...|...|...

রংপুর

দেশে উৎপাদিত থালাবাসন রফতানি হচ্ছে বিদেশেও

রিপন ইসলাম শেখ, নীলফামারী
প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬, বিকেল ৪:২৩ | আপডেট: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ৩:১৪
Shares
দেশে উৎপাদিত থালাবাসন রফতানি হচ্ছে বিদেশেও

দেশে উৎপাদিত থালা-বাসন রফতানি হচ্ছে বিদেশেও। ছবি: টাইমস টুডে

রেলওয়ের শহর হিসেবে পরিচিত নীলফামারীর সৈয়দপুর। তবে সময়ের সাথে সেই পরিচয়ের সাথে যুক্ত হয়েছে আরেকটি পরিচয়। আর তা হলো স্টেইনলেস স্টিলের থালা-বাসন শিল্পের নগরী। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা ছোট-বড় ৪০ থেকে ৫০টি কারখানায় প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে থালা, প্লেট, বাটি, গ্লাস, জগ, গামলা, হাড়ি-পাতিলসহ নানা ধরনের স্টেইনলেস স্টিলের তৈজসপত্র।

দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহের পাশাপাশি এখানকার তৈরি পণ্য এখন যাচ্ছে ভারত, নেপাল ও ভুটানের বাজারেও। এই শিল্পকে ঘিরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার মানুষের। উদ্যোক্তাদের দাবি, প্রতিদিন প্রায় এক কোটি টাকার পণ্য উৎপাদন হচ্ছে এসব কারখানায়।

সরেজমিনে সৈয়দপুরের বিভিন্ন কারখানা ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মেশিনের শব্দে মুখর উৎপাদন এলাকা। কোথাও স্টেইনলেস স্টিলের শিট কাটা হচ্ছে, কোথাও প্রেস মেশিনে তৈরি হচ্ছে থালা-বাসনের আকৃতি। অন্যদিকে পালিশ, মান নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং ও ট্রাকে পণ্য ওঠানোর কাজে ব্যস্ত শ্রমিকরা। আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবলের সমন্বয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার পণ্য উৎপাদন হচ্ছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, কয়েক দশক আগে সীমিত পরিসরে শুরু হওয়া এই শিল্প এখন উত্তরাঞ্চলের অন্যতম সম্ভাবনাময় উৎপাদন খাতে পরিণত হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রায় সব পাইকারি বাজারে সৈয়দপুরের তৈরি পণ্য সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি রফতানিকারকদের মাধ্যমে ভারত, নেপাল ও ভুটানেও যাচ্ছে এসব পণ্য।

নোয়া স্টিল-এর স্বত্বাধিকারী রাজু পোদ্দার বলেন, দেশীয় বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও আমাদের পণ্যের চাহিদা তৈরি হয়েছে। আমরা মানসম্মত পণ্য উৎপাদনের চেষ্টা করছি। তবে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, ঘন ঘন লোডশেডিং ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শিল্প পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে।

প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার মামুন বলেন, প্রতিদিন কয়েক হাজার পিস বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদন হয়। প্রতিটি পণ্য মান যাচাইয়ের পর বাজারজাত করা হয়। বর্তমানে এই শিল্প স্থানীয় মানুষের জন্য বড় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

আরেক উদ্যোক্তা সাদমান হোসেন বলেন, দেশের পাশাপাশি বিদেশি বাজারেও সৈয়দপুরের তৈরি পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। সরকার যদি অবকাঠামোগত সহায়তা বাড়ায়, তাহলে রফতানির পরিমাণ আরও বাড়ানো সম্ভব।

উদ্যোক্তা আবুল কালাম বলেন, ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় উৎপাদন বারবার বন্ধ হয়ে যায়। এতে সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। শিল্প টিকিয়ে রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আরেক উদ্যোক্তা মিন্টু বলেন, শিল্পাঞ্চলে গ্যাসলাইন না থাকায় আমাদের বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে। দ্রুত গ্যাস সংযোগ দেওয়া হলে উৎপাদন ও রফতানি দুটিই বাড়বে।

কারখানার নারী-পুরুষ শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই শিল্পই এখন তাদের পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। স্থানীয়ভাবে কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ায় অনেকেই আর ঢাকাসহ অন্য শহরে কাজের জন্য যেতে হচ্ছে না।

শ্রমিক গোলজার হোসেন বলেন, এই কারখানার চাকরির আয়েই সংসার চলে। কিন্তু লোডশেডিং হলে কাজ বন্ধ থাকে। পরে অতিরিক্ত সময় কাজ করে সেই ঘাটতি পূরণ করতে হয়।

নারী শ্রমিক পূবা রানী বলেন, আমি প্যাকেজিং বিভাগে কাজ করি। এই আয়ে সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ চালাই। এই শিল্প না থাকলে হয়তো বাইরে গিয়ে কাজ করতে হতো।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) শিল্পনগরী সৈয়দপুরের কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, সৈয়দপুরে বর্তমানে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন উদ্যোক্তা স্টেইনলেস স্টিল শিল্পের সাথে যুক্ত। ছোট-বড় ৪০ থেকে ৫০টি কারখানায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। এসব পণ্য দেশের বাজারের পাশাপাশি ভারত, নেপাল ও ভুটানেও যাচ্ছে। এই শিল্পে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলে এ শিল্প আরও বিকশিত হবে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে কিছু বড় চ্যালেঞ্জ। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, ঘন ঘন বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় অনেক সময় আর্থিক ক্ষতির মুখেও পড়তে হচ্ছে। অন্যদিকে শিল্পাঞ্চলে গ্যাসলাইন না থাকায় উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। এসব সমস্যা সমাধানে দ্রুত গ্যাস সংযোগ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, সহজ শর্তে ঋণ এবং রফতানিতে সরকারি প্রণোদনার দাবি জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।

রেলওয়ের জন্য পরিচিত সৈয়দপুর এখন স্টেইনলেস স্টিল শিল্পের কারণেও নতুন পরিচয় পাচ্ছে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ, শ্রমিকদের পরিশ্রম এবং বাজারের আস্থায় গড়ে ওঠা এই শিল্প শুধু উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিকেই গতিশীল করছে না, বাংলাদেশের তৈরি পণ্যকেও পৌঁছে দিচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এই শিল্প ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রফতানিমুখী খাতে পরিণত হতে পারে।