...|...|...

বিশ্ব

দীর্ঘ ৩৩ বছর পর

নেতানিয়াহুর সাথে পরকীয়া নিয়ে মুখ খুললেন সাবেক উপদেষ্টা ড. রুথ

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১২:১৮ | আপডেট: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ২:৩২
Shares
নেতানিয়াহুর সাথে পরকীয়া নিয়ে মুখ খুললেন সাবেক উপদেষ্টা ড. রুথ

ছবি: সংগৃহীত

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সেই চাঞ্চল্যকর লাইভ টেলিভিশন সম্প্রচারের ৩৩ বছর পর প্রথমবারের মতো মুখ খুলেছেন ড. রুথ বার। নেতানিয়াহুর সাথে তার পেশাগত সম্পর্ক, প্রাথমিক রাজনৈতিক কৌশল এবং সেই ঐতিহাসিক কেলেঙ্কারির নেপথ্য ইতিহাস নিয়ে কথা বলেছেন তিনি।

ড. রুথ বার হলেন এমন এক নারী, যার নাম আপনি হয়তো কখনো শোনেননি, অথচ তিনি ইসরায়েলের সবচেয়ে বিখ্যাত ‘অপরিচিত’ নারী।

জেরুজালেম পোস্টের তথ্য মতে, ১৯৯৩ সালের ১৪ জানুয়ারি ঘর্মাক্ত ও গম্ভীর মুখে ইসরায়েলের চ্যানেল ১-এর স্টুডিওতে হাজির হয়ে লাইভ টিভিতে নেতানিয়াহু স্বীকার করেছিলেন যে, লিকুদ পার্টির নেতৃত্ব পাওয়ার লড়াইয়ে তার সাথে কাজ করা কৌশলগত উপদেষ্টা রুথ বারের সাথে তার একটি বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ছিল।

১৯৯২ সালের নির্বাচনে আইজাক রবিনের কাছে শামীরের পরাজয়ের পর লিকুদ দলের চেয়ারম্যান হিসেবে আইজাক শামীরের উত্তরসূরি বেছে নেওয়ার প্রাথমিক নির্বাচন তখন তুঙ্গে। নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ডেভিড লেভি। রিভিশনিস্ট অভিজাত পরিবারের সন্তান এবং ইসরায়েলের পুরনো উপজাতীয় অভিজাত শ্রেণীর সদস্য নেতানিয়াহু তখন লিকুদ দলে মূলত একজন বহিরাগত ছিলেন।

এর মাত্র কয়েক বছর আগে তিনি জাতিসংঘ থেকে ইসরায়েলে ফিরে লিকুদ দলে যোগ দেন এবং এমন এক আমেরিকান স্টাইলে দলটিকে কবজা করার সিদ্ধান্ত নেন, যা তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা কখনো দেখেনি। বেনির বেগিন, এহুদ ওলমার্ট, ড্যান মেরিডোর, রনি মিলো, লিমর লিবনাটের মতো লিকুদ রাজপুত্ররা তাঁকে হুমকি হিসেবে দেখেছিলেন। তাদের চোখে তিনি ছিলেন একজন প্রতারক সুযোগসন্ধানী এবং পরদেশী এজেন্ট।

কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে নেতানিয়াহু দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন এবং দৌড়ে এগিয়ে যান। ঠিক সেই মুহূর্তে নেতানিয়াহুর বাড়িতে এক বেনামি ফোন আসে। তার তরুণ স্ত্রী সারার কাছে বলা হয় যে, প্রচার শিবিরের কৌশলগত উপদেষ্টার সাথে তার স্বামীর পরকীয়া চলছে এবং যদি তিনি প্রার্থিতা থেকে সরে না দাঁড়ান, তবে এর অকাট্য প্রমাণ প্রকাশ করে দেওয়া হবে।

নেতানিয়াহু ব্ল্যাকমেইলের কাছে মাথা নত না করে নিজেই টেলিভিশনে লাইভ কনফেস করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি স্টুডিওতে পৌঁছে দেশবাসীকে জানান যে তিনি তার স্ত্রীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। একই সাথে তিনি ডেভিড লেভির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন যে তাকে ব্ল্যাকমেইলের চেষ্টা করা হচ্ছে।

তৎকালীন সময়ে ইসরায়েলে মাত্র একটি টেলিভিশন চ্যানেল ছিল এবং এর দর্শকপ্রিয়তা ছিল শতভাগ। দেশজুড়ে হইচই পড়ে যায়। সারার রাগ সামলাতে না পেরে নেতানিয়াহু বাড়ি থেকে বিতাড়িত হন, যদিও যথারীতি তিনি পরে ফিরে আসেন। মজার বিষয় হলো, ওই ব্ল্যাকমেইলের টেপটি কখনোই প্রকাশিত হয়নি, কারণ বাস্তবে কোনো টেপই ছিল না! কেউ হয়তো নিছক মজা করেছিল বা খেলনা বন্দুকের ভয় দেখিয়েছিল। আর তাতেই নেতানিয়াহু লাইভ টিভিতে ছুটে গিয়েছিলেন।

পেশাগত জীবন এবং নেতানিয়াহুর মনস্তত্ত্ব ড. রুথ বারের নাম সে সময় প্রকাশ পেলেও সে যুগে সামাজিক মাধ্যম বা ডিজিটাল মিডিয়া ছিল না। ফলে বার আবারও প্রচারের আড়ালে চলে যান। তিনি একজন মনোবিজ্ঞানী এবং ব্র্যান্ডিং ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার কৌশলগত পরামর্শক হিসেবে কাজ চালিয়ে যান। তিনি শলোমন লাহাত, জভি বার, এহুদ বারাক, এহুদ ওলমার্ট, ড্যান মেরিডোর এবং গাবি আশকেনাজির মতো সিনিয়র রাজনীতিবিদদের সাথে কাজ করেছেন। এছাড়া বড় বড় কর্পোরেট ব্র্যান্ড ও ব্যাংকের হয়েও তিনি কাজ করেছেন।

নিজের জীবনকাজের ওপর ভিত্তি করে ৬০ পাতারও বেশি একটি বই লিখেছেন তিনি, যার নাম ‘ব্রেইন আন্ডার দ্য ইনফ্লুয়েন্স’। এই বই প্রকাশের জন্যই মূলত তিনি তার বহু বছরের নীরবতা ভেঙেছেন।

নেতানিয়াহু সম্পর্কে ড. বার বলেন, নেতানিয়াহুর মধ্যে আমি প্রথম যে বিষয়টি লক্ষ্য করেছি তা হলো তার চরম আত্মম্ভরিতা বা শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতি। এটি ছিল এক গভীর, প্রায় ভীতিপ্রদ শ্রেষ্ঠত্ববোধ। তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে তিনি সবার ওপরে। তিনি অন্যদের অবজ্ঞা করে ‘কেরানি’ বলে ডাকতেন। এমনকি তার বিরোধীদের তিনি ছোট, করুণ ও তাৎপর্যহীন মনে করতেন।

তিনি আরও বলেন, তার দলে ইয়েভেস লিবারম্যান এবং আইয়াল আরাদের মতো ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারা ছিলেন। নেতানিয়াহু গণমাধ্যমকে কীভাবে ব্যবহার করতে হয় তা সবার আগে বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি জানতেন যে, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করা মানেই মানুষজনকে নিয়ন্ত্রণ করা।

‘সারভাইভাল লেয়ার্স’ বা বেঁচে থাকার স্তর এবং বিষাক্ত যন্ত্র মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালিয়েছেন ড. বার। তার মডেলে মানব ধারণাকে চারটি ‘বেঁচে থাকার স্তরে’ভাগ করা হয়েছে—১. ইম্প্রেশন বা প্রভাব, ২. রিলেশনস বা সম্পর্ক, ৩. প্রোটেকশন বা সুরক্ষা, এবং ৪. ইমোশনস বা আবেগ।

নেতানিয়াহুর শক্তির জায়গা কোনটি জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিবির বড় সম্পদ হলো ‘ইম্প্রেশন’ বা প্রভাবের স্তর। বড়, সফল, নেতা এবং ভিন্ন লিগের কেউ—এই ইমেজই সবকিছু নির্ধারণ করে। তার দুর্বল জায়গা হলো ‘রিলেশনস’ বা সম্পর্কের স্তর, যা বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সহানুভূতির সাথে জড়িত। বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষেত্রে তার স্কোর সবসময় সবচেয়ে কম থাকে।

আজকের রাজনীতির ‘পয়জন মেশিন’ বা বিষ ছড়ানোর যন্ত্র সম্পর্কে রুথ বার বলেন, নেতানিয়াহু ৩০ বছর আগেই এই ধারণা পোষণ করতেন যে, প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক মৌখিক আক্রমণ চালাতে হবে। আজকের দিনে যা ইসরায়েলের জীবনকে বিষিয়ে তুলছে, তার ভিত্তি সেদিনই প্রোথিত হয়েছিল।

ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প নেতানিয়াহুর সাথে সম্পর্কের সেই অধ্যায়ের বাইরে ড. বারের ব্যক্তিগত জীবনও বড় ধরনের মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী। তার স্বামী ডা. শমুয়েল বার একজন বিখ্যাত চক্ষু সার্জন ও যুদ্ধক্ষেত্রের চিকিৎসক। এত বড় কেলেঙ্কারির পরেও তাদের দাম্পত্য টিকে থাকে।

কিন্তু আসল আঘাত আসে পরবর্তীতে। ২০০৪ সালের ৩০ এপ্রিল ভারতের এক সড়ক দুর্ঘটনায় তাদের ২১ বছর বয়সী কন্যা সোহাম মারা যান। এরপর ২০১৫ সালে তাদের ৩৭ বছর বয়সী পুত্র ওমের আকস্মিক বন্দুকের গুলিতে মারা যান।

এই চরম শোক কাটিয়ে ওঠার বিষয়ে রুথ বার বলেন, সোহামের মৃত্যুর পর আমরা যে মানসিক আঘাত পেয়েছিলাম তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। কিন্তু আমরা জীবনকে বেছে নিয়েছিলাম। বিশ্বাস করুন বা না করুন, সোহামের মৃত্যুর পর আমার বয়স ৫০ বছর হওয়া সত্ত্বেও আমরা মাতান নামে এক পুত্রসন্তান লাভ করি। অসম্ভব মনে হলেও সে আমাদের ঘর আনন্দতে ভরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু এর ১১ বছর পর ওমেরও মারা যায়। এটি ছিল এক ধ্বংসাত্মক আঘাত। তবুও আমরা বেঁচে থাকার তাগিদে শোক কাটিয়ে উঠেছি। আমার সন্তানেরা আমার হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে আছে।

বর্তমান রাজনীতি ও গণতন্ত্র নিয়ে উদ্বেগ আসন্ন নির্বাচন এবং নেতানিয়াহুর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ড. রুথ বার বলেন, তিনি এমন এক ব্যক্তি যিনি নিজের ক্ষমতা রক্ষার্থে এবং টিকে থাকার জন্য পুরো দেশকে দ্বিখণ্ডিত করতে দ্বিধা করেন না, এমনকি গৃহযুদ্ধের মুখে ঠেলে দিতে পারেন। চরম আত্মম্ভরিতা সম্পন্ন এমন একজন ব্যক্তি যখন গণতন্ত্রের শীর্ষে থাকেন এবং ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করেন না, তখন তা ইসরায়েলি গণতন্ত্রের জন্য একটি অস্তিত্বের সংকট তৈরি করে।