...|...|...

জাতীয়

নবম পে-স্কেল: বেতন বাড়বে, চাপ বাড়বে কোথায়?

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, সন্ধ্যা ৭:৪৬ | আপডেট: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ২:৩২
Shares
নবম পে-স্কেল: বেতন বাড়বে, চাপ বাড়বে কোথায়?

ছবি: এআই জেনারেটেড

এক দশকেরও বেশি সময়ের অপেক্ষার অবসান ঘটল আজ। সোমবার বিকেলে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিশেষ মন্ত্রিসভা বৈঠকে অনুমোদন পেল নবম জাতীয় পে-স্কেল। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর, কিন্তু অর্থনীতির খাতা খুলে দেখলে বোঝা যায়- এই একটি স্বাক্ষরের পেছনে লুকিয়ে আছে আগামী কয়েক বছরের বাজেট, মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার এক জটিল হিসাব-নিকাশ।

অনুমোদিত কাঠামো অনুযায়ী নতুন মূল বেতন কার্যকর ধরা হয়েছে চলতি বছরের ১ জুলাই থেকেই। তবে গোটা সুবিধা একবারে নয়- বাজেট ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ কমাতে সরকার এটি বাস্তবায়ন করবে দুই অর্থবছরে চার ধাপে। প্রথম বছরে মূল বেতন, পরের বছরে বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা- এভাবেই ধাপে ধাপে এগোবে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। আগের অষ্টম পে-স্কেলে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন যেখানে ছিল ৮ হাজার ২৫০ টাকা, নতুন কাঠামোতে তা বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ২০ হাজার টাকায়; সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতন ৭৮ হাজার থেকে বেড়ে হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।

সংখ্যাগুলো দেখতে চোখজুড়ানো মনে হলেও, প্রশ্ন হলো- এই বাড়তি অর্থ আসবে কোথা থেকে, আর তার আসল মূল্য কে চোকাবে?

ক্রয়ক্ষমতা ফেরার প্রতিশ্রুতি

গত এক দশকে খাদ্য থেকে বাসাভাড়া, চিকিৎসা থেকে শিক্ষা- জীবনযাত্রার প্রতিটি খাতে ব্যয় বেড়েছে অনেকখানি, অথচ বেতন কাঠামো থেকে গেছে অপরিবর্তিত। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত আয় বাস্তবে কমে এসেছিল। নতুন পে-স্কেলের মূল যুক্তিই হলো এই ক্ষয়ে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা।

বেতন বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে ভোগব্যয়- বাজার, পরিবহন, আবাসন, শিক্ষা খাতে অতিরিক্ত টাকা ঢুকবে অর্থনীতির রক্তনালীতে। এর একটি মাল্টিপ্লায়ার প্রভাব পড়তে পারে খুচরা বাণিজ্য থেকে শুরু করে সেবা খাত পর্যন্ত বিস্তৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে। কিন্তু এখানেই লুকিয়ে আছে অর্থনীতির এক পুরনো ধাঁধা- চাহিদা বাড়লে সরবরাহও কি একই গতিতে বাড়বে, নাকি বাড়তি টাকা শুধু দামকেই ঠেলে তুলবে ওপরে?

মূল্যস্ফীতির অদৃশ্য বিল

লাখ লাখ মানুষের হাতে হঠাৎ বাড়তি অর্থ এলে, অথচ বাজারে পণ্য ও সেবার জোগান আগের মতোই থাকলে- অর্থনীতিতে তৈরি হয় চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতির চাপ। খাদ্যপণ্য, বাসাভাড়া কিংবা নিত্যদিনের সেবার বাজারে এই চাপ সবচেয়ে আগে অনুভূত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তবে বিষয়টি এতটা সরলও নয় যে বেতন বাড়লেই মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। আমদানি ব্যয়, জ্বালানির দাম, বিনিময় হার, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা- এসব মিলিয়েই তৈরি হয় মূল্যস্ফীতির প্রকৃত চিত্র। তবু একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর আয় একযোগে বেড়ে গেলে বাজারের ওপর যে বাড়তি চাপ পড়ে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সরকার সে কারণেই সুবিধা একবারে না দিয়ে চার ধাপে ভাগ করে দিচ্ছে- যা অনেকটা অর্থনীতির উত্তাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি সতর্ক কৌশল।

আসল প্রশ্ন: টাকা আসবে কোথা থেকে

নবম পে-স্কেলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখানেই। পূর্ণ সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে গেলে বছরে বাড়তি প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে হিসাব দিয়েছিল সংশ্লিষ্ট পে কমিশন। বর্তমানে সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের বেতন-পেনশন বাবদ ব্যয়ই দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।

আর এই ব্যয় কোনো একবারের ঘটনা নয়- প্রতিবছরই তা টানতে হবে, সঙ্গে ভবিষ্যতে বাড়বে পেনশন খাতের দায়ও। অর্থাৎ আজকের এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি অর্থবছরের বাজেট নয়, বরং আগামী কয়েক বছরের রাজস্ব কাঠামোর ওপর একটি স্থায়ী দায় হয়ে থেকে যাবে।

উন্নয়নের জায়গা কি সংকুচিত হবে?

বাজেটের একটি বড় অংশ যদি বেতন-ভাতা-পেনশনে চলে যায়, তাহলে সড়ক, বিদ্যুৎ, বন্দর, শিক্ষা কিংবা স্বাস্থ্যের মতো উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দের জায়গা সংকুচিত হওয়ার শঙ্কা থেকেই যায়। অথচ এসব খাতেই লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির বীজ। প্রশ্ন হলো, সরকার কি একই সঙ্গে বেতন বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন ব্যয় ধরে রাখার মতো পর্যাপ্ত রাজস্ব আদায় করতে পারবে?

আর যদি রাজস্ব আয় প্রত্যাশিত হারে না বাড়ে, তাহলে ভরসা করতে হবে ঋণের ওপর। এতে বেসরকারি খাতের জন্য ব্যাংকঋণের সংস্থান কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, বাড়তে পারে সরকারের সুদ পরিশোধের বোঝাও। অর্থাৎ আজকের বাড়তি বেতনের একটি অংশ ভবিষ্যতের বাজেট থেকেই সুদ হিসেবে ফেরত দিতে হতে পারে।

বেসরকারি খাতেও পড়বে ঢেউ

সরকারি বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লে বেসরকারি খাতেও বেতন সমন্বয়ের একটি চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। এতে কর্মীদের আয় বাড়তে পারে ঠিকই, কিন্তু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ব্যয়ও বাড়বে সমানতালে- যা শেষ পর্যন্ত পণ্যমূল্য বৃদ্ধি কিংবা নিয়োগ কমিয়ে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তে গিয়ে ঠেকতে পারে। তবে উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে এই সমন্বয় করা গেলে তা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচকও হয়ে উঠতে পারে।

সবচেয়ে ঝুঁকিতে যারা

পে-স্কেলের সরাসরি সুফল পাবেন সরকারি চাকরিজীবীরাই। কিন্তু মূল্যস্ফীতির চাপ যদি সত্যিই বাড়ে, তার আঁচ গিয়ে পড়বে পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর- বিশেষত নিম্নআয়ের মানুষ, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা বেসরকারি খাতের কর্মীদের ওপর, যারা এই বেতনবৃদ্ধির সরাসরি সুবিধা পাবেন না, অথচ বাজারে বাড়তি দামের ধাক্কা সামলাতে হবে তাদেরই।

তাহলে কি এটি খারাপ সিদ্ধান্ত?

না। বরং দীর্ঘদিন বেতন কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে দেওয়ারও নিজস্ব অর্থনৈতিক মূল্য আছে- প্রকৃত আয় কমে গেলে দক্ষ জনবলকে সরকারি চাকরিতে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে, কমে যায় কর্মীদের মনোবল ও উৎপাদনশীলতা। তাই নবম পে-স্কেল অনুমোদন নিজেই কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নয়। প্রশ্নটা বরং সাফল্যের সংজ্ঞা নিয়ে- বেতন কত বাড়ল, সেটিই একমাত্র মানদণ্ড নয়; বরং এই বাড়তি ব্যয়ের জোগান কীভাবে আসছে এবং তার সঙ্গে রাজস্ব আদায় ও উৎপাদনশীলতা কতটা তাল মিলিয়ে বাড়ছে, তার ওপরই নির্ভর করবে চূড়ান্ত ফল।

চার ধাপে বাস্তবায়নের এই সিদ্ধান্তকে তাই দেখা যেতে পারে একটি সতর্ক, হিসেবি পদক্ষেপ হিসেবে- অর্থনীতির উত্তাপ নিয়ন্ত্রণে রেখে ধীরে ধীরে সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা।

শেষ পর্যন্ত, নবম পে-স্কেল একদিকে যেমন সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বেতন-বৈষম্য ও মূল্যস্ফীতির ক্ষত কিছুটা প্রশমিত করতে পারে, তেমনি রাজস্ব আয় না বাড়লে তা হয়ে উঠতে পারে সরকারের কাঁধে এক দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক বোঝা। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ শুধু নতুন বেতন ঘোষণা করা নয়- বরং সেই বেতন টেকসইভাবে বহন করার মতো একটি অর্থনীতি গড়ে তোলা। রাজস্ব আদায়ের পরিধি বাড়ানো, কর ফাঁকি রোধ, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন-বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ- এই কয়েকটি ফ্রন্টে একসঙ্গে এগোতে না পারলে, আজকের এই সুখবরের একটি অংশ হয়তো নীরবেই হারিয়ে যাবে বাজারের বাড়তি দামের ভিড়ে।