বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সরাসরি নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে সহকারী উপপরিদর্শক বা এএসআই (নিরস্ত্র) পদে কর্মকর্তা নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আগে এই পদে সরাসরি উন্মুক্ত পরীক্ষা দিয়ে প্রবেশের কোনো সুযোগ ছিল না। এত দিন পুলিশে সরাসরি প্রবেশের ক্ষেত্রে তিনটি স্তর সুনির্দিষ্ট ছিল—সর্বস্তরের জন্য কনস্টেবল, গ্র্যাজুয়েটদের জন্য সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) এবং বিসিএসের মাধ্যমে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি)। মাঝের এএসআই (নিরস্ত্র) পদটি মূলত কনস্টেবলদের পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করা হতো। দীর্ঘদিনের প্রচলিত এই কাঠামোতে বড় পরিবর্তন এনে সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের জন্য মাঠপর্যায়ের এই গুরুত্বপূর্ণ পদটি উন্মুক্ত করে নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
পদসংখ্যা ও জেলাভিত্তিক চিত্র
পুলিশ সদর দফতরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ পুলিশের এএসআই (নিরস্ত্র) পদে নিয়োগে আবেদনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল গত ২৮ এপ্রিল এবং তা শেষ হয় ২৭ মে। এই নিয়োগের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রার্থীরা ১০,২০০-২৪,৬৮০ টাকা স্কেলে (গ্রেড-১৪) বেতন পাবেন এবং প্রশিক্ষণকালীন সরকারি বিধি মোতাবেক প্রতি মাসে প্রশিক্ষণ ভাতা প্রাপ্য হবেন।
এবারের নিয়োগে মোট পদের মধ্যে ৯৩ শতাংশ মেধার ভিত্তিতে এবং বাকি ৭ শতাংশ কোটার ভিত্তিতে পূরণ করা হবে। কোটার মধ্যে রয়েছে—মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী কোটা ১ শতাংশ এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গ কোটা ১ শতাংশ।
৬৪ জেলায় মোট ২০০০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হবে। জেলাভিত্তিক শূন্য পদের তথ্যানুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ১৬৭টি শূন্য পদ রয়েছে ঢাকা জেলায়। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ১০৬টি, কুমিল্লায় ৭৫, ময়মনসিংহে ৭১ ও সিলেটে ৪৮টি শূন্য পদ রয়েছে। সবচেয়ে কম শূন্য পদ রয়েছে পার্বত্য জেলা বান্দরবানে, মাত্র পাঁচটি।
মাঠপর্যায়ের কাজে গতি আনার লক্ষ্য
পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, অপরাধের ধরন বদলানো ও মাঠপর্যায়ের দাফতরিক ও তদন্ত কার্যক্রমে সরাসরি উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ জনবল যুক্ত করার লক্ষ্যেই এই নতুন পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করে নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে পুলিশের অ্যাসিস্ট্যান্ট ইন্সপেক্টর জেনারেল (এআইজি) আফরিদা রুবাই গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর ইতিহাসে এবারই প্রথম এএসআই পদে সরাসরি নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর ফলে পুলিশ বাহিনীর মাঠপর্যায়ের দাফতরিক ও প্রশাসনিক কাজে গতি আসবে। আমরা আশা করছি, অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।’
পুলিশ সদস্যদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
সরাসরি নিয়োগের এই ঐতিহাসিক পরীক্ষা পদ্ধতি চালুর পর থেকে পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ স্তরে, বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের মধ্যে একধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে বাহিনীতে কর্মরত কনস্টেবলদের পদোন্নতির সুযোগ এর ফলে বাধাগ্রস্ত হবে কি না, তা নিয়ে মাঠপর্যায়ে আলোচনা চলছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কনস্টেবল গণমাধ্যমকে বলেন, এর ফলে কনস্টেবলদের মধ্য থেকে কর্মদক্ষতা ও জ্যেষ্ঠতা (পারফরম্যান্স ও সিনিয়রিটি) বিবেচনা করে পদোন্নতির যে প্রক্রিয়াটি সচল রয়েছে, তা বাধার মুখে পড়তে পারে। এতে সাধারণ কনস্টেবলদের চাকরির প্রতি মনোযোগ ও মাঠপর্যায়ের পেশাদারত্বে ঘাটতি দেখা দেওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
প্রশাসনের নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, সরাসরি নিয়োগের পাশাপাশি বিভাগীয় পদোন্নতির স্বাভাবিক নিয়মও সমন্বয় করা হচ্ছে, যাতে মেধা ও অভিজ্ঞতা দুটিরই যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা যায়।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো


