছোবড়া প্রক্রিয়াজাত করে এখন আমরা ফাইবার ও কোকোপিট তৈরি করছি, যা দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। আমার প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১০ জন শ্রমিক কাজ করেন। তাদের কেউ দৈনিক ৪০০ টাকা, আবার কেউ ৫০০ টাকা মজুরি পান। তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পেরে আমি সন্তুষ্ট। আল্লাহ হয়তো আমার মাধ্যমে তাদের জীবিকার ব্যবস্থা করেছেন। ছোট একটি উদ্যোগ থেকে এভাবে শিল্প গড়ে উঠছে, এটাই আমার কাছে বড় পাওয়া। শিল্পের আরও প্রসার ঘটাতে পারলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান বাড়বে এবং গ্রামের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে উৎপাদন বাড়াতে আধুনিক যন্ত্রপাতি, পর্যাপ্ত কাঁচামাল সরবরাহ ও বাজার সম্প্রসারণে সহযোগিতা প্রয়োজন।
বাগেরহাট বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা মো. সোহাগ হোসেন বলেন,নারিকেলের ছোবড়া প্রক্রিয়াজাত করে ফাইবার ও কোকোপিট উৎপাদন বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। এসব কাঁচামাল ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের ব্যবহার্য ও শৌখিন পণ্য তৈরি করা যায়। পরিকল্পিতভাবে উৎপাদন বাড়ানো, উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া এবং বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে এ খাতে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের বিকাশ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও পণ্যের মান নিশ্চিত করা গেলে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হবে।

ছবি: ফেলে দেওয়া নারিকেলের ছোবড়া
ফেলে দেওয়া নারিকেলের ছোবড়াকে মূল্যবান কাঁচামালে রূপান্তরের এই উদ্যোগ শুধু একটি কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও পরিবেশবান্ধব শিল্প বিকাশেরও একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। যথাযথ পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে বাগেরহাটের এই উদ্যোগ দেশের কুটিরশিল্পে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।


