দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জেলা ঝালকাঠি। জেলার বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি দেশের নানা এলাকার মানুষ প্রতিদিন যাতায়াত করেন ঝালকাঠি পৌর বাস টার্মিনাল দিয়ে। তবে তিন যুগের বেশি সময় পার হলেও আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি জেলার প্রধান এই যোগাযোগকেন্দ্রে।
দীর্ঘদিনের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে টার্মিনালের বিভিন্ন অংশে তৈরি হয়েছে অসংখ্য খানাখন্দ। সামান্য বৃষ্টিতেই জমে যায় কাদা-পানি। কোথাও কোথাও বড় গর্ত তৈরি হয়ে যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করে। এতে প্রায়ই ছোটখাটো দুর্ঘটনার শিকার হন যাত্রীরা।
টার্মিনালে যাত্রীদের জন্য থাকা অপেক্ষমান কক্ষটিও এখন শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। নেই আধুনিক গণশৌচাগার, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা। ফলে নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের ভোগান্তি বেশি।
বর্ষায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। বৃষ্টির পানি ও কাদায় টার্মিনালের বড় অংশ তলিয়ে যায়। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পুরো এলাকা ঢেকে যায় ধুলাবালিতে। টার্মিনালে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথও ভাঙাচোরা। খানাখন্দের কারণে বাস চলাচলে সমস্যা হয় এবং বাসে ওঠা-নামার সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে টার্মিনালের ভেতরে প্রায়ই সৃষ্টি হয় যানজট ও বিশৃঙ্খলা।
১৯৮৮ সালে নির্মাণ, বড় সংস্কার হয়নি
জানা গেছে, ১৯৮৮ সালে তৎকালীন খুলনা বিভাগীয় ডেভেলপমেন্ট বোর্ড প্রায় এক একর জমির ওপর ঝালকাঠি পৌর বাস টার্মিনাল নির্মাণ করে। একতলা একটি ভবনসহ নির্মিত টার্মিনালটির উদ্বোধন করেন তৎকালীন ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক আলতাফ হোসেন।
এরপর প্রায় তিন যুগ পেরিয়ে গেলেও টার্মিনালের উল্লেখযোগ্য সংস্কার বা আধুনিকায়ন হয়নি। এ সময়ে জেলার জনসংখ্যা ও যানবাহনের সংখ্যা বাড়লেও সে অনুযায়ী বাড়েনি টার্মিনালের অবকাঠামোগত সুবিধা। বর্তমানে পুরোনো ভবনটিও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।
প্রতিদিন হাজারো যাত্রীর ভোগান্তি
ঝালকাঠি পৌর বাস টার্মিনাল থেকে বরিশাল, ভান্ডারিয়া, খুলনা, পিরোজপুর, মঠবাড়িয়া, পাথরঘাটা ও বরগুনাসহ বিভিন্ন গন্তব্যে বাস চলাচল করে। অভ্যন্তরীণ আটটি রুটসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও ঢাকার সাথে মোট ২২টি রুটে বাস চলাচল করে বলে জানা গেছে। এছাড়া চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ দূরপাল্লার বিভিন্ন রুটের বাসও এই টার্মিনাল ব্যবহার করে।
প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ এই টার্মিনাল ব্যবহার করলেও তাদের জন্য নেই মানসম্মত অপেক্ষমান কক্ষ। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে বাসের অপেক্ষায় থাকতে হয় যাত্রীদের। প্রয়োজনীয় স্যানিটেশন সুবিধা না থাকায় নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বাড়ে।
বরিশালগামী যাত্রী শিউলি বেগম বলেন, ঝালকাঠি বাস টার্মিনালের অবস্থা খুবই খারাপ। বাসে ওঠা-নামার সময় অসংখ্য খানাখন্দের কারণে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বিশেষ করে বৃষ্টি হলে পুরো টার্মিনাল কাদায় ভরে যায়। এত বছরেও একটি আধুনিক বাস টার্মিনাল না হওয়ায় আমরা হতাশ।
টিকিট কাউন্টার কর্মী হিরু বলেন, “প্রতিদিন শত শত যাত্রী এই টার্মিনাল ব্যবহার করেন। কিন্তু অবকাঠামোগত দুরবস্থার কারণে যাত্রীদের যেমন ভোগান্তি পোহাতে হয়, তেমনি আমাদেরও কাজ করতে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। দ্রুত আধুনিক বাস টার্মিনাল নির্মাণ করা হলে যাত্রীসেবা ও পরিবহন ব্যবস্থাপনা দুটোই সহজ হবে।”
ভোগান্তিতে বাসচালক ও পরিবহন শ্রমিকরাও
টার্মিনালের বেহাল অবস্থায় শুধু যাত্রীরাই নন, পরিবহন শ্রমিক ও বাসচালকরাও সমস্যায় পড়ছেন। বাসের নিচে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনীয় যান্ত্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা ইঞ্জিনের কাজ করার মতো উপযুক্ত পরিবেশ নেই।
বাসচালক মো. রিপন বলেন, “টার্মিনালের বেহাল অবস্থার কারণে এখানে বসে প্রয়োজনীয় যান্ত্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা ইঞ্জিন চেক করা সম্ভব হয় না। সর্বত্র খানাখন্দ ও কাদাপানি থাকায় গাড়ির নিচে কাজ করাও ঝুঁকিপূর্ণ। এতে সামান্য ত্রুটি থাকলেও তাৎক্ষণিকভাবে মেরামত করা যায় না। ফলে যাত্রীদের নিরাপত্তা ও সময়মতো বাস চলাচল-দুটিই বিঘ্নিত হয়।”
রাজস্ব আদায় হলেও উন্নয়ন নেই, অভিযোগ বাস মালিক সমিতির
ঝালকাঠি জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি আনিচুর রহমান তাপু বলেন, পৌরসভা প্রতি বছর বাস টার্মিনাল থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় করলেও এর ন্যূনতম সংস্কার করা হয় না। দীর্ঘদিন ধরে টার্মিনালটি অবহেলায় পড়ে আছে। এতে যাত্রীদের পাশাপাশি পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরাও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
তিনি বলেন, ভিমরুলি পেয়ারা বাগানসহ জেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে দেশের নানা প্রান্ত থেকে পর্যটক আসেন। আধুনিক বাস টার্মিনাল থাকলে আরও বেশি পর্যটক বাসযোগে ঝালকাঠিতে আসতে আগ্রহী হতেন।
দ্রুত আধুনিক বাস টার্মিনাল নির্মাণের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, পরিকল্পিত টার্মিনাল হলে যাত্রীসেবার মান বাড়বে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে এবং জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থারও উন্নতি হবে।
২০ কোটি টাকার আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ
দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমাতে এবার আধুনিক বাস টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। ‘উপকূলীয় শহর জলবায়ু সহিষ্ণু’ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক বাস টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পের সার্ভে ও নকশা প্রণয়নের কাজও শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে পৌরসভা।
ঝালকাঠি পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মোসা. সাহিন সুলতানা বলেন, ঝালকাঠি পৌরসভার বাসস্ট্যান্ডকে আধুনিক বাস টার্মিনালে রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রায় ২০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের সার্ভে ও নকশা প্রণয়নের কাজ শেষ হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়ার পর টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষে নির্মাণকাজ শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পৌর কর্তৃপক্ষের এমন আশ্বাসে নতুন করে আশায় বুক বাঁধছেন যাত্রী, পরিবহন শ্রমিক ও স্থানীয়রা। তবে দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার ও উন্নয়নের নানা আশ্বাস দেওয়া হলেও টার্মিনালের চিত্র বদলায়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।


